ডাঃ অরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়

ভাগাড় কাণ্ড একটু নাড়া দিলেও খাদ্যাভ্যাসের দিক থেকে আমরা কিন্তু অন্ধ অনুকরণ করি পাশ্চাত্যের। আর তারই খেসারতে সবার অজান্তে বিদেশের রোগটিকে সাদরে বরণ করে এনেছি আমাদের দেশে। আলসারেটিভ কোলাইটিস হচ্ছে পেটের প্রদাহজনিত যন্ত্রণাদায়ক সমস্যা। এর ফলে বৃহদন্ত্র ও কোলনে ঘা হয় যা রোগীর পেটে অসহ্য ব্যথার সৃষ্টি করে।  অনেক সময় এই দুই অসুখের মধ্যে পার্থক্যই করা যায় না। এই দুই অসুখকে একসাথে ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজিজ  বলা হয়।

রোগের কারণ:

সাধারণত ২০ থেকে ৪০ বয়সিরা আলসারেটিভ কোলাইটিসে ভোগেন। বংশগতির সঙ্গে এই রোগের সম্পর্ক রয়েছে। ধূমপায়ীদের আলসারেটিভ কোলাইটিস বেশি হয়। কোলনের ভেতরের অর্থাৎ মিউকোসা দুর্বল হলে এ রোগ হতে পারে।

উপসর্গসমূহ:

১. ঘন ঘন পাতলা পায়খানা হয়।

২. মলদ্বার দিয়ে অনেক সময় মিউকাস বের হয়।

৩. পায়খানার সঙ্গে রক্ত যায়।

৪. মলদ্বারে ব্যথা হতে পারে।

৫. তল পেট মোচড় দেয় এবং অনেক সময় তীব্র পায়খানার বেগ হয়।

৬. পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাওয়ার ফলে রোগীর রক্তশূন্যতা দেখা দেয়।

৭. অরুচি ও অস্বস্তি হতে পারে।

৮. ওজন কমে যেতে পারে।

৯.  রোগীর জ্বর থাকে এবং হৃদপিন্ডের গতি বৃদ্ধি পায়।

আরও পড়ুন: ডাক্তারের চেম্বার থেকে: টানা কম্পিউটার ব্যবহারে চোখের সমস্যা

চিকিৎসা না করালে নিম্নলিখিত জটিলতা দেখা দিতে পারে

১. কোলনে তীব্র প্রদাহ হতে পারে ও কোলনে ক্যান্সার হতে পারে।

২. কোমর, মেরুদন্ড ও হাঁটুতে ব্যথা হতে পারে।

৩. ফিস্টুলা দেখা দিতে পারে।

৪. চামড়ার মধ্যে বিভিন্ন লাল দাগ অথবা আলসার হতে পারে।

৫. মুখ এবং হাত পায়ে জল আসতে পারে।

৬. চোখে প্রদাহ হয় এবং চোখ অন্ধ হয়ে যেতে পারে।

৭. জন্ডিস হতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত লিভার নষ্ট হয়ে যায়।

এই রোগে আক্রান্ত হলে কী করবেন?

স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাওয়া
সুস্বাস্থ্যের মূল ভিত্তি হচ্ছে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার বেগুন, আলু, মরিচ ও টমাটো এই রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। চিনি বাদ দিন। কারণ চিনি অগ্নাশয়ের প্রদাহরোধী এনজাইমকে বাধা দেয়।

নিয়মিত ব্যয়াম

আলসারেটিভ কোলাইটিসের সাথে যুক্ত বিভিন্ন জটিলতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে ব্যয়াম। এই জটিলতাগুলো হচ্ছে, হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়া, ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হয়ে, আবেগীয় সমস্যা, স্ট্রেস ও ওজন। তবে অতিরিক্ত ব্যয়াম করা থেকে বিরত থাকুন।

স্ট্রেস কমান
গবেষণায় দেখা যায় যে, আলসারেটিভ কোলাইটিসের সমস্যাকে বৃদ্ধি করে স্ট্রেস। পেটের সমস্যা আক্রান্ত ৭৪ শতাংশ মানুষের উপসর্গগুলোকে খারাপ করে মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। সুতরাং স্ট্রেস কমান।

থেরাপি
থেরাপিস্টের সাহায্য নিলে আলসারেটিভ কোলাইটিসের লক্ষণ গুলোকেকমানো যায়। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে থেরাপি পেটের ব্যথা কমাতে পারে।

ফাইবার
উচ্চমাত্রার ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করলে আলসারেটিভ কোলাইটিসের রোগীদের জন্য উপকারী হতে পারে। এর ফলে নিয়মিত শরীর থেকে বর্জ্য নিষ্কাশিত হয় এবং এর সঙ্গে সঙ্গে বিষাক্ত ও রাসায়নিক উপাদান ও বের হয়ে যায়।

চিকিৎসা

সাধারণত স্টেরয়েড দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, এই রোগে ওষুধ দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহার করলে শরীর ও মুখ ফুলে যেতে পারে, মাথার চুল পড়ে যেতে পারে, অনিদ্রা, অরুচি হাতে পায়ে জ্বালা পোড়া এবং বমি বমি ভাবসহ নানাবিধ শারীরিক অসুবিধা দেখা দেয়। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে অপারেশন লাগতে পারে। তবে আশার কথা হল সবার ক্ষেত্রে অপারেশন লাগে না। যাদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার পরেও কাজ হয়না, যখন ক্যান্সার ধরা পড়ে, রক্তশূন্যতা দেখা দেয় এবং যখন স্টেরয়েড এবং অন্যান্য ওষুধ আর কাজ করেনা তখন অপারেশন করা হয়। কেউ যদি খুব দুশ্চিন্তা  করে এবং দুধ জাতীয় খাবার বেশি খায় তবে আলসারেটিভ কোলাইটিসের উপসর্গ বারবার হতে থাকে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here