স্বাস্থ্য সাবধান: হঠাৎ করে ব্লাড প্রেসার? পড়ে দেখুন

0

দীপঙ্কর ঘোষ

আমাদের বুড়ো ডাক্তার শূন্য খুপরিতে বসে আছেন। নিয়নের আলো ওঁর নিটোল টাকে পড়ে পিছলে যাচ্ছে। বাইরে ওঁর পিসিমা, থুড়ি সুন্দরী রিসেপশনিস্ট চোখ বন্ধ করে একটি জনসন বাড দিয়ে কান খোঁচাচ্ছেন। এমন সময় বাইরে প্রচুর চিৎকার শোনা গেল – “আছে আছে হাতুড়ে এখনও আছে…।”

আমাদের বুড়ো ডাক্তার হোমিওপ্যাথি ডাক্তারের মতো রোগীকে সব জিজ্ঞেস করেন, চোখের পাতা টেনে দেখেন, বুকে আঙুল বসিয়ে টরেটক্কা করেন এবং হাতুড়ি ঠুকে ঠুকে রোগীর হাঁটু-টাঁটু খুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন, তাই লোকে ওঁকে হাতুড়ে বলে। 

এক রোগীকে (এখানে লিঙ্গভেদ বা বয়সের বিবরণ দেওয়া হবে না – পাঠক‌ নিজেকেই এই জায়গায় বসাতে পারেন) নিয়ে বাড়ির লোকজন উত্তেজিত হয়ে হাত পা নেড়ে বলতে থাকলেন, “হাতুড়েদা, কাল সন্ধেবেলা ওনার ঘাড়ে ব‍্যথা হয়, হাতপা তাজ্ঝিম মাজ্ঝিম করতে থাকে। তখন আমরা সবাই মিলে পাশের দোকানে গিয়ে প্রেশার মাপাই…।”

দ্বিতীয় জন খেই ধরেন, “দোকানে প্রেশার ওঠে একশো ষাট নব্বুই, ওনার তো এমনিতেই লো প্রেশারের ওষুধ চলে…” (আমাদের বুড্ঢা খাবি খান, এটা ওঁর ফান্ডার বাইরে)।

তৃতীয় ধারাবিবরণী শুরু হয়, “তাপ্পর ওনাকে নিয়ে পাশের দোকানে যাই – (বক্তা চোখ কপাল ছাড়িয়ে সিঁথির ভেতরে সেঁধিয়ে বলতে থাকেন) – ও মাগো! তখন পেশার বেড়ে দুশো বাই একশো – ব‍্যস সোজা হাসপাতাল- সোজা আইসিইউতে। ওখানে স‍্যালাইন ট‍্যালাইন চালিয়ে রেখেছিল (স‍্যালাইন শুনে হাতুড়েদা হাতে চ‍্যানেলটা দেখে নিজের চোখ‌ও টাকের টং-এ চড়িয়ে ফেলেন)। তাপ্পর বড়ো ডাক্তারসাহেব বললেন যে ওনাকে এখন ক’ দিন অবজারভেটরিতে রাখতে হবে। তাই আমরা চলে এলাম। হাতুড়েদা আমরা গরিব মানুষ।”

আরও পড়ুন: স্বাস্থ্য সাবধান: প্রেসার বাড়লে কী ওষুধ খাব?

এর পর সবাই সমস্বরে চেঁচাতে থাকে, “হাতুড়েদা, ইদিকে দেখুন রোগী চোখ উলটে দিচ্ছে – কিরম হাঁসফাঁস করছে – ও মাগো এই বুঝি গেল…।”

বাড়ির এক জন আর সঙ্গের এক জনকে রেখে বাকিদের ঠেলে খুপরি থেকে বার করে ক‍্যাঁচকোঁচ শব্দে দরজা বন্ধ করে ডাক্তার হাঁফ ছাড়েন।

“কী মশয় (বুড়ো নারী পুরুষ নির্বিশেষে ডাক্তার সবাইকেই মশয় বলেন), এ বার আপনাকে দেখা যাক, কী বলেন?” রোগী গোলগোল চোখে ডাক্তারের মুখপানে চেয়ে থাকেন।

ডাক্তার সঙ্গের দু’জনকে বলেন, “আপনাদের মধ‍্যে কেউ নাড়ি মানে পালস দেখতে পারেন?” সমঝদার সঙ্গী বলেন, “হ‍্যাঁ, পারি।”

ডাক্তার ইতিমধ্যে দেখেছেন রোগীর নিশ্বাস-প্রশ্বাসের হার কমে স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে এবং দেখেও একটু স্বাভাবিক লাগছে। ডাক্তার ঘোষণা করেন, “আপনি মশয় এখনই মরছেন না।”

সমঝদার জানান উনি নাড়ি পেয়েছেন। ডাক্তার চমৎকার রকমের খুশি হয়ে ওঠেন।

এ বার উঠে রোগীর হাতে যন্ত্রের ফিতে বাঁধতে শুরু করেন, “মশয়, কাল আপনি ধান‍্যকুড়ির মোড়ে কার সঙ্গে কপাকপ ফুচকা সাঁটাচ্ছিলেন?”

রোগী পরম বিস্ময়ে আঁতকে ওঠেন, “আমি…ফুচকা?”

ডাক্তার একটা মিচকেপটাশের মতোন হাসি দিয়ে বলেন, “আপনি…আপনি নন?” বলছেন, আবার ফুসফুস করে ফিতেয় পাম্প করে করে হাওয়াও ভরছেন।

“আজ্ঞে আমি সারা জীবনেও ফুচকা খাই না।”

ইতিমধ্যে সমঝদারমশয় বললেন, “হাতুড়েদা, আর আমি পালস পাচ্ছি না।”

ডাক্তার হাওয়া ছাড়তে ছাড়তে (কোনো খারাপ অর্থে ধরা চলবে না) বলেন, “কতোয় আবার নাড়ি পান সেটা যন্ত্রে দেখে বলুন” আর রোগীকে বলেন, “কী মুশকিল! আমার তো মনে হল ওটা আপনিই বটে…এক‌ই ড্রেস…।”

রোগী বলেন, “কাল আমি গোবরডাঙায় ছিলাম…আমার বলে গ‍্যাসের ব‍্যামো…হুঃ ধান‍্যকুড়িতে ফুচকা? হাঃ।”

সমঝদার বলেন, “একশো বাইশ হাতুড়েদা…এটাই কি ওপরের প্রেশার? কিন্তু কিন্তু কিন্তু… একটু আগেই যে বড়ো ডাক্তারবাবু বললেন…।”

সব সুস্থির হলে রোগী বললেন, “হাতুড়েদা, এটা কি ব‍্যাপার হল যদি টুকুসখানি বুঝিয়ে বলেন…।”

আরও পড়ুন: স্বাস্থ্য সাবধান: জ্বরজারির গল্প

ডাক্তার একটু নাক খুঁটে নিয়ে বলতে আরম্ভ করেন, “আমাদের শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তচাপ ঠিক রাখে এই সব ধমনী আর শিরা। হৃদপিণ্ড একটা নির্দিষ্ট চাপে বা শক্তিতে ধমনী দিয়ে রক্ত পাঠাচ্ছে। এ বার বলুন তো, ধমনী যদি রবারের হত তা হলে রক্তের চাপে ওগুলো বেলুনের মতো ফুলে উঠত, আর যদি লোহার হত, তা হলে হাত-পা নাড়তে পারতাম না আরও মেলা ঝামেলা হত – তাই না?”

সক্কলে সম্মতিসূচক মুন্ডু নাড়ে।

ডাক্তার বকবকানি চালিয়ে যান, “এগুলো পেশি দিয়ে তৈরি – মানে মাসল দিয়ে।”

একজন বাড়ির লোক সামান্য প্রতিবাদ জানান, “মাশুল? এই সব শিরা?” বলে নিজের বাইসেপে হাত বোলান।

হাতুড়ে বলতে থাকেন, “এরা চেপে ধরলে হৃদপিণ্ডকে বেশি জোরে পাম্প করতে হয় আর ঢিলে দিলে রক্তচাপ কমে যায় – আসলে রক্ত কতটা চাপ দিয়ে নিজের রাস্তা তৈরি করে যেতে পারে – সেটাই রক্তচাপ।”

রোগী কিন্তু ভোলবার নয়, “কিন্তু আমার কী হয়েছিল?”

ডাক্তার মৃদু গুরুজি মার্কা হাসি দিয়ে ফের শুরু করেন, “বলছি তো মশয়, অত তাড়া দিলে আমার সব গুলিয়ে যায়। শুনুন, সাধারণত একশো ষাট রক্তচাপে আমাদের শরীরে কোনো অসুবিধে বোধ হয় না। এখন কোনো কারণে আপনি ভয় পেলে বা উত্তেজিত হলে শরীরে অ্যাড্রিনালিন বলে একটা হরমোন বেশি বেরোয়। এই হরমোন মোটামুটি দশ সেকেন্ডের মধ‍্যেই একজনের রক্তচাপ দ্বিগুণ করে দিতে পারে। অনেক সময় ডাক্তার দেখাতে গেলে বা মেডিক্যাল সেট আপে গেলে রক্তচাপ বহুত বেড়ে যায়। এটাকে বলে হোয়াইট কোট সিন্ড্রোম বা হোয়াইট কোট হাইপারটেনশন, বাংলায় ‘সাদা জামার রক্তচাপ’ বলা যায়। আপনার এটাই হয়েছিল। এ ছাড়াও বয়সজনিত প্রাথমিক রক্তচাপ, অসুখজনিত রক্তচাপ – এ সব‌ও হয়। কিন্তু আর বকতে পারি নে বাপু – এ বার ভালো মানুষেরা গাত্রোৎপাটন করুন দেখি।”

রোগী কিন্তু খুশি নন, “একটা প্রশ্ন ছিল। এতে কোনো ক্ষেতি নেই তো?”

ডাক্তার খেঁকশেয়ালের মতো একটুখানি হেসে বলেন, “দেখে তো মনে হচ্ছে বিয়ে হয়েছে – সঙ্গমের চূড়ান্ত সময়ে আমাদের প্রেশার অনেক অনেক বেড়ে যায় – জানেন কি?” সকলেই লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললেন। 

রোগীর বাড়ির লোক হাত জোড় করে বলেন, “হাতুড়েদা আপনি ভগবান।”

ডাক্তার গম্ভীর হয়ে বলেন, “ভগবান? ভগবানের ইংরেজি কী?”

সবাই সমস্বরে বলে, “গড গড গড।”

ডাক্তার হেসে বললেন, “উলটে দেখুন, পালটে গেছে।”

(লেখক একজন চিকিৎসক)

------------------------------------------------
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.