খবরঅনলাইন ডেস্ক: ভালো গান শুনলে সত্যিই মন ভালো হয়ে যায়। গান শুনতে শুনতে আমরা হারিয়ে যেতে পারি স্মৃতির সরণি বেয়ে অনেক দূর। তাতে কিছুক্ষণের জন্য অন্যমনস্ক হলেও মন কিন্তু শান্ত হয়ে যায়। অতিমারির জেরে আজ আমরা ঘরবন্দি। আমাদের জীবন থেকে আনন্দগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে। আর এই লকডাউনের জেরে ভয়, আতংক, অস্থিরতা এবং একাকিত্ব সব চেপে বসেছে মানুষের উপর। করোনা আমাদের প্রিয়জনদের থেকে দূরে করে দিয়েছে। আমরা কাজ হারানোর আশঙ্কায় ভুগছি। তারও পর একঘেঁয়ে ওয়ার্ক ফ্রম হোম অফিসের কাজ।আর শরীর স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তিত। ঘরে-বাইরের প্রবল মানসিক চাপে মানসলোকের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে আমরা চূড়ান্ত নেতিবাচক পরিণামেরর শিকার হচ্ছি। ফলত আমরা অবসাদে ভুগছি।

অবসাদের কবলে পড়ে মানুষ চূড়ান্ত হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। দৈন্দনিন কাজকর্মের আগ্রহ কমে যায়। আনন্দ পাওয়ার অনুভূতি ভোঁতা হয়ে যাওয়ার কারণে কোনো কিছুই আর একদম ভালো লাগে না। রোগীর মনের অবস্থা এতটাই নেতিবাচক হয়ে ওঠে যে, সে বিশ্বাস করতে শুরু করে, এই হতাশাব্যঞ্জক পরিস্থিতির আর কিছুতেই পরিবর্তন হবে না। সব কিছুতেই খিটখিটে মেজাজ, বিরক্তিভাব, ভিতরে ভিতরে চূড়ান্ত অস্থিরতা গ্রাস করে। অসম্ভব ক্লান্তি ভাব, কোনো কাজে মনঃসংযোগ ধরে রাখতে পারে না। জীবনে ঠিকঠাক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করে বসে।

এই কঠিন পরিস্থিতিতে হতাশাগ্রস্ত না হয়ে নিজেকে একটু সময় দিন। মন ভালো করতে শুনুন গান। যে গান আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। আপনার মধ্যে পজিটিভিটির সঞ্চার করবে। গান শোনার জন্য আলাদা সময় বের করতে হয়। যাতে পুরো আপনার মনোযোগ গানের প্রতিই থাকে। প্রতি দিন ১০ থেকে ২০ মিনিট মিউজিক (music) ব্রেক নিলে মস্তিষ্কের কোষ উজ্জীবিত হয়। গানের এতটাই শক্তি, যে মনের দিক-পরিবর্তনে যখন ওষুধ, ডাক্তার, প্রিয় বন্ধু সবাই ব্যর্থ তখন একটা মিঠে সুর পারে সব ভুলিয়ে নিমেষে জীবনকে আবার নতুন ছন্দে বেঁধে দিতে। এখানেই মিউজিক থেরাপির সার্থকতা।

মিউজিক থেরাপির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় রয়েছে তার বিস্তর প্রমাণও। মস্তিষ্কের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে পৌঁছে যায় সুর, দেয় এক অনাবিল শান্তি ও তৃপ্তি। মনের চাপ দূর করে। এক অদ্ভুত অনুভূতি জাগিয়ে তোলে শরীরে, মনের খোরাকই হয় সুর। সেই তালে তাল মেলায় মন।

করোনা অতিমারির ভয়াবহতা মানুষের মনকে করে তুলছে দুর্বল। তাই মন দুর্বল হয়ে পড়ায় তাদের শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটছে – এমনটাই জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। গানের সুর, তাল, শব্দ দিয়ে মন ভালো রাখতে হবে। এই কঠিন পরিস্থিতিতে সব থেকে বেশি প্রয়োজন মানুষের মন ভালো রাখা।

গত দু’ দিন আগে দেখা গেছে, করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করা রোগীদের বাঁচার দিশা দেখাচ্ছেন মুর্শিদাবাদ করোনা হাসপাতালের চিকিৎসকরা। মিউজিক ফেরাপি দিয়ে চলছে করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসা। কাচের ঘরের বাইরে থেকে গান গাইছেন একদল চিকিৎসক, নার্স। আর ওই গান শুনতে শুনতে কাচের ঘরের ভিতর বেডে শুয়ে জীবনীশক্তি সঞ্চয় করছেন কোভিড আক্রান্তরা।

মিউজিক থেরাপি

রোগীকে যখন গান, বাদ্যযন্ত্র বা মধুর আওয়াজ শুনিয়ে তাঁর অসুখ বা রোগের তীব্রতা কমানোর চেষ্টা করা হয় সেটাকে মিউজিক থেরাপি বলে। তবে শুধু মিউজিক থেরাপি করেই রোগ পুরোপুরি সেরে যায় তা নয়। অন্যান্য চিকিৎসাপদ্ধতির সঙ্গে সঙ্গে মিউজিক থেরাপি করলে তবেই ফল মেলে। রোগী সুস্থ হয়। বেশির ভাগ মানসিক রোগীদের সুস্থ করতে মিউজিক থেরাপি ব্যবহার হয়। মিউজিক থেরাপি আমাদের শারীরিক, সামাজিক, আবেগ-অনুভুতি সংক্রান্ত এবং চেতনাবুদ্ধি্তেও সাহায্য করে। সঠিক মিউজিক ও ভলিউম একাধারে মেডিক্যাল সমস্যার নিরাময়ের সঙ্গে স্নায়ু শিথিল করে ও জীবনের মানোন্নয়ন করে। 

মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া

আমাদের মস্তিষ্ক মিউজিকের ছন্দের প্রতি সাড়া দেয়। মিউজিকের ধীর লয় আরাম দেওয়ার মতন করে মস্তিষ্কের তরঙ্গকে ধীরে করে দেয়। দ্রুত লয়ের মিউজিক মস্তিষ্ককে উদ্দীপিত করার পাশাপাশি উত্তেজিত করে তোলে।

মানসিক উপলব্ধি 

সংগীত আমাদের মানসিক অবস্থানকে স্পর্শ কিংবা টোকা মারতে পারে। নির্দিষ্ট কোনো একটা ট্র্যাক শুনলে সেটা দুঃখী করতে পারে কিংবা মুখে হাসিও ফোটাতে পারে। মানসিক উপলব্ধির নাগাল পাওয়ার এই সহজ পদ্ধতি কিন্তু থেরাপিস্টদের সাহায্য করে প্রবল চাপ, বিষণ্ণতা ও দুশ্চিন্তার সমস্যায় ভোগা লোকদের চিকিৎসায়।

মনঃসংযোগ বাড়ায়

সংগীত মনঃসংযোগ বাড়ায়। থেরাপিস্ট মনোযোগ এবং আবেগ-ঝোঁককে তাক করে এবং লক্ষ্য নিয়ন্ত্রণ করে, আপনার যে আবশ্যিক দক্ষতা দরকার সেটা হল কাজ করা এবং সফল হওয়া।

থেরাপির উপকারিতা 

মানসিক চাপ বা স্ট্রেস কমায়  

এই ক্ষেত্রে রোগীকে রিলাক্সেশন থেরাপি দেওয়া হয় যেটা মূলত মিউজিক থেরাপির সঙ্গে বিভিন্ন ছবি (গাইডেড ইমাজেরি) দেখানো হয়। এই ভাবে রোগীকে শান্ত করা হয় যাতে সে নিজের ভিতরে যে ঝড় চলেছে বা যে কারণে সে এত অস্থির সেটা চিকিৎসকের কাছে প্রকাশ করে নিজেকে শান্ত করতে পারে।

ডিপ্রেশন বা অবসাদ কমায়

এই ক্ষেত্রে রোগীর কিছু ভালো লাগে না। সব সময় একটা উদাসীনতা দেখা যায়। সে কোনো কিছু করতে চায় না। বয়স্কদের এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে এই রোগ সারাতে মিউজিক থেরাপি খুব কার্যকর।

ঘুমের সমস্যা বা স্লিপ ডিজঅর্ডার দূর করে

যাঁদের সহজে ঘুম আসতে চায় না তাঁদের ক্ষেত্রে মিউজিক থেরাপি খুব কার্যকর। শোওয়ার এক ঘণ্টা আগে থেকে আলো নিভিয়ে বা হালকা আলো জ্বালিয়ে, কোনো লঘু সুরের মিউজিক ব্যাকগ্রাউন্ডে শুনলে মনটা শান্ত হয়ে যায় এবং ঘুম খুব ভালো আসে। সন্তুর, সেতার, পিয়ানোর মিঠে আওয়াজ ঘুমকে ডেকে নিয়ে আসে চোখে।

যন্ত্রণা কমায়

২০১৩ সালের একটি গবেষণায় এ কথা প্রমাণিত হয়েছে যে অসহ্য যন্ত্রণার সময় যদি পছন্দের কোনো গান শোনা যায়, তা হলে কষ্ট কমতে একেবারেই সময় লাগে না। এই কারণেই তো হাসপাতালে একেবারে ঢিমে লয়ে রবীন্দ্রসংগীত বা হালকা লয়ের কোনো গান চালানো হয়ে থাকে। এমনটা করার কারণে চিকিৎসা করাতে আসা রোগীদের মানসিক অবস্থার অনেকটাই যে পরিবর্তন হয়, তা বেশ কিছু কেসস্টাডিতে প্রমাণিত হয়েছে।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার উন্নতি ঘটায়

বেশ কিছু গবেষণায় এ কথা প্রমাণিত হয়ে গেছে যে গান শোনার সঙ্গে আমাদের শরীরের ভালো-মন্দের অনেকাংশেই যোগ রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে তুলতেও গানের যে বিশেষ একটা ভূমিকা রয়েছে সে বিষযে কোনো  সন্দেহ নেই। প্রসঙ্গত, উইলকেস ইউনির্ভাসিটির গবেষকদের করা এক গবেষণায় দেখা গেছে গান শোনার সময় আমাদের শরীরের অন্দরে ‘আইজি-এ’ নামক অ্যান্টিবডির কর্মক্ষমতা বাড়তে শুরু করে। এই অ্যান্টিবডিটি যত শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তত রোগ প্রতিরোধক ব্যবস্থা জোরদার হয়।

শরীরচর্চায় অনুপ্রাণিত করে

গান শুনতে শুনতে যদি শরীরচর্চা করা যায়, তা হলে এক্সারসাইজ করার ইচ্ছা বাড়তে শুরু করে। কারণ গান শোনার সময় মন ভালো হয়ে যায়। আর একবার মন চাঙ্গা হয়ে উঠলে যে কোনো কাজেই যে ১০০ শতাংশ দেওয়ার ইচ্ছা বেড়ে যায়, তা তো আমরা রোজকার জীবনে খেয়াল করেই থাকি, তাই না!

আরও পড়ুন: সারা দিনের পরে রাতে ঘুম আসে না? অনিদ্রার কারণ ও সমাধান

dailyhunt

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন