অরিত্র খাঁ, পুষ্টিবিদ

বসন্ত জাগ্রত দ্বারে। কোকিল কুহু করে ডাকা শুরু করে দিয়েছে। আমের গাছে মুকুল এসেছে। সব থেকে বড় কথা অফিস বেরোলে কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম চোখে পড়ছে। মোটামুটি ভাবে বসন্তকাল টাকে শুধু ক্যালেন্ডারে রেখে বলা যেতেই পারে গরম চলে এল। গরম মানেই আম, বেলের সরবত, তরমুজ, আখের রস ঢুকে পড়ে খাদ্য তালিকায়। খাওয়ার সময় খেয়ে নিই কিন্তু জানেন কি গরমের কোন ফল কী উপকার করে?

আম

আম আদমি বা মহাপুরুষ আম পছন্দ করেন না এমন মানুষ পাওয়া দূর্লভ। আমের আয়রন, আঁশ, পটাশিয়াম, ভিটামিন সি ও খনিজ উপাদান শরীর সুস্থ সবল রাখতে সাহায্য করে। ক্যারোটিন চোখ সুস্থ রাখে, সর্দি-কাশি দূর করে। আম কর্মশক্তি যোগায়। এতে রয়েছে কার্বোহাইড্রেট। আরও আছে আয়রন যা অ্যানিমিয়া প্রতিরোধ করে। ক্যালসিয়াম হাড় সুগঠিত করে, হাড় ও দাঁতের সুস্থতা বজায় রাখে। আম থেকে ভিটামিন সি পাওয়া যায়। ভিটামিন সি স্কার্ভি রোগ প্রতিরোধ করে। দাঁত, মাড়ি, ত্বক ও হাড়ের সুস্থতা রক্ষা করতেও সাহায্য করে ভিটামিন সি। আমে থাকা পটাশিয়াম রক্তস্বল্পতা দূর করে ও হৃদযন্ত্র সচল রাখতে সাহায্য করে। এই ফলের আঁশ, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ যা হজমে সহায়তা করে। এছাড়াও ক্যারোটিন, আইসো-কেরোটিন, এস্ট্রাগ্যালিন, ফিসেটিন, গ্যালিক এসিড ইত্যাদি এনজাইম ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। আম কোলন ক্যান্সার, স্তন ক্যান্সার, রক্তাল্পতা ও প্রোস্টেট ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়তা করে। তাছাড়া আম ত্বক উজ্জ্বল করতেও সাহায্য করে। পাকাআম আঁশসহ খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়। পাকা আম রক্তে কোলেস্টেরলের ক্ষতিকর মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। ঘামের কারণে শরীর থেকে সোডিয়াম বের হয়ে যায়। কাঁচা আম খেয়ে শরীরের সোডিয়ামের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব। গরমের কারণে হওয়া স্ট্রোকের সম্ভাবনা কমায়। তবে অতিরিক্ত আম খাওয়া ডায়াবেটিস রোগীর জন্য ক্ষতিকর।

তেঁতুল

শুধু খাওয়ার জন্য তেঁতুল মোটেও তেমন জনপ্রিয় নয়। তবে বসন্তকালীন এই ফলটির উপকারিতাও কিন্তু বেশ নজর কাড়া। হৃদরোগসহ বিভিন্ন রোগে খুব উপকারী। তেঁতুল দেহে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে। রক্তে কোলস্টেরল কমানোর কাজে তেঁতুলের আধুনিক ব্যবহার হচ্ছে। ভেষজবিদদের মতে, নিয়মিত তেঁতুল খেলে শরীরে সহজে মেদ জমতে পারে না। এতে টারটারিক এসিড থাকায় খাবার হজমে সহায়তা করে। গ্যাস রোধে তেঁতুলের শরবত খুব উপকারী।  স্কার্ভি,কোষ্ঠবদ্ধতা, শরীর জ্বালা করাসহ প্রভৃতি রোগে তেঁতুলের শরবত খুব ভালো। তেঁতুল মেদ-ভুঁড়ি কমায়। পেটে গ্যাস হলে তেঁতুলের শরবত উপকারী। পাকা তেঁতুল খিদে বাড়ায় । তেঁতুল বীজের শাঁস পুরনো পেটের অসুখ সারায়। মুখের ভিতরে ঘা বা ক্ষত হলে পাকা তেঁতুল জলে কুলকুচি করলে উপকার পাওয়া যায়।

তরমুজ
গরম কালে ফ্রিজে রাখা ঠান্ডা তরমুজ, অনেক সময় জনপ্রিয়তার দিক থেকে আমকেও হার মানায়। তরমুজে প্রচুর পরিমাণে জল থাকার জন্য এই ফল শরীরের জলশূন্যতা দূর করে যৌনশক্তি বাড়ায় ,একটি তরমুজে প্রচুর পরিমাণে সিট্রোলিন নামের অ্যামাইনো এসিড থাকে যা ভায়াগ্রার বিকল্প হিসেবে কাজ করে। তরমুজে আছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা অক্সিডেটিভ স্ট্রেসজনিত অসুস্থতা কমায়। এ ছাড়াও নিয়মিত তরমুজ খেলে প্রোস্টেট ক্যান্সার, কোলন ক্যান্সার, ফুসফুসের ক্যান্সার ও স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে যায়। তরমুজে আছে ক্যারোটিনয়েড। আর তাই নিয়মিত তরমুজ খেলে চোখ ভালো থাকে। তরমুজ ওজন কমাতে সহায়তা করে। একটি তরমুজে প্রচুর পরিমাণে সিট্রোলিন নামের অ্যামাইনো এসিড থাকে যা শরীরকে প্রতিমুহূর্তে শরীর সতেজ রাখতে সহায়তা করে। হাড়ের জন্যও তরমুজ বেশ ভালো তবে রাতের বেলায় তরমুজ খাওয়া উচিৎ নয় কারণ তরমুজ খুব সহজে হজম হয় না এবং হজমে কোনো রকম সাহায্য করে না। রাতে আমাদের পরিপাকক্রিয়া ধীর গতিতে হয়, তাই রাতে তরমুজ খেলে পর দিন সকালে পেট খারাপ হয়ে যেতে পারে। তরমুজের মধ্যে প্রচুর পরিমাণ ন্যাচারাল সুগার থাকে। তাই রাতে তরমুজ খেলে শরীরের ওজন বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

আখের রস

গরম কালের অতি সাধারণ একটা দৃশ্য হলো, রাস্তার মোড়ে মোড়ে আখের রসের দোকান। আখ এই মৌসুমেই বেশি পাওয়া যায়। আখের রস সম্পর্কে অনেক ইতিবাচক ধারণা প্রচলিত আছে। তবে পুষ্টিবিদদের মতে আখের রসে কোনো উন্নত পুষ্টিমান নেই! আখের রস প্রস্রাব বৃদ্ধি ও পরিষ্কার করে বলে অনেকের ধারণা। অনেকের ধারণা এটা জন্ডিস ভালো করে। ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। উল্টে আখের রস আপনার ওজন বৃদ্ধিতে একটা মারাত্মক ভূমিকা রাখতে পারে। একই সাথে অতিরিক্ত চিনির কারণে দাঁতেরও ক্ষতি হয় অনেক। তাই বলে একেবারেই যে এর কোনো উপকারিতা নেই, তা কিন্তু নয়। আখের মধ্যে যে শর্করা বা ফ্রুকটোজ রয়েছে সেটা উপকারী। বিশেষ করে যারা অতিরিক্ত পরিশ্রম করেন তাদের জন্য উপকারী। বাড়ন্ত শিশুদের জন্যও আখ উপকারী। কারণ এতে রয়েছে ১৫ শতাংশ প্রাকৃতিক চিনি, খনিজ লবণ ও ভিটামিন। কিন্তু একজন সাধারণ পূর্ণ বয়স্ক মানুষের আখের রস দৈনিক পান না করাই ভালো।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here