ডাঃ সঞ্জয় বসু, (কনসালট্যান্ট গ্যাস্ট্রোএন্ট্রোলজিস্ট, নারায়ণা সুপারস্পেশ্যালিটি হসপিটাল, হাওড়া)         

অ্যাসিডিটির অনেক কারণ হতে পারে। প্রায়ই রোগীরা এসে বলেন, গলা-বুক জ্বালা করছে, মুখ টকে যাচ্ছে, হজম হচ্ছে না, পেট ভার, খালি ঢেকুর দেয়।

আগে দেখতে হবে যাঁদের অ্যাসিডিটি হচ্ছে তাঁরা নিজেরা এর জন্য কতটুকু দায়ী। আপনি কি মোটা? ভুঁড়ি আছে? আপনার পেটে অতিরিক্ত মেদ? যখন তখন খান? ওভারইটিং করেন? খাবার দেখলেই খেয়ে ফেলেন?  আপনি সিগারেট বা অ্যালকোহল খান কি না? আপনার তেলে ভাজা খেতে ভালো লাগে কি না? স্পাইসি ফুড, জাঙ্ক ফুড, ফ্রায়েড ফুড, কফি, চকোলেট, মিন্ট বা ক্যাফিন বেশি আছে এমন কিছু বা কোল্ড ড্রিংক খেতে পছন্দ করেন কি না? এই সব উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তা হলে আপনার অম্বল অ্যাসিডিটিকে আপনিই ডেকে এনেছেন।

আবার দুধ-চা খেলে অনেকেরই অ্যাসিড হয়, কিন্তু সকলের হয় না। কারও কারও মিল্ক ইনটলারেন্স থাকতে পারে। কিন্তু লিকার চা খেলে যে অম্বল হয় না – এটাও ঠিক না।

কেন হয় অ্যাসিডিটি?

পাকস্থলী বা স্টম্যাকের ভেতরের পাইলোরিক কোষ হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড তৈরি করে। এই অ্যাসিড খাদ্যের পাচন বা হজমে সাহায্য করে। আবার, কোনো খাবার খাওয়ার পর পাচন শুরু হয়ে যায় মুখেই। স্যালাইভরি গ্ল্যান্ড থেকে নির্গত লালা বা থুতুর মধ্যে রয়েছে টায়ালিন ও অ্যামাইলেজ। খাদ্যের হজম প্রক্রিয়া এখান থেকেই শুরু হয়। যদি কেউ না চিবিয়ে খান, বিশেষ করে বাচ্চারা গিলে খেয়ে নিলে, হজমটা শুরু হল না। এর পর সেই খাবার গলনালি বা ইসোফেগাস দিয়ে নেমে যায় পাকস্থলীতে। গলনালি ও পাকস্থলীর মাঝখানে দরজার মতো একটা ভালভ থাকে। এটি স্বাভাবিক ভাবে নীচের দিকে খোলে, কিন্তু খাদ্যকে উপরে উঠে আসতে দেয় না। খাদ্যনালি আর পাকস্থলীর সংযোগস্থলে রয়েছে ডায়াফ্রাম। এটিই পাকস্থলীকে বুক থেকে আলাদা করেছে। এই ডায়াফ্রাম অ্যাসিডকে স্টম্যাকের মধ্যেই ধরে রাখতে সাহায্য করে।  যদি কোনো কারণে পেট খালি থাকে তা হলে বা ভালভ শিথিল হলে ওই  হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ভালভকে উপেক্ষা করে ওপরে উঠে আসে – তখনই গলা-বুক জ্বালা করে। একে অ্যাসিড রিফ্লাক্স ডিজিজ বলে।

যাঁরা চিবিয়ে খান না, বেশি খান তাঁদের অ্যাসিডিটি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। পাকস্থলীর মধ্যে খাদ্য হজম হতে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা সময় লাগে। সিট্রাস ফুড যেমন টমেটো, লেবু অম্বলের কারণ হয়। অ্যাংজাইটি, টেনশন, ঘুম না হাওয়া ইত্যাদি অ্যাসিডিটির কারণ। প্রথমত গিলে খাওয়া, দাঁতের সমস্যার জন্য চিবোতে না পারা এবং কিছু শারীরিক সমস্যা থেকে অ্যাসিডিটি তৈরি হয়। 

যদি দেখা যায়, পাকস্থলী আর খাদ্যনালির মাঝের ওই ভালভ কোনো কারণে শিথিল হয়ে আছে বা কাজ করছে না তা হলে খাদ্য ও হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ওপরে উঠে আসে। একে বলে হিটাল হার্নিয়া।

কোনো কোনো সময় পাকস্থলী গাত্র ভালভ পথে ওপরে উঠে আসে। পাকস্থলীর পেশিগুলি সংকোচন-প্রসারণ করে, খাদ্য হজম করে এবং পাচিত খাদ্যকে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যাওয়ার জন্য ক্ষুদ্রান্তের দিকে ঠেলে দেয়।

খালি পেটে থাকলে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড পাকস্থলীর গাত্রে যে মিউকাস স্তর থাকে তার ক্ষতি করে। এর থেকে ঘা বা আলসার হয়।  তা থেকে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। তাই ক্রনিক অ্যাসিডিটিকে অবহেলা করতে নেই।

মেদ বাড়লে ডায়াফ্রামের যে স্থিতিস্থাপকতা তা কমে যায়। একে বলে প্ল্যাটুলেন্স। এর কারণে ভালভ ঠিক কাজ করে না। তখনই সমস্যা দেখা দেয়। পার্কিনসন ডিজিজ, ডায়াবেটিস গ্যাস্ট্রোপ্যারাসিস, হাঁপানি থাকলে অ্যাসিডিটি হয়।

যত মেদ, তত অ্যাসিড। সিগারেট খেলে থুতু বা লালা সিক্রেশন কমে যায়। স্টম্যাকে অ্যাসিড ক্ষরণ বেড়ে যায়। মানে অ্যাসিডিটি।

বার বার খান, কম করে খান, ওজন কমান। লাইফস্টাইল পরিবর্তন করুন। পেট খালি রাখবেন না। অ্যাসিডিটির ৫০ শতাংশ কারণই লাইফস্টাইল। যা খেলে অম্বল হয় তা খাবেন না। হার্টের ওষুধ খেলেও অম্বল হতে পারে। এ ব্যাপারে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। মনে রাখতে হবে, ওষুধ ৫০ শতাংশ রোগের উপশম করতে পারে। বাকিটা করতে হবে আপনাকেই। সময় থাকতে থাকতেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

যোগাযোগ – ৮৩৩৪৯৭৭৭০২

www.narayanahealth.org

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here