ডাঃ রাজীব দে (কনস্যালট্যান্ট হেমাটওলজিস্ট হেড অ্যান্ড নেক সার্জন, নারায়ণা সুপারস্পেশ্যালিটি হসপিটাল, হাওড়া) :

তিনটি সার কথা মনে রাখুন। থ্যালাসেমিয়া বাহকরা কখনোই কোনো রোগী নয়। আপনি যদি এই রোগের বাহক না হন তা হলে নির্দ্বিধায় এক জন বাহককে বিয়ে করতে পারেন। আপনার সন্তানের থ্যালাসেমিয়া রোগী হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এটাই বিজ্ঞানসম্মত যুক্তি ও তথ্য। থ্যালাসেমিয়া একটি জেনেটিক ডিজিজ। জিন মিউটেশন বা ত্রুটি থেকে হয়। আরও সহজ করে বললে, থ্যালাসেমিয়া রক্তের ডিজঅর্ডার ঘটিত একটি বংশগত রোগ। হিমোগ্লোবিনের গন্ডোগোল। থ্যালাসেমিয়া দু’ ধরনের। ক্যারিয়ার অর্থাৎ বাহক আর পেশেন্ট মানে রোগী। বাহকরা সুস্থ ও অস্বাভাবিক হন। রোগী হলে চিকিৎসা করতে হয়। যেহেতু থ্যালাসেমিয়া জিন মিউটেশন ঘটিত একটি রোগ সে কারণে দু’জন বাহকের বিয়ে করা উচিত নয়। বিয়ের আগে তাই আপনি থ্যালাসেমিয়ার বাহক কিনা তাঁর টেস্ট করানো আজকাল অত্যন্ত জরুরি। এইচবিএইচপিএলসি টেস্ট করতে হয়।

এবার বলি থ্যালাসেমিয়া থাকলে ঠিক কী হয়। আমাদের শরীরে বোনম্যারো বা রক্তমজ্জায় রক্ত তৈরি হয়। বিশেষ করে মুখের চোয়াল, স্কাল, বুকের রিব, পেলভিস ইত্যাদি জায়গার হাড়ে রক্ত বেশি তৈরি হয়। ফ্ল্যাট বোন যেমন হাত, পায়ের হাড়ে তুলনায় কম রক্ত তৈরি হয়। থ্যালাসেমিয়া থাকলে এই রক্ত তৈরি ব্যাহত হয়। রক্তের আরবিসি বা লোহিত রক্ত কণিকা হিমোগ্লোবিন বহন করে। এই হিমোগ্লোবিনের গ্লোবিন একটি প্রোটিন। থ্যালাসেমিয়া হলে হিমোগ্লোবিন ভেঙে যায়। গ্লোবিন অ্যানস্টেবল থাকে। থ্যালাসেমিয়া এক অর্থে গ্লোবিন ডিফেক্ট। এ দিকে এই কারণে হিম বা আয়রণ ফ্রি হয়ে যায়। টা গিয়ে হার্ট, লিভার ইত্যাদিতে জমে। হিমোগ্লোবিন ক্রমাগত ভেঙে যাওয়ায় রক্ত অক্সিজেন সংবহন করতে পারে না। অ্যানেমিয়া দেখা দেয়। যেহেতু রক্তে হিমোগ্লোবিন কমে যাচ্ছে শরীর তখন তার আপন নিয়মে বেশি করে হিমোগ্লোবিন উৎপাদন করবে। এই অবস্থায় শরীরে আয়রণের আধিক্য দেখা দেয়। আয়রণ ডিপোজিশন শরীরের পক্ষে মারাত্মক। থ্যালাসেমিয়ার এই কারণে হার্ট ফেলিওর বেশি। মুখ, স্কাল, পেলভিস, রিজিয়নে থ্যালাসেমিয়া রোগে এই সব কারণে ডিফমিটি দেখা যায়। অনেক সময় চিকিৎসকরা অ্যানেমিয়া হয়েছে দেখে আয়রণ সাপলিমেট দেন না। ওটা খাদ্য থেকে স্বাভাবিক ভাবে আসবে। শরীর আয়রণ বেশি অ্যাবসর্ব করলে তার ফল উল্টো হয়। হার্ট, লিভার, প্যানক্রিয়াস এ জন্য অ্যাফেক্টেড তো হয়ই তার সঙ্গে বিভিন্ন অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এ জন্য হরমোনাল ডিসব্যালেন্স দেখা যায়। তার ফলে শরীরের বেশির ভাগ স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। আগেই বলেছি থ্যালাসেমিয়া বাহক কোনো রোগী নন। রোগী অর্থাৎ পেশেন্ট হলে লক্ষণ থাকে, যেমন – অ্যানেমিয়া হবে, ফ্যাকাসে দেখাবে। ঘন ঘন ইনফেকশন হবে, খিদের অভাব, জন্ডিস সঙ্গে হলুদ ত্বক, বিভিন্ন অর্গানগুলো বড়ো হয়ে ওঠে। এই জন্য রোগীকে রক্ত দিতে হয়। রোগের স্টেজের ওপর নির্ভর করে বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট। প্লীহা, গল্ডব্লাডার বাদ দিতে হতে পারে। ওষুধপত্র তো আছেই।

একটা জরুরি বিষয়, ধরা যাক অজ্ঞাতে দু’জন থ্যালাসেমিয়া বাহকের বিবাহ হয়েছে। মনে রাখবেন এই ক্ষেত্রে গর্ভে সন্তান আসার তিন মাসের মধ্যে তার অর্থাৎ ভ্রূণের পরীক্ষা করে বলে দেওয়া যায় সেই সন্তান থ্যালাসেমিক হবে কি না। এক্ষেত্রে শিশুর সুস্থ স্বাভাবিক, পেশেন্ট আর বাহক – এই তিন ধরনেরই হওয়ার সম্ভাবনা থাকে জেনেটিক কারণেই। বিয়ে মেডিক্যাল ডিসিশন নয়। সোশ্যাল ডিসিশন। যদি পরীক্ষা বলে পেশেন্ট জন্মাবে তা হলে তা হলে অ্যবরশানের পথ নিতে হবে। বাহক বলে হাহুতাশ নয়। পাত্র-পাত্রী বাহক হলেও জেনেটিক নিয়মেই ২৫ শতাংশ শিশুর থ্যালাসেমিয়া হওয়ার চান্স থাকে।

যোগাযোগ – ৮৩৩৪৯৭৭৭০২

www.narayanahealth.org

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here