অরিত্র খাঁ, পুষ্টিবিদ

ঘষাকাচে ঢাকা রেস্তোরাঁ, ঝলসানো মাংস খেতে ভালো। কিন্তু শরীরের বারোটা বাজছে সেই খবর রাখেন কি। অথচ মণিমানিক্যের মতন আমাদের ঘরে ছড়িয়ে থাকে হরেক খাবার। ঘরে ব্যবহৃত বিভিন্ন মশলা বা সবজির গুণাগুণগুলি জেনে রাখুন।

বিভিন্ন মশলার উপকারিতা

হলুদ: হলুদের মধ্যে ফিনোলিক যৌগিক কারকিউমিন রয়েছে যা ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। যকৃতের সুস্থতায়,ঋতুকালীন, ব্যথা কমাতে হলুদ কাজে লাগে। এটি একটি ভালো অ্যান্টিসেপটিক।

আদা: গ্যাসট্রিকের সমস্যাতে আদা বেশ কার্যকর। আদা খেলে শরীরের অতিরিক্ত ঘামের সমস্যা দূর হয়। আদাতে রয়েছে ম্যাগনেশিয়াম ও জিঙ্ক যা শরীরের রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। আদার মধ্যে থাকে ফাইটো কেমিক্যাল অ্যালালাইট সালফাইট যেটা অ্যান্টি অক্সিডেন্টের কাজ করে এবং ক্যানসার ও ডায়াবেটিস সহ অন্যান্য রোগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

মেথি: মেথির মধ্যে থাকে ট্রিগোনেলিন নামে এক ধরনের যৌগ যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ভালো। এছাড়া ডায়াটরি ফাইভার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। হতাশা বা অবসাদ, অতিরিক্ত শারীরিক ওজন ও অ্যালকোহল পানে অসুস্থতা, ইত্যাদি বহু অসুখের জন্য মেথির রস এক মহৌষধ! মেথির রসে ‘সাপোনিস’ বা ‘ডাইওসজেনিন’ নামে এক ধরনের যৌগ পদার্থ আছে, যা মানবদেহের হরমোন স্তর বা এর পরিমাণ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

গরম মশলা: এর মধ্যে লবঙ্গ কণ্ঠনালির প্রদাহ দূর করে এবং টনসিল কমানোয় সহায়তা করে। এলাচের ডিউরেটিক উপাদান উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা কমিয়ে আনতে সক্ষম। প্রতিদিন আধা চা চামচ দারুচিনির গুড়ো রক্তে খারাপ কোলস্টেরল এলডিএল এর মাত্রা কমায়। রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের রোগীদের জন্য খুবই উপকারী।

সবজির উপকারিতা ও গুণাগুণ

পালংশাক: সাধারণত সবুজ শাক সবজিতে লুটেইনসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফাইটোকেমিক্যাল থাকে যা দৃষ্টি শক্তি বাড়িয়ে দেয়। পালংশাকে থাকা ফলিক অ্যাসিড সুস্থ কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেমের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হৃদযন্ত্রের সুস্থতা ধরে রাখতে পালং শাকের ওপর নির্ভরতা রাখতে পারেন। তবে ‘কিডনি’ রোগীর পালংশাক খাওয়া অনুচিত কারণ এতে আছে ‘অক্সালিক এ্যাসিড’ যা কিডনিতে পাথর সৃষ্টিতে সহায়ক।

মাশরুম: মাশরুমে কোলেস্টরেল কমানোর অন্যতম উপাদান ইরিটাডেনিন, লোভাষ্টটিন, এনটাডেনিন, কিটিন এবং ভিটামিন বি,সি ও ডি থাকায় নিয়মিত মাশরুম খেলে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ নিরাময় হয়। ক্যানসার ও টিউমার প্রতিরোধে মাশরুম বেশ উপকারী। হেপাটাইটিস বি ও জন্ডিস প্রতিরোধ করে। অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা থেকে রেহাই পাওয়া যায়।

 করলা:  রক্তকে বিশুদ্ধ করে। করলায় এলার্জি জনিত সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। করলা এডিনোসিন মনোফসফেট অ্যাকটিভেটেড প্রোটিন কাইনেজ নামক এক ধরনের এনজাইম বৃদ্ধি করে শরীরের কোষগুলোর চিনি গ্রহণের ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। তাই ডায়াবেটিস রোগীরা নিয়মিত করলার রস খেলে উপকার পাবেন। করলায় আছে প্রচুর পরিমানে বিটা ক্যারোটিন বা ভিটামিন এ। দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে বিটা ক্যারোটিন খুবই উপকারী। এছাড়াও করলা একটি রুচি বর্ধক সবজি।

সয়াবিন: সয়াবিন ক্যানসার প্রতিরোধক এবং হরমোনজনিত সমস্যায় উপকারী।  সয়াবিন কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে। সয়াবিনে রয়েছে ভিটামিন বি কমপ্লেক্স। বিশেষ করে থায়ামিন, নিয়াসিন, ফলিক অ্যাসিড ও রাইবোফ্লেভিন। এই ভিটামিন হার্ট ও লিভারের সক্রিয় কার্যকলাপ বজায় রাখতে সাহায্য করে। ন্যাচারাল অ্যান্টি অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ সয়াবিন বার্ধক্যের গতি মন্থর করতে সাহায্য করে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে। তাই সয়াবিন দাঁত ও হাড় মজবুত রাখে। এর মধ্যে থাকা আয়রন রক্তের সুস্থতা বজায় রাখে। ফাইবার সমৃদ্ধ সয়াবিন হার্টের জন্য খুব ভালো। সোয়াবিনে থাকা ফাইটো ইস্টোজেন মহিলাদের নিয়মিত ঋতুচক্রের জন্য উপকারী।

টম্যাটো: প্রাকৃতিক অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকার জন্য ক্যানসারের ঝুঁকি রোধে খেতে পারেন টম্যাটো। টমেটোতে রয়েছে প্রচুর ফাইবার, পটাশিয়াম এবং ভিটামিন সি। হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে টমেটো খাওয়ার বিকল্প নেই। টমেটোতে রয়েছে প্রচুর ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন কে, যা দেহের হাড়  মজবুত করে যাদের কিডনিতে সমস্যা রয়েছে, তারা খাদ্যতালিকায় টমেটো রাখবেন। প্রতিদিনের প্রচুর পরিমাণে টমেটো আমাদের দেহের অতিরিক্ত চর্বি দূর করে এবং দেহে অতিরিক্ত মেদ জমতে দেয় না। টম্যাটো বাতের ব্যথা অনেকাংশে ভালো করে। টম্যাটোতে প্রচুর পরিমাণে বেটা-ক্যারোটিন উপাদান আছে, যা পুরুষদের প্রোস্টেট ক্যানসার প্রতিরোধে কার্যকরী। যাদের উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা আছে, তাদের জন্য টম্যাটো উপকারী। প্রতিদিন ২৫ গ্রাম টম্যাটো খেলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করাটা অনেক বেশি সহজ হয়ে যায়।

ব্রকোলি: এটি ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। ভিটামিন সি থাকায় এটি ত্বক সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস হওয়ায় এটি হাড়ের সুস্থতা রক্ষা করে। ব্রকোলি অ্যান্টি অক্সিডেন্টের ভালো উৎস। এটি ত্বকের বলিরেখা দূর করতে সাহায্য করে। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে এবং কোলোস্টেরলের মাত্রা কমাতে ব্রকোলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ব্রকলিতে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন কে এবং ফলিক অ্যাসিড থাকায় এই সবজি গর্ভবতী মহিলাদের জন্য উপকারী।

বাঁধাকপি: বাঁধাকপি ওজন কমাতে সাহায্য করে। হজমশক্তি বাড়িয়ে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে এর তুলনা হয় না।  বাঁধাকপি আলসার নিরাময়ে উপকারী। বাঁধাকপি উচ্চমাত্রায় বেটা ক্যারোটিন সমৃদ্ধ। আপনার চোখের সুস্থতা নিশ্চিত করতে এটি অপরিহার্য। বাঁধাকপিতে উপস্থিত ভিটামিন সি ও মিনারেল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে।  বাঁধাকপিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট যা ক্যানসার প্রতিরোধেও সহায়তা করে।

পটল: পটলে ভালো পরিমাণে ফাইবার থাকে যা খাদ্য হজমে সাহায্য করে। এছাড়াও এটি গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা সমাধানে এবং লিভারের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্যা সমাধানেও সাহায্য করে। কোষ্ঠকাঠিন্য নিরাময় করে। ওজন কমতে সাহায্য করে। রক্তকে পরিশোধিত করে। কোলেস্টেরল ও ব্লাড সুগার কমায়।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here