antibiotics
dr. dipankar ghosh
দীপঙ্কর ঘোষ

সালটা দু’ হাজার চল্লিশ। রৌণকবাবুর জ্বর, গলায় ব‍্যথা। ওঁকে আলাদা একটা ঘরে এসি চালিয়ে সব দরজা জানলা বন্ধ করে রাখা হয়েছে। লোকজন সব রাস্তায় দাঁড়িয়ে। ছেলে অর্কপ্রিয় ওর মুভিফোনে ছয় নং ডিসপোজাল অফিসে বারবার ফোন করছে। ওঁর স্ত্রী বৃষ্টিধারা অনেক বার চেষ্টার পর ডাক্তারবাবুকে মুভিফোনে দেখতে পেয়ে কেঁদে ফেলল – আর কি কোনো উপায় নেই ডাক্তারবাবু? এর মধ্যেই লেসার আলোর লহর তুলে ডিসপোজাল কার এসে গেল। লম্বা যান্ত্রিক হাত রৌণককে পলিথিনে মুড়ে এয়ার টাইট গাড়ির সেন্ট্রাল নন অ্যারোবিক পয়েন্টে নামিয়ে দিল। রৌণকের বৌ বৃষ্টিধারা আছাড়ি পিছাড়ি করছে, “আমাকে একবার ছুঁতে দাও”। রৌণকের ড্রাগ রেজিস্ট‍্যান্ট টনসিলাইটিস হয়েছে, তাই ভাগাড়ে ফেলে আসা হবে। কারণ ওঁর উপস্থিতি এখন মানুষের পক্ষে বিপজ্জনক। ভাগাড়েই মৃত্যুর দিন গুনবেন রৌণকবাবু।

অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ অপব‍্যবহার না বন্ধ করলে আমাদের ভবিষ্যৎ এটাই। অ্যান্টিবায়োটিক ও তার যথেচ্ছ অপব‍্যবহার মানবজাতিকে এক ভবিষ্যৎ সঙ্কটের মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে। আমরা ডাক্তাররা প্রাত‍্যহিক অভিজ্ঞতায় দেখছি এক একটা জীবাণু পঞ্চাশটি ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলেছে। আমাদের আরও শক্তিশালী আরও ব‍্যয়বহুল ওষুধ প্রয়োগ করতে হচ্ছে । কেন এমন হয়?

আরও পড়ুন স্বাস্থ্য সাবধান: কেটে গেছে? টিটেনাস ঠেকাতে কী করবেন?

অ্যান্টিবায়োটিক মূলত জীবাণুদের যে সব জায়গায় আঘাত হানে সেগুলো হলো যথাক্রমে — (১) জীবাণুর শরীরের দেওয়াল – এটা ভেঙে দিতে পারলে জীবাণু শেষ; (২) ডিএনএ – এখানে কাজ করে জীবাণুদের কোষবিভাজন বন্ধ করে দেয়; (৩) অথবা রাইবোজোম, জীবাণুর শ্বসনক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়।

প্রবাদপ্রতিম ডাক্তার বিধানবাবু হাতে তিনটির বেশি অ্যান্টিবায়োটিক পাননি। ওঁর ডোজ ছিল নির্ভুল। ফলে জীবাণুরা ঠিক ডোজের ওষুধ পেয়ে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। কম ডোজে অল্প দিন ওষুধ ব‍্যবহার হলে জীবাণু তার এক জীবনেই ডিএনএ পর্যন্ত বদলে ফেলতে পারে যাতে ওই ওষুধ আর তাকে মারতে না পারে। তখন ওই ওষুধ আর কাজ করবে না।

আরও পড়ুন স্বাস্থ্য সাবধান: প্রস্টেট গ্ল‍্যান্ড ও তার অসুখ

না না, আপনার কোনো দোষ নেই। ধরুন, আপনার পাশের বাড়ির হৃদয়বাবুর টিবি হয়েছে। উনি ওষুধের সম্পূর্ণ ডোজ শেষ না করে মাঝপথে বন্ধ করে দিলেন। ফলে আবার ওঁর টিবি হল। এ বার সেটা আর কোনো ওষুধে সারবে না। হৃদয় মারা যাবেন। তাতে আপনার কিচ্ছু এসে যায় না । কিন্তু ওঁর ওই রেজিস্ট‍্যান্ট জীবাণু যদি আপনার শরীরে বাসা বাঁধে – বায়ুবাহী জীবাণু তো বাসা বাঁধতেই পারে – তা হলে কিন্তু আপনি এবং আপনার পরিবারও শেষ, কারণ এ ক্ষেত্রে আর কোনো ওষুধে কাজ হবে না।

তা হলে করণীয় কী?

প্রথম কথা হল, নিজে ডাক্তারি করবেন না। প্রাথমিক ভাবে দোকান থেকে নিজের মতো করে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাওয়া বন্ধ করুন। ডাক্তারের ওপর বিশ্বাস বাড়ান, ‘পেশেন্ট’ কথাটার অর্থ ধৈর্যশীল মানুষ। ধৈর্য রাখতে হবে। সুতরাং সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করুন। ঠিক মতো ওষুধ সেবন করুন। এগুলো কোনোটাই এক দিনে হ‌ওয়ার নয়, হয়তো অনেক সচেতনতা শিবির, অনেক আলোচনাচক্রের আয়োজন করতে হবে। এ ভাবেই আমাদের মাথায় ঢোকাতে হবে যে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব‍্যবহার একদম নয়।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন