ক্যানসারের চিকিৎসার সময় রোগীরা কী খাবেন আর কী খাবেন না?

0
ক্যানসার
প্রতীকী

ওয়েবডেস্ক : যে সব রোগীর ক্যানসারের চিকিৎসা চলছে তাদের চিকিৎসককে না জানিয়ে কোনো রকম ভেষজ বড়ি বা ওষুধ খাওয়া ঠিক নয়। যদি খান বা খেতে হয়ও সে ক্ষেত্রে ক্যানসার চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত, তাকে বিস্তারিত জানানো উচিত।  এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ তা না হলে চিকিৎসার ভুল ফল হতে পারে, বা ফল ঘুরে যেতে পারে, বা ক্ষতি হতে পারে, বা চিকিৎসা সফল নাও হতে পারে।

“ক্যানসারের চিকিৎসার সময় তারা অন্য কোনো আলাদা ওষুধ খাচ্ছেন কি না, তা চিকিৎসকদের উচিত নিজে থেকেই দায়িত্ব নিয়ে রোগীদের জিজ্ঞাসা করা”, এ কথা বলছিলেন অধ্যাপক কার্দোসো

অধ্যাপক কার্দোসো বলেন, ক্যানসার চিকিৎসার জন্য রোগীরা যদি কোনো অন্য থেরাপি বা চিকিৎসা গ্রহণ করেন, তা হলে সে বিষয়ে তাঁদের চিকিৎসককে অবশ্যই জানানো উচিত। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে তাঁদের ক্ষেত্রে যাঁদের ক্যানসার চামড়ায় ছড়িয়েছে।

তার কারণ হিসাবে তিনি বলেছেন, এমন অনেক পণ্য আছে যেগুলোর কারণে ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হরমোন থেরাপি এবং কেমোথেরাপির ওপর বাধা সৃষ্টি করতে পারে বা রক্ত জমাট বাঁধতেও দেরি করাতে পারে।

ক্যানসার বিশেষজ্ঞ মিস কার্দোসো বলেন, রোজকার জীবনেও এমন বেশ কিছু ভেষজ দ্রব্য আছে যেগুলো রক্ত জমাট বাঁধার ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করে, রক্ত তঞ্জন হতে দেরি করায়।  এমন কিছু খাবারের মধ্যে রয়েছে – রসুন, জিনসেং এবং হলুদ।

বিশেষজ্ঞরা তাই বলছেন, এই রোগের ক্ষেত্রে রোগীর তাই খাবারদাবার বা চিকিৎসা পদ্ধতির ব্যাপারে মূল চিকিৎসকের পরামর্শ অবশ্যই নেওয়া উচিত। কারণ তা না হলে চিকিৎসায় অযাচিত ভাবে বিঘ্ন ঘটতে পারে।

কমলালেবু স্বাভাবিক ভাবে খুবই ভালো একটি খাবার হলেও, ক্যানসার রিসার্চ বলছে, ক্যানসারের চিকিৎসা চলাকালীন মাল্টা এবং কমলালেবুর মতো খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। কারণ, ক্যানসারের ঔষধ শরীরের ভেতরে যে ভাবে ভেঙে কাজ করে, এই খাবারগুলি সেটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

এ ছাড়াও কামরাঙা, বাঁধাকপি এবং হলুদও এই তালিকায় রেখেছে ব্রিটেনের ক্যানসার রিসার্চ সংস্থা।

ব্রিটেনের এই প্রতিষ্ঠানটির মতে, “ক্যানসারের প্রথাগত চিকিৎসার বাইরে যে কোনো ধরনের ওষুধ খাবার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত। বিশেষ করে যদি ক্যানসার চিকিৎসার মাঝামাঝিতে অবস্থান করেন তা হলে তো অবশ্যই।”

তা হলে প্রশ্ন আসতেই পারে ক্যানসার রোগীরা খাবেন কী?

তার জন্য অবশ্যই চিকিৎসকদের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। তা ছাড়া বিভিন্ন গবেষণা থেকে উঠে আসা কয়েকটি খাবারের কথা বলে যেতে পারে, যেগুলি ক্যানসার রোগীদের জন্য উপকারী হতে পারে।

পড়ুন – স্বাস্থ্য সাবধান: স্তন ক্যানসার, কিছু প্রশ্ন, কিছু উত্তর

১) রাঙাআলু – মিষ্টি আলু অর্থাৎ রাঙাআলু বিটা ক্যারোটিন সমৃদ্ধ একটি সবজি। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যদি উচ্চমাত্রায় বিটা ক্যারোটিন শরীরে থাকে তা হলে তা কোলন ক্যানসার, স্তন ক্যানসার, পেট ও ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি অনেকাংশেই কমিয়ে দেয়। আরও প্রমাণিত হয়েছে যে, মহিলারা যদি মিষ্টি আলু বা রাঙাআলুর মতো বিটা ক্যারোটিন সমৃদ্ধ খাবার তাঁদের খাদ্য তালিকায় প্রতিদিন রাখেন তা হলে তাঁদের স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় অর্ধেক কমে যায়।

২) সাওয়ারসপ – সাওয়ারসপ ফল হল ক্যানসার প্রতিরোধক। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, সাওয়ারসপ ফল কেমোথেরাপির চেয়েও দশ হাজার গুণ শক্তিশালী। তাই অতিরিক্ত না খেলে এর  কোনো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই। উল্লেখ্য, এই ফলের গাছের নাম গ্র্যাভিওলা। তবে ফলটি ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন – সাওয়ারসপ, করোসল গুয়ানাবা, গুয়ানাভানা ইত্যাদি। এই গাছের ফল, পাতা, ডাল, ছাল-বাকল এবং শিকড় ক্যানসার-সহ বহু রোগের নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়।

৩) সবুজ শাকসবজি – পালং শাক, লেটুস, হেলেঞ্চা শাকের মতো বহু দেশীয় সবুজ শাকপাতা ক্যানসার-সহ বহু রোগের ক্ষেত্রে উপকারী। এগুলিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ও মিনারেল। তা ছাড়াও এতে আছে অনেক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং এনজাইম। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যে ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই করে এ কথা অনেকেই জানে। এ ছাড়াও রয়েছে  গ্লুকোসাইনোলেটস, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিভাইরাল উপাদান এবং সঙ্গে আছে নিষ্ক্রিয় কার্সিনোজেনস। এই নিষ্ক্রিয় কার্সিনোজেনস টিউমার সৃষ্টি রোধ করে, ক্যানসারের কোষ ধ্বংস করে এবং ক্যানসার স্থানান্তরণে বাধা দান করে। কাজেই প্রতি দিনের খাদ্য তালিকায় সবুজ শাক-পাতা থাকা অবশ্যই দরকার।

৪) কপি জাতীয় সবজি – ফুলকপি, ব্রকোলি, ওলকপি, শালগম, ব্রাসেলস স্প্রাউট ইত্যাদিতে আইসোথায়োসায়ানেটস নামক একটি ফাইটো কেমিক্যাল থাকে। এই ফাইটো কেমিক্যাল ক্যানসার প্রতিরোধে সক্ষম। এ ছাড়াও এতে আছে ক্যানসার রোধে সাহায্যকারী উপাদান অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট।

আরও পড়ুন – ক্যানসারের প্রাথমিক ৫টি লক্ষণ, এগুলি দীর্ঘদিন থাকলেই সচেতন হন! পর্ব ১

৫) বেরি জাতীয় ফল – ব্ল্যাক বেরি, ব্লু বেরি, স্ট্রবেরি, গোজিবেরি, রাস্পবেরি, চেরি, মালবেরি ও কামুকামু-সহ বেরি জাতীয় সকল ফলই এই রোগের ক্ষেত্রে ভালো। এতে আছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এই সব উপাদান ক্যানসার নিরাময়ের পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি করে।

৬) কমলা রঙের ফল –  লেবু, জাম্বুরা, মিষ্টিকুমড়ো, পাকা পেঁপে, গাজর ও স্কোয়াশ ইত্যাদি উজ্জ্বল বর্ণের যে কোনো ফল ও সবজিতে থাকে ক্যারোটিনয়েড অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। বিটা-ক্যারোটিনও। এটি অতি প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, ক্যানসার রোধ করে।

৭) হলুদ – হলুদে রয়েছে ‘কারকিউমিন’। এটি প্রদাহজনিত সমস্যা থেকে মুক্তি দেয়। এটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসাবে কাজ করে। এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মানবদেহের কোষের মধ্যে প্রবেশ করে ভেতর থেকে দেহকে ক্যানসার প্রতিরোধী করে তোলে। তাই কাঁচা বা গুঁড়ো হলুদ খাওয়া যেতে পারে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে খাওয়াই ভালো

৮) অর্গানিক মাংস – কোনো রকম স্টেরয়েড, হরমোন ও অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ না করে বড়ো করা মুরগির মাংস বা তার স্যুপ ক্যানসার রোগীর ক্ষেত্রে বেশ ভালো। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টি গুণ। রয়েছে ভিটামিন বি ১২, সেলেনিয়াম, জিংক ও ভিটামিন বি, এগুলি রক্ত পরিশোধন করে, হজম ক্ষমতা বৃদ্ধি করে ও হরমোনের ভারসাম্য রক্ষা করে।

৯) দুধ ও দুগ্ধজাত খাদ্য – গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, ক্যালসিয়াম রেকটাল ক্যানসার-সহ নানা রকমের ক্যানসার প্রতিরোধে সাহায্য করে। এ ছাড়াও ব্রেস্ট ক্যানসার ও ওভারিয়ান ক্যানসারের ঝুঁকিও কমায়। এ দিকে দুগ্ধজাত খাবার যেমন টক দই, ছানা ইত্যাদি হল প্রচুর পরিমাণ ক্যালসিয়ামের উৎস ও প্রোবায়োটিক। অর্থাৎ এতে প্রচুর পরিমাণ ভালো ব্যাক্টেরিয়ার রয়েছে। প্রোবায়োটিক টিউমার বৃদ্ধি প্রতিরোধ করে। তা ছাড়া গরু ও ছাগলের দুধ, পনির ইত্যাদিতে রয়েছে সালফার প্রোটিন ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট। তাই এগুলি ক্যানসার রোগীর খাদ্য তালিকায় রাখা জরুরি। তা ছাড়া সাধারণ ভাবে দুগ্ধজাত খাবারে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি থাকে। এই ভিটামিন ডি শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণের ক্ষমতা প্রচুর পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়।

১০) মাছ – গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, মাছে আছে ওমেগা থ্রি, ফ্যাটি অ্যাসিড, অ্যান্টিইনফ্ল্যামেটরি, অ্যান্টিটিউমার ও অ্যান্টিক্যানসার উপাদান। কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও বিষাক্ততা কমাতে ওমেগা থ্রি এবং ফ্যাটি অ্যাসিড খুবই ফলপ্রসূ।

১১) গ্রিন টি – গ্রিনটির খাদ্য গুণ প্রচুর। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ক্যানসার রোগীর মৃত্যুর প্রধান কারণ মেটাস্ট্যাসিস। অর্থাৎ ক্যানসার শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়া। গ্রিনটিতে আছে পলিফেনোলিক কম্পাউন্ড, ক্যাটেচিন, গ্যালোক্যাটেচিন এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এই সব উপাদান  ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়, টিউমার বৃদ্ধি রোধ করে ও ক্যানসার মেটাস্ট্যাসিস রুখতে সাহায্য করে।  

১২) মাশরুম – মাশরুম হল উচ্চ পুষ্টিসম্পন্ন দারুণ একটি খাদ্য উপাদান। এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় ও ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই করে।

আরও – ক্যানসারের প্রাথমিক ৫টি লক্ষণ, এগুলির একটিও থাকলে সচেতন হন/ পর্ব-২

১৩) স্বাস্থ্যকর ভোজ্য তেল –  নারকেল তেল, তিসির তেল এবং এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল – এগুলি  পুষ্টি জোগায়। এইগুলি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি করে। তা ছাড়া জলপাই তেলে আছে ফাইটো নিউট্রিয়েন্টস। ফাইটো নিউট্রিয়েন্টস প্রদাহ কমায়, সঙ্গে সঙ্গে ব্রেস্ট ক্যানসার ও কলোরেক্টাল ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়।

১৪) বাদাম জাতীয় – চিনাবাদাম ভিটামিন-ই এর খুব ভালো উৎস। ভিটামিন-ই কোলন, ফুসফুস, যকৃত এবং অন্যান্য অনেক ক্যানসারেরই ঝুঁকি কমায়।

১৫) রঙিন সবজি  – ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে বিভিন্ন রঙিন শাক, সবজিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেমন – পেঁয়াজ, জুকিনি, এস্পারাগাস, আর্টিচোকস, মরিচ, গাজর এবং বীট ইত্যাদি।

তবে সব ক্ষেত্রে সবটা সব সময় প্রযোজ্য ও প্রয়োজনীয় নাও হতে পারে। তাই যে কোনো কিছুই খাবার খাওয়ার আগে বা ব্যবহার করার আগে অবশ্যই চিকিৎসাকারীর পরামর্শ ও অনুমতি নিয়ে নেওয়া ভালো। কারণ এক ধরনের ক্যানসারের ক্ষেত্রে  যেটি জরুরি অন্যটির ক্ষেত্রে সেটি জরুরি নাও হতে পারে, উলটে খারাপও হতে পারে। কারণ রোগের ধরন, পারিপার্শ্বিক সমস্যা, চিকিৎসা পদ্ধতি ইত্যাদি সব কিছুর জন্যই খাদ্যা তালিকা বদল হয়। তাই সে ব্যাপারে চিকিৎসকের মতামত নিয়েই পুরো খাদ্য তালিকা বানানো ও তা মেনে চলা ভালো।

পড়ুন – শীতে শরীর গরম রাখতে খান এই ৬টি খাবার

------------------------------------------------
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.