ডাঃ মল্লিনাথ মুখোপাধ্যায়

তিলোত্তমা রায়। শহরের একটি নামী স্কুলের ভূগোলের শিক্ষিকা। এমনিতে শরীরে খুব একটা রোগ নেই। তবে অতিরিক্ত মাসিকের ফলে রক্তাল্পতা ধরা দিয়েছে। আর বিয়ের পাঁচ বছর হয়ে গেল তবুও ইস্যু আসছে না। তিলোত্তমার যখন বিয়ে হয়েছিল তখন সে মাত্র ২৩। চাকরি বিয়ের পর। এখন বয়স আঠাশ। বাড়ির সকলে চিন্তার কিছু নেই টাইপের কথাবার্তা বললেও চিন্তা তো একটা থেকেই যায়। চিকিৎসকের কাছে গেলে পরীক্ষায় দেখা গেল ফাইব্রয়েড বা মায়োমা রয়েছে তিলোত্তমার। মহিলাদের তিরিশের আশেপাশে অর্থাৎ প্রজননক্ষম বয়সে জরায়ুতে সবচেয়ে বেশি যে টিউমারটি হতে দেখা যায় তা হল ফাইব্রয়েড বা মায়োমা। জরায়ুর পেশির অতিরিক্ত ও অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ফলে এই টিউমারের সৃষ্টি হয়। ৩০ বছরের ঊর্ধ্বে নারীদের মধ্যে ২০ শতাংশই এই সমস্যায় আক্রান্ত। তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।ফাইব্রয়েড এক ধরনের নিরীহ টিউমার, এটি থেকে বিপদ হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।

কিন্তু দুটি সমস্যার জন্য ফাইব্রয়েডের চিকিৎসার প্রয়োজন। প্রথমত ফাইব্রয়েড থাকলে অতিরিক্ত মাসিক হতে পারে এবং তার জন্য রক্তশূন্যতা হতে পারে। দ্বিতীয়ত, ফাইব্রয়েডকে বন্ধ্যাত্বের একটি অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তবে এই ধারণা আর্যসত্য নয়। ২৫ শতাংশ ফাইব্রয়েড টিউমারই আজীবন কোনো সমস্যা করে না। মোটামুটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কমবেশি অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বা অনিয়মিত মাসিক বা তলপেট ভারী বোধ হয়। ফাইব্রয়েডের ২৭ থেকে ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে এটি বন্ধ্যাত্বের কারণ হয়ে উঠতে পারে, যদি নীচের ঘটনাগুলো ঘটে-

১. যদি ফাইব্রয়েডের কারণে জরায়ু অতিরিক্ত বড় হয়ে যায়।
২. জরায়ুর ভেতরের দেয়ালে রক্তনালির সংখ্যা  বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে ভ্রূণ ঠিকমতো বেড়ে উঠতে পারে না।
৩. যদি জরায়ুতে বা ফ্যালোপিয়ান টিউবের সংযোগস্থলে অথবা এমন কোনো জায়গায় টিউমারটির হয়, যা ভ্রূণকে সুস্থিত হতে বাধা দেয়।
বন্ধ্যাত্বের মতো সমস্যায় বা বারবার গর্ভপাত হচ্ছে এমন মহিলাদের ক্ষেত্রে ফাইব্রয়েড থাকলেও বন্ধ্যাত্বের অন্য কারণগুলোকে খতিয়ে দেখা উচিত। কারণ, মূল সমস্যাটি ফাইব্রয়েড নাও হতে পারে। বর্তমানে মায়োমেকটমি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ফাইব্রয়েডকে জরায়ুর দেয়াল থেকে তুলে এনে আবার তা সেলাই করে দেয়া হয়। জরায়ু কেটে ফেলার প্রয়োজন হয় না। তবে অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে-
১. ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের সময় জরায়ু কেটে ফেলে দেয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
২. অস্ত্রোপচারের পর আবার ফাইব্রয়েড হওয়ার আশংকা ১০ থেকে ১৫ ভাগ।
৩. অস্ত্রোপচারের পর গর্ভধারণের সম্ভাবনা ৪০ থেকে ৬০ ভাগ। এটি নির্ভর করে ফাইব্রয়েড টিউমারের সংখ্যা, আকার এবং অস্ত্রোপচারের সফলতার ওপর।

৪. ফাইব্রয়েড অস্ত্রোপচারের পর গর্ভধারণ করলে অবশ্যই ভালো সুযোগ-সুবিধা আছে এমন হাসপাতালে সন্তান প্রসব করাতে হবে।

সুতরাং ফাইব্রয়েড ধরা পড়লেই তড়িঘড়ি অপারেশনের সিদ্ধান্ত না নেওয়াই ভালো। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিন বিকল্প ব্যবস্থা কিছু আছে কিনা জেনে নিন।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here