খবরঅনলাইন ডেস্ক: শরীরের সুস্থতার জন্য ঘুমের বিকল্প আর কিছু হতেই পারে না। আমাদের জীবন সুস্থ ও সুন্দর ভাবে কাটাতে হলে ঘুমের গুরুত্ব অপরিসীম। শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নিজস্ব কিছু কাজ থাকে। সারা দিন কাজ করার পর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিশ্রামের দরকার হয়। বিশ্রামের মূল ক্ষেত্রটি হল ঘুম। কিন্তু সারা দিনের পরিশ্রমের পর রাতে ঘুম আসে না? রাতে আপনার ঘুম ঠিকঠাক না হলে সারা দিনের কাজের এনার্জি চলে যায়। আপনার মেজাজও খিটখিটে হয়ে যায়। অনেক সময় মনে হয় দুশ্চিন্তার কারণে ঘুমে ব্যাঘাত ঘটছে। কিন্তু ঘুম ঠিকমতো না হলে মানসিক এবং শারীরিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

আমাদের সবার মধ্যেই ছোটোখাটো একটা ডাক্তার লুকিয়ে থাকে। আর আমরা এখানেই ভুল করে ফেলি। কোনো ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই অনিদ্রা দূর করতে আমার ওষুধ খেতে থাকি। ঘুমের ওষুধের ওপর এমন নির্ভরতা তৈরি হয়ে যায় যে ওষুধ ছাড়া তখন আর ঘুম আসেই না। কিন্তু সেই সব ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে।

Loading videos...

কী কী কারণে অনিদ্রা হয়? 

কোনো বিশেষ কারণে অনিদ্রা দেখা দেয়। যেমন, মানসিক চাপ বা উদ্বেগ, যা কয়েক দিন বা সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। সাধারণত শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের কারণে হয়ে থাকে এবং তা দীর্ঘদিনের জন্য – প্রতি সপ্তাহে তিন বার করে কমপক্ষে তিন মাস ব্যাপী।

চাকুরির সাক্ষাৎকার, পরীক্ষা এমনকি জীবনের বড়ো কোনো পরিবর্তন, যেমন কাছের কারও মৃত্যু বা সম্পর্কে বিচ্ছেদ ইত্যাদি নানা কারণে এমন সমস্যা দেখা দিতে পারে।

অস্বাস্থ্যকর ঘুমের অভ্যাস, যেমন প্রতি দিন একই সময় ঘুমোতে না যাওয়া। ঘুমের রুটিনের পরিবর্তন এই ধরনের অনিদ্রার কারণ।

সাধারণত, স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে এই ধরণের অনিদ্রার সমস্যা দেখা দেয়। এ ছাড়াও, বিভিন্ন রকম ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ফলস্বরূপ এমনটা দেখা দিতে পারে।  

গবেষণা থেকে জানা গেছে, গর্ভাবস্থায় প্রায় ৭৮ শতাংশেরই নিদ্রাহীনতার সমস্যা দেখা দেয়। গর্ভধারণের তিন মাসের মাথায় এই ধরনের সমস্যা হয়। কারণ এই সময় সন্তান বৃদ্ধি পায় এবং শরীরের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়।

মানসিক চাপ ঘুমের সমস্যা সৃষ্টি করে। উদ্বেগ ও হতাশা অনিদ্রার সৃষ্টি করে। এমনটা দেখা দিলে থেরাপি নেওয়ার প্রয়োজন।

অতিরিক্ত ক্যাফেইন, নিকোটিন ও অ্যালকোহল ঘুমের সমস্যা সৃষ্টি করে। দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যসমস্যার ঝুঁকি থাকে।

কম ঘুমের জন্য শরীরে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে

হার্টের সমস্যা বাড়ায়

পর্যাপ্ত ঘুম না হলে আমাদের ক্ষুধা দমনকারী হরমোনগুলোর নিঃসরণ কমে যায়, যা শরীরের ওজন বাড়িয়ে তুলতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে হৃদ্‌যন্ত্রের ধমনিতে ক্যালসিয়াম জমতে থাকে। ধমনিতে দীর্ঘদিন এ ভাবে ক্যালসিয়াম জমতে থাকলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। আমরা যখন ঘুমোই তখন আমাদের হৃদপিণ্ড এবং রক্তনালি কিছুটা হলেও বিশ্রাম পায়। কিন্তু ঘুম না হলে বা কম হলে প্রতিনিয়ত কার্ডিওভ্যাসকুলার সমস্যা বাড়তে থাকে। এর ফলে হার্টের সমস্যা বাড়তে থাকে।

মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা কমে

প্রতি দিন পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা কমতে থাকে। মস্তিষ্ক পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশ্রাম না পেলে অতিরিক্ত বিষণ্ণতা, হ্যালুসিনেশন, স্মৃতিভ্রংশের মতো একাধিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। দিনে দিনে নিজের বিচার বিশ্লেষণ করার ক্ষমতাও লোপ পেতে পারে।

শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে

ঘুম মূলত আমাদের শরীরের ক্ষয়ক্ষতি পূরণ ও শক্তি সঞ্চয়ের একটি পন্থা। যখন আমরা ঘুমোই, তখন আমাদের শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য দায়ী ‘লিভিং অরগানিজম’ কাজ করতে থাকে। কিন্তু আমরা না ঘুমোলে এই ‘লিভিং অরগানিজম’গুলো কাজ করতে পারে না। ফলে ক্রমশ আমাদের শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে থাকে।

ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়

দীর্ঘদিন রাতে না ঘুমোনো বা কম ঘুমোনোর ফলে শরীরে ইনসুলিন উৎপাদন ব্যহত হয়। যার ফলে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে থাকে।

উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা

পর্যাপ্ত ঘুম না হলে বা কম হলে বাড়তে পারে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা। চিকিৎসকদের মতে আমরা না ঘুমোলে আমাদের শরীরের ‘লিভিং অরগানিজম’গুলো ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। নষ্ট হতে পারে শরীরের হরমোনের ভারসাম্য। বাড়তে পারে উচ্চ রক্তচাপ, হাইপার টেনশনের মতো সমস্যা।

অনিদ্রা দূর করতে কী করবেন

আরামদায়ক পরিবেশ

ঘুমোনোর আগে আরামাদায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করুন ও মন ভালো রাখে এমন কাজ করুন। রাতে ঘুমোনোর আগে মোবাইল ব্যবহার না করে আরাম করে এক কাপ ক্যামোমাইল চা পান করুন, আরাম অনুভূত হবে।

হালকা রং

বেডরুমে যতটা সম্ভব হালকা রং ব্যবহার করবেন। খুব চটকদার রং ইয়াং শক্তি উত্‍‌পন্ন করে। তাই বেডরুমে সব সময় হালকা রং ব্যবহার করুন।

হালকা রঙের চাদর নয়

বিছানায় কিন্তু হালকা রঙের চাদর পাতবেন না। বিছানায় হালকা রঙের চাদর পাতা থাকলে সব সময় আলস্য বেশি আসবে আপনার। লাল বা গোলাপি রঙের চাদর বিছানায় পাতবেন। এই দুই রং উত্‍‌সাহ এবং ভালোবাসা বাড়ায়।

সফট্‌ আলো 

ঘুমের জন্য বেডরুমে কড়া নয় বরং সফট আলো ব্যবহার করুন। ঘর একেবারে অন্ধকার করে শোয়াই সব চেয়ে ভালো। কিন্তু একেবারে অন্ধকার করতে না পারলে হালকা নীল বা সবুজ আলো ব্যবহার করুন।

বেডরুমে টিভি-কম্পিউটার নয়

অনেকের বাড়ির বেডরুমেই টিভি এবং কম্পিউটার থাকে। ভালো ঘুম চাইলে ওই দুই যন্ত্রকে নিজের বেডরুম থেকে এক্ষুনি বের করে দিন। ফেংশুই মতে, টিভি অত্যধিক পরিমাণে ইয়াং শক্তি উত্‍‌পন্ন করে, যা ঘুমের জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কম্পিউটারও বেডরুমে রাখা একেবারেই বাস্তুসম্মত নয়।

উষ্ণ গরম জলে স্নান

ঘুম না আসার অনেক কারণের মধ্যে একটি কারণ হতে পারে সারা দিনের পরিশ্রমের ক্লান্তি। এমন ক্ষেত্রে উষ্ণ গরম জলে স্নান করলে শরীর আরাম পায়। ঘুমোতে যাওয়ার অন্তত ২ ঘণ্টা আগে উষ্ণ গরম জলে স্নান করা উচিত। এতে শরীর ঠান্ডা হওয়ার সময় পায়।

ম্যাসাজ

শরীরের পাশাপাশি মনকেও শান্ত করে ম্যাসাজ। ব্যথাবেদনা, দুশ্চিন্তা দূর করে। আর এর জন্য সব সময় বাইরে থেকে অভিজ্ঞ লোক বহাল করার প্রয়োজন নেই। বাড়িতে সঙ্গীকে একটু বলে দেখতেই পারেন।

ভেষজ চা

ভেষজ গুণসম্পন্ন চা খাওয়া শরীরের পক্ষে এমনিতেও উপকারী। তা দেহের সমস্ত টক্সিক বের করে দেয়। এতে শরীর শান্ত হয়। ঘুম তাড়াতাড়ি আসে।

ধ্যান

ধ্যান মানুষের মনকে শান্ত রাখে ও মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। নিয়ম মেনে ধ্যান করা হলে ঘুম ভালো হয়।

শরীরচর্চা

গবেষণায় দেখা গেছে, সপ্তাহে পাঁচ দিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট শরীরচর্চা করা হলে ঘুমের মান উন্নত হয়।

বাড়িতেই খুব সহজে এই বিষয়গুলি করে দেখতে পারেন। পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। 

আরও পড়ুন: এই সময়ে ঘরবন্দি শিশুসন্তানের সঙ্গে সময় কাটান, ওদের ভালোলাগা মন্দলাগা বুঝুন

অতিরিক্ত ঘুমও বিপদের পুর্বাভাস, সতর্ক হোন এই পথে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.