catching cold
ঠান্ডা লাগা।

দীপঙ্কর ঘোষ

ঘূর্ণিঝড় ‘ফেটাই’-এর প্রভাবে বেশ ভালো বৃষ্টি হচ্ছে কলকাতা-সহ বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। ফলে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা নেমে যাওয়ায় দিনের বেলাতেই বেশ ঠান্ডা লাগছে। কাল বুধবার থেকে আকাশ পরিষ্কার হয়ে যাবে, ঝলমলে রোদ উঠবে, সর্বনিম্ন তাপমাত্রা অনেক নামবে, জমিয়ে ঠান্ডা পড়বে – যাকে বলে শীতের একেবারে আইডিয়াল ওয়েদার। কিন্তু এই সময়েই ঠান্ডা লেগে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা।

শীতকালে এক একটা দেশে এক এক রকম ঠান্ডা – এবং কখনও কখনও এক‌ই দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রকমের আবহাওয়া। সাইবেরিয়াতে গরমকালেই যে তাপমাত্রা থাকে আমাদের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণে ভয়ানক ঠান্ডাতেও ওই তাপমাত্রা হয় না। অত দূরে যাওয়ার দরকার কী! আমাদের দেশেই তো উত্তরের আবহাওয়ার সঙ্গে দক্ষিণের আবহাওয়ার আসমান-জমিন ফারাক।  আমাদের আজকের আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখব আমাদের এই গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলেই।

আরও পড়ুন স্বাস্থ্য সাবধান: বয়ঃসন্ধিকালের যৌনসমস্যা

ঠান্ডা লাগা বলতে আমরা বুঝি অসুস্থ হ‌ওয়া অর্থাৎ নাক দিয়ে জল পড়া, গলায় ব‍্যথা, অল্প জ্বরো ভাব, ক্লান্তি, দুর্বলতা – এই সব। এই ধরনের অসুখ কিন্তু করোনাভাইরাস বা রাইনোভাইরাস থেকে তৈরি হয়। তাই আমরা প্রথমে এই সব দুষ্টু ভাইরাসের খারাপ দিকে নজর রাখব।

প্রথমত, কখন আমরা সাবধান হব: যখন জ্বর একশো একের ওপরে যাবে তখন ওষুধ খাব। ওষুধ মানে প‍্যারাসিটামল। শরীরের ওজন অনুযায়ী। যদি জ্বর বাড়তে থাকে তা হলে চব্বিশ ঘণ্টা পরে অবশ্যই ডাক্তার দেখাব। যদি এই অবস্থা কোনো শিশুর হয়, বিশেষত তার বয়স যদি বারো সপ্তাহের কম হয়, তা হলে সঙ্গে সঙ্গেই ডাক্তার দেখাবেন।

মনে রাখবেন জ্বর, সর্দি আর গা-হাত-পা ব‍্যথা, সব ভাইরাল অসুখেই হয়। এবং ডেঙ্গুও একটা ভাইরাল অসুখ। অর্থাৎ প্লেটলেট কমে যাওয়ার ব‍্যাপারটা সবগুলোতেই থাকে।

আরও পড়ুন স্বাস্থ্য সাবধান: কেটে গেছে? টিটেনাস ঠেকাতে কী করবেন?

সাধারণ ভাবে এই সব ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো ভূমিকা নেই। তবে যদি ডাক্তারবাবু মনে করেন যে এই অসুখ থেকে আপনার ব‍্যাক্টেরিয়াল ইনফেকশন হতে পারে তা হলে উনি ওই ধরনের ওষুধ দেবেন। এ ছাড়া এই অবস্থায় কারও কারও ভয়ানক শ্বাসকষ্ট হতে পারে, তাতে হাসপাতালে ভর্তি হ‌ওয়ার দরকার হয়। এগুলো সবই ব‌ইয়ের লেখা কথা – সামান্য ভাইরাল অসুখ থেকেও মৃত্যু হতে পারে। অবহেলা করবেন না।

সত‍্যিকার ঠান্ডা লাগা

এ বার সত‍্যিকার ঠান্ডা লাগা সম্পর্কে দু’ কথা বলা যাক। যখন চারপাশের তাপমাত্রা বহু নীচে নেমে যায় তখন আমরা আমাদের শরীরের তাপ হারিয়ে ফেলি। আমাদের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যেমন কিডনি, লিভার, হার্ট – এদের প্রয়োজনীয় তাপ জোগানোর জন্য শরীর তার শিরা ধমনীকে সঙ্কুচিত করে ফেলে। তার ফলে চামড়া থেকে তাপ বেরোয় না, চামড়া শীতলতর হয়ে ওঠে আর শরীরের ভেতরের তাপ শরীর থেকে বেরোতে পারে না। যার ফলে শরীরের ভেতরের তাপ ভেতরেই থেকে যায়। চামড়ার কাজ শরীর থেকে তাপ বার করে শরীরকে শীতল রাখা। শেষে শিরা ধমনী এতটাই সঙ্কুচিত হয় যে হাত পা, বিশেষত আঙ্গুলের শিরা আর ধমনী প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় ও সেই জায়গাগুলোতে পচন ধরে। এটাকেই ফ্রস্ট বাইট বলা হয়। এর ফলে শরীরের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো তাপ পায়, মানুষটি বেঁচে থাকে কিন্তু তাকে হারাতে হয় তার বিভিন্ন অঙ্গ যেমন নাক আঙুল, হাত ইত্যাদি।
সবার একটা ধারণা, শীতের দেশে প্রবল ঠান্ডায় মদ খেয়ে শরীর গরম রাখতে হয়। আসলে মদ শরীরের চামড়ায় উত্তাপের বোধ এনে দেয় – এতে কোনো উপকার হয় না। মদ মানুষের শরীরের চামড়ায় রক্ত সরবরাহ বাড়ায় – তাতে শরীরে যেটুকু তাপ সঞ্চিত আছে সেটা চামড়া দিয়ে বেরিয়ে আসে, ফলত শরীরের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো দ্রুত তাপমাত্রা হারায় এবং মৃত্যু তরান্বিত করে।
আরও পড়ুন স্বাস্থ্য সাবধান: কী হতে পারে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহারে

প্রবল শীতের দেশে বিপদে পড়লে গরম খাবার বা গ্লুকোজ জাতীয় খাবার খাওয়া উচিত যাতে শরীরের ভেতরে দ্রুত শক্তি এবং তাপ তৈরি হয়। এর ফলে শরীরের তাপমাত্রা বজায় থাকে।

এ সব কথা আমাদের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণে বসে ভাবার কোনো দরকার নেই, এখানে দশ ডিগ্রির নীচে তাপমাত্রা নামে না। আগের কথাগুলো শূন্যের নীচের তাপমাত্রার জন্য প্রযোজ্য।

(লেখক একজন সাধারণ চিকিৎসক)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here