ডাঃ কল্যাণব্রত দাস, জেনারেল মেডিসিন

রকেট গতিতে এগোচ্ছে সন্দীপন। ত্থুরি স্যান্ডি। এগোতে এগোতে ওয়ালেটের সঙ্গে বেড়ে যাচ্ছে মধ্যপ্রদেশ। ইদানিং লক্ষ্য করছে গা টা গোটাদিন ম্যাজ ম্যাজ করছে। কাজে এনথ্রু তেমন পাচ্ছে না। পিয়ালির জোরাজুরিতে পৌঁছাল ডাক্তারের চেম্বারে। কোলেস্টেরল। কোলেস্টেরল হল ভারী ফ্যাটি এসিড। লিপিড প্রোফাইল টেস্ট করলে দেখা যাবে যে আমাদের দেহে ৫ রকমের কোলেস্টেরল আছে। এর মধ্যে হাই ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন, ভালো কোলেস্টেরল। বাকি গুলো দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কোলেস্টেরল হওয়ার পিছনে বংশগত কারণের সাথে আমাদের দৈনন্দিন জীবনও দায়ী। ফাস্ট ফুড, অনিয়মিত খাওয়া দাওয়া, বসে বসে কাজ করা, ডায়াবেটিসের মতো সমস্যাও এর জন্য দায়ী। দেহে ক্যালরির পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে সেই অনুযায়ী যদি তা বার্ন আউট না করা হয় তাহলে কোলেস্টেরলের সমস্যা দেখা দিয়ে থাকে। আবার অনেক সময় কোলেস্টেরল বৃদ্ধি পাওয়ার পিছনে কোনো কারণও থাকে না।

হাই কোলেস্টেরল কেন বিপদের কারণ : কোলেস্টেরল বেশি থাকলে করোনারি হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি থেকে যায়। আলঝাইমার রোগের ঝুঁকিও উঁচুমান কোলেস্টেরল। আমরা জানি রক্তে উচ্চমাত্রায় কোলেস্টেরল থাকলে ধমনীগ্রাত্রে চর্বি জমে, রক্ত প্রবাহ বাধা পায়, এবং তা হার্টের অসুখে পরিণত হয়। হৃদপেশির বিশেষ অঞ্চলে রক্ত প্রবাহ কমে গেলে সে অংশটিতে ঘটে হার্ট অ্যাটাক।

রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে যে ধরনের খাবার খেতে হবে

১. অলিভ অয়েল প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় যোগ করুন। এই তেলে রয়েছে মনো-আনসেচুরেটেড ফ্যাটি এসিড ও ভিটামিন ই। দেখা গেছে, মনো-আনসেচুরেটেড ফ্যাটি এসিড দেহের খারাপ কলেস্টেরল এলডিএলকে কমায় এবং ভালো কোলেস্টেরল এইচডিএলকে বাড়াতে সাহায্য করে।

২. যদি আপনি রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণকে কমাতে চান, তাহলে ননিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবার বাদ দিতে হবে। ননিবিহীন দই বিশেষত প্রোটিনের জন্য খুব ভালো উৎস। এ ছাড়া এ থেকে আপনি পেতে পারেন ক্যালসিয়াম, ল্যাকটোব্যাসিলাস মাইক্রো-অর্গানিজম; যেগুলো কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে।
৩. সব ধরনের সবজি ও ফল আপনার কোলেস্টেরলের মাত্রাকে কমাতে সাহায্য করে। বিশেষত যেসব সবজিতে ভিটামিন সি ও বিটা ক্যারোটিন রয়েছে সেগুলো বেশি খেতে হবে।
ভিটামিন সি : ভিটামিন সি তে রয়েছে সব ধরনের সাইট্রাস ফলে। যেমন : কমলা, গ্রেপফল, লেবু ইত্যাদি। সব ধরনের বেরি জাতীয় ফল। যেমন : ক্র্যানবেরি, স্ট্রবেরি, ব্ল্যাকবেরি  ইত্যাদি। পেয়ারা ও আমের মধ্যেও ভিটামিন সি পাওয়া যায়। এ ছাড়া ক্যাবেজ বা বাঁধাকপি পরিবারের খাবারেও আছে ভিটামিন সি। ভিটামিন সি-এর আরেকটি ভালো উৎস হচ্ছে লঙ্কা।

বিটা ক্যারোটিন : গাঢ় হলুদ ফলে বিটা ক্যারোটিন রয়েছে। যেমন : হলুদ পিচফল, কাঁঠাল ইত্যাদি। সবজির মধ্যে যেমন : কুমড়া, মিষ্টি আলু, কাঠবাদাম, গাজর ইত্যাদির মধ্যেও বিটা ক্যারোটিন রয়েছে। এ ছাড়া গাঢ় সবুজ সবজি যেমন: ব্রকোলি, পাতাকপি ইত্যাদি খেতে হবে শরীরে বিটা ক্যারোটিনের চাহিদা পূরণ করার জন্য।

যদি আপনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন এবং কোলেস্টেরল বৃদ্ধি পায় তবে অবশ্যই নিয়মিত খাদ্যতালিকায় এগুলো রাখতে হবে।

৪. গবেষকরা বলছেন, রসুন, পেঁয়াজ ও পেঁয়াজজাতীয় খাবার শরীরে বাজে কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমায় এবং হৃৎপিণ্ডকে ভালো রাখে।

৫. সব ধরনের অপ্রক্রিয়াজাত দানাজাতীয় খাবারে ভিটামিন বি ও মিনারেলস রয়েছে। এগুলো চর্বি ও কোলেস্টেরল কমায়। প্রত্যেকদিন ডায়েটে ওটমিল রাখলে তা আমাদের শরীরের জন্য খুবই উপকারী। ওটস-এর মধ্যে রয়েছে হাই সলিউবল ফাইবার যা কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে বেশ কার্যকর।
৬. একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সপ্তাহে তিনদিন অথবা এর বেশি সময় মাছ খায়, তাদের শরীরে খারাপ কলেস্টেরল কম থাকে। যারা উচ্চ রক্তচাপ এবং বিভিন্ন হৃদরোগে ভুগছেন তাদের জন্য মাছ খুব উপকারী। তৈলাক্ত মাছ যেমন ইলিশ, কই, পাঙ্গাস কম খেয়ে ছোট ও কম তেলের মাছ খাওয়া ভালো। স্যামন, টুনা কিংবা সার্ডিন জাতীয় মাছে প্রচুর পরিমানে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে। যা আমাদের রক্ত এবং হৃদপিন্ডকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। সপ্তাহে ২ থেকে ৩ বার এই মাছ খেলে উচ্চ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমে।

৭. দেহে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রনে রাখতে রেড মিট, ফ্যাটি জাঙ্ক ফুড ইত্যাদি খাবারগুলো খাদ্য তালিকা থেকে সম্পূর্ণ ভাবে বাদ দিতে হবে। রেডমিট না খেয়ে আপনি মুরগির মাংস খেতে পারেন।

জীবন যাত্রায় সংযম  আনুন

নিয়ম মেনে খাওয়াদাওয়া করলেই আপনার দায়িত্ব মোটেও শেষ হয়ে যায় না। কোলেস্টেরল থেকে বাঁচতে প্রথমেই বাইরের খাবারকে টাটা বলে দিন। প্রথম প্রথম একটু মন খারাপ হবে বটে। ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের কথা মনে পড়বে কিন্তু শরীর ঠিক রাখতে একটু না হয় ত্যাগস্বীকার করলেন। যে কোনও নেশা থেকে নিজেকে দূরে রাখুন। আরে মশাই পয়সা খরচা করে শরীর খারাপ করার কোনও মানে হয়? শেষ এবং সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সপ্তাহে পাঁচদিন এক ঘন্টা করে বাইবাই করে হাঁটুন। শরীর ভালো থাকবে জীবনটাও আগের থেকে মসৃণ হয়ে উঠবে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here