বিশ্ব আর্থ্রাইটিস দিবস ২০১৯: কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা

0
Jayanta Mondal
জয়ন্ত মণ্ডল

১২ অক্টোবর ‘বিশ্ব আর্থ্রাইটিস দিবস ২০১৯’। এই বিশেষ দিনটিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘বাত’ সম্পর্কে সচেতনতামূলক প্রচারে অংশ নেন চিকিৎসক-বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সাধারণ মানুষ। সরকারি পরিসংখ্যানে বিশ্বের ৩৫ কোটি মানুষ বাতের সমস্যায় ভুগছেন বলে উল্লেখ করা হলেও এর কম-বেশি প্রভাবে ভুগতে হচ্ছে আরও বেশি মানুষকে। কী এই বাত?

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাত নির্দিষ্ট কোনো একটি রোগ নয়, এটি বেশ কয়েকটি সমপর্যায়ভুক্ত রোগের সমষ্টির বহির্প্রকাশ মাত্র। তবে সচরাচর অ্যানক্লোইজিং স্পনডিলাইটিস, গাউট, লুপাস, অস্টিও আর্থ্রাইটিস এবং রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস মতো সমস্যাগুলিই বেশির ভাগ মানুষের কাছে পরিচিত। কিন্তু এর তালিকা আরও দীর্ঘায়িত। যা সংখ্যায় প্রায় একশো ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এ প্রসঙ্গে অস্থিরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শুভম দাস বলেন, “চিকিৎসাশাস্ত্রে আর্থ্রাইটিসের বিভিন্ন প্রকারভেদ রয়েছে। তবে আর্থ্রাইটিস বলতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অস্ট্রিও আর্থ্রাইটিস-ই সব থেকে বেশি সমস্যার বিষয়। প্রায় ৭৮ শতাংশ ক্ষেত্রে এই অস্ট্রিও আর্থ্রাইটিস বা হাড় ক্ষয়ে যাওয়ার কারণে সমস্যার সৃষ্টি হয়। আবার শৈশবে খেলাধুলা না করা, ফাস্টফুড-জাঙ্কফুডের মেটালিক কালার এবং অন্যান্য উপাদান কম বয়সে আর্থ্রাইটিসের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে”।

আর্থ্রাইটিস কি সেরে যায়?

ডা. দাস বলেন, “এটা কোনো অসুখই নয়। তা হলে যেটা কোনো অসুখ নয়, সেটা সারার প্রশ্ন উঠবে কি করে? জীবনযাপনের পদ্ধতি ঠিক করতে হবে। খাবার-দাবারের দিকে নজর দিতে হবে। সঙ্গে নিয়মিত শরীরচর্চা করলে সুস্থ থাকা সম্ভব। তবে বয়স বাড়লে হাড় ক্ষয়ে যাবে, এটা তো স্বাভাবিক একটা ব্যাপার”।

এ ধরনের বাতের লক্ষণগুলি ধরা পড়ার পর তার চিকিৎসা তৎক্ষণাৎ শুরু করা হলেও একেবারে সারিয়ে ফেলা প্রায় সময়ই সম্ভব হয় না বলে জানাচ্ছেন অস্থিবিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, সুর্নিদিষ্ট ওযুধের পাশাপাশি শরীরচর্চা অথবা ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে উপশমের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একই সময়ে সঠিক সময়ে চিকিৎসা এবং নির্দিষ্ট জীবনযাপনের পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে এই রোগের বিস্তার রোধ করা সম্ভব। তবে এ ব্যাপারে চিকিৎসকের পরামর্শ মতোই চলা উচিত। কী ভাবে বোঝা যাবে বাত বাসা বাঁধছে শরীরে?

মূলত শরীরের কোনো অংশে প্রচণ্ড যন্ত্রণা থেকেই বাতের লক্ষণ সহজে ধরা পড়ে। সচরাচর, গাউট বা গেঁটেবাতের ক্ষেত্রে বৃদ্ধাঙ্গুলিতে প্রাথমিক প্রভাব দেখা যায়।

লক্ষণ:

হাড়ের প্রদাহ, ক্ষয় রোগ, লিগামেন্ট ও টেন্ডনের ব্যথা, মাংসপেশির ব্যথা, মেরুদণ্ডের প্রদাহ, ক্ষয়, আড়ষ্টতা, অস্থিসন্ধি লাল হয়ে যাওয়া, অস্থিসন্ধি ফুলে যাওয়া ইত্যাদি।

শরীরের যে কোনো অংশ বাতের শিকার হতে পারে। অন্য দিকে, অস্থিসন্ধিতে মাত্রাতিরিক্ত ইউরিক অ্যাসিড জমা হলে যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে বাত। একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রায় ২০ শতাংশ ক্ষেত্রে পারিবারিক কারণে বাতে আক্রান্ত হওয়ার উদাহরণ পাওয়া গিয়েছে। এ ছাড়া ডায়াবেটিস, অত্যধিক ওজন বেড়ে যাওয়া, কিডনির রোগ, সিকল সেল অ্যানিমিয়া এবং বয়সবৃদ্ধির কারণে বাতের প্রকোপ বাড়তে পারে। পাশাপাশি মদ্যপানের ফলেও বাত হতে পারে। এ ছাড়া যে সমস্ত খাবার খেলে শরীরে ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ বেড়ে যায়, সেগুলির জন্যও বাত হতে পারে।

জিনঘটিত কারণ

ফিজিওথেরাপিস্ট বিশ্বজিৎ পাঠক এ বিষয়ে বলেন, ” হিউম্যান লিম্ফোসাইট অ্যান্টিজেন বি২৭ বা এইচএলএ-বি২৭ অ্যান্টিজেন রক্তে মিললে ধনুষ্টঙ্কার বা ব্যাম্বুস্পাইনের মতো সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। এ ক্ষেত্রে মেরুদণ্ড প্রভাবিত হয়। এই অ্যান্টিজেন জিন দ্বারা নির্ধারিত হয়। এটি একটি অটোইমিউন সমস্য়ার কারণ হতে পারে। কারণ, এর ফলে কারও ইমিউন সিস্টেম তাঁর নিজস্ব কোষগুলিকেই আক্রমণ করে। এর ফলে কিশোর বয়সে এই অ্যান্টিজেনের প্রভাবেই বাতের সমস্যা দেখা দিতে পারে। রক্তে এইচএলএ-বি২৭ উপস্থিতিতে ছোটো ছোটো অস্থিসন্ধিস্থলে বাত (রিঅ্য়াকটিভ আর্থ্রাইটিস) হতে পারে। পরে যা বৃহত্তর আকার ধারণ করে। মোদ্দাকথা, এই অ্যান্টিজেন পারিবারিক ইতিহাসের কারণে বাতের সম্ভাবনা বাড়ায়”।

নাম না প্রকাশের শর্তে কলকাতার এক বিশিষ্ট অস্থিরোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, বেশিরভাগ মানুষই জানেন না যে ১০০টিরও বেশি ধরনের আর্থ্রাইটিস রয়েছে। ভ্রান্ত ধারণাটি হল কেউ যখন ‘বাত’ শোনেন, তখন তিনি অস্টিও আর্থ্রাইটিস সম্পর্কে ভেবে নেন। এমনটাও ভাবেন, এটা কোনও বৃদ্ধ বয়সের রোগ। বাস্তব হল, বিভিন্ন ধরনের আর্থ্রাইটিস মানব দেহকে বিভিন্ন উপায়ে প্রভাবিত করে – তবে এগুলো অস্থিসন্ধিতেই বেশি হয়। স্বাভাবিক ভাবেই বিভিন্ন ধরনের আর্থ্রাইটিস সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জানার প্রয়োজন রয়েছে। এমনকী শিশুরাও বাতে আক্রান্ত হতে পারে, সেই সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। অন্তত আজকের মতো একটি বিশেষ দিনে তো বটেই!

কী উদ্দেশে এই দিবস

শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডি পোদ্দার বলেন, “সমস্যাটির সমস্ত দিক সম্পর্কে বিশ্ব সচেতনতা বাড়াতে দিনটি পালন করা হয়। তবে সর্বত্র সাড়া সমান নেই। চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ অথবা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি বাতের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত লক্ষণগুলি সম্পর্কে সচেতনতামূলক প্রচারের মাধ্যমে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব উপশম পাওয়ার গুরুত্বের কথা তুলে ধরে। যাঁরা বাতের সমস্যায় ভুগছেন, তাঁদের জন্যও দিশা দেখায় এই দিনটি। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখছি বাচ্চারা যে ধরনের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে অভ্যস্ত পড়ছে, তা মোটেই কাম্য নয়। সঙ্গে রয়েছে জীবনযাপনের পদ্ধতি। এগুলি ঠিক করতে হবে”।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here