dr. dipankar ghosh
দীপঙ্কর ঘোষ

প্রত‍্যেক মা-বাবার প্রথম চিন্তা সন্তান সুস্থ থাকুক। তার পরেই চিন্তা ঢোকে আমাদের সন্তান লম্বা চ‌ওড়া স্বাস্থ‍্যবান হবে তো? তাই এত হেলথ্‌ ড্রিঙ্কস, এত পুষ্টিকর খাবার – এই সবের ব‍্যবস্থা।

প্রথমে আমরা আলোচনা করব লম্বা হ‌ওয়ার জন্য কী কী জিনিস ভীষণ প্রয়োজন ।

এক নম্বর হল বংশগতি বা জিন। এক এক পরিবারে বা এক এক দেশে জিনের গঠন আলাদা। কে লম্বা হবে, কার চুল কোঁকড়া হবে, কার চোখের মণি কী রঙের হবে, কানে চুল গজাবে কি না — এগুলো সব জিন আর ক্রোমোজোম ঠিক করে দেয়। ধরা যাক আফ্রিকার পিগমি উপজাতি। এরা সবাই হ্রস্বকায়। প্রচুর ভালো খাবার খেলেও বা সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যকর ভাবে বড়ো করে তুললেও এরা লম্বা হবে না। এই প্রসঙ্গেই লুকিয়ে আছে লম্বা হ‌ওয়ার গোপন কথা। আমরা এই গোপন কথাটি নিয়ে শেষ বেলায় আলোচনা করব।

আরও পড়ুন: স্বাস্থ্য সাবধান : থাইরয়েড হয়েছে ? কী করে বুঝবেন ?

তবে কি পুষ্টির কোনো ভূমিকা নেই? এই যে এত পুষ্টিকর খাবার আর পানীয়ের বিজ্ঞাপন দু’ বেলাই কাগজে-টিভিতে আমরা দেখছি, সেগুলো সব‌ই কি ভুল? না, পুষ্টির একটা ভূমিকা অবশ্যই আছে। যদি কোনো বাচ্চা দীর্ঘদিন অনাহারে থাকে – যেমনটি আমরা ইথিওপিয়া, কালাহান্ডি বা বিয়াল্লিশ সনের মন্বন্তরে দেখেছি – তা হলে তার দেহ অস্থিচর্মসার হয়ে যাবে। এই অবস্থার ডাক্তারি নাম ম‍্যারাসমাস। এতে শরীরের সমস্ত চর্বি আর প্রোটিন খাদ্যের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। এ রকমটি হলে তার শরীরের বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যাবে। সাধারণত এই রকম ঘটে না।

পুষ্টি খুবই জরুরি – ঠিক মাত্রার থেকে কম পরিমাণে ভিটামিন প্রোটিন মিনারেল ইত্যাদি থাকলে বৃদ্ধি ব‍্যাহত হয়। “আমাদের মতো সাধারণ পরিবারে এ ধরনের অপুষ্টি হয় না”। আর স্বল্প বিত্তের মানুষজন বাচ্চাদের ভাত, ডাল, ডিম, পেয়ারা বা যে কোনো সস্তা ফল আর সামান্য দুধটুকু নিয়মিত খাওয়ালেই তার আর পুষ্টির ঘাটতি হয় না। অত দাম দিয়ে হেলথ্‌ ড্রিঙ্কস দিনে এক বার দু’ চামচ খাওয়ানো কেবলমাত্র অর্থের অপচয়। শিশুর পুষ্টিহীনতা থাকলে ওই হেলথ্‌ ড্রিঙ্কস খাওয়ানোর পরেও পুষ্টিহীনতায় সে ভুগবে।

এ বার আসি কালচক্রে। ঋতুর সঙ্গেও কিন্তু বৃদ্ধির যোগাযোগ আছে। বহু দেশে দেখা যায় বসন্ত কালে বৃদ্ধির হার বেশি।

আবার অসুখ হলে যে বৃদ্ধি কমে যাবে সেটা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

এর পর আসছে ‘ব‍্যায়াম’-এর কথা। ন‍্যূনতম ব‍্যায়াম করলেই বৃদ্ধির হার অসম্ভব দ্রুত হতে থাকে। শরীরের সমস্ত বৃদ্ধির হরমোন ক্ষরণ বেড়ে যায় আর বাচ্চা দ্রুত বেড়ে ওঠে। প্রতিটি পেশিতন্তু হয়ে ওঠে শক্তিশালী। মস্তিষ্কের, হার্টের আর ফুসফুসের রক্ত সঞ্চালন যায় বেড়ে। বাচ্চার বুদ্ধি আর শরীরের বৃদ্ধি শুরু হয়।

আরও পড়ুন: স্বাস্থ্য সাবধান : ফ্যাটি লিভার ও অন্যান্য অসুখ

সুষম খাদ্য দিয়েও আমরা দেখেছি আফ্রিকার পিগমি উপজাতির মানুষের বৃদ্ধি হয় না। এর জন্য প্রয়োজন গ্রোথ হরমোন। গ্রোথ হরমোন মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্ল‍্যান্ড থেকে বেরোয়। গ্রোথ হরমোন কম-বেশি ক্ষরণের ওপর বাচ্চার লম্বা হয়ে ওঠা নির্ভর করে। ঘুমের মধ্যে এই হরমোন সব থেকে বেশি বেরোয়।এই সুতরাং বাচ্চার পরিমাণমতো ঘুম বাচ্চার মস্তিষ্কের এবং শরীরের বেড়ে ওঠার জন্য খুবই জরুরি। মানসিক চাপে থাকলেও এই হরমোন কম ক্ষরিত হবে। তাই বাচ্চাদের আনন্দে রাখুন, খেলতে উৎসাহ দিন, পর্যাপ্ত ঘুমের সুযোগ দিন। প্রতি দিন ন‍্যূনতম আট ঘণ্টা – দেখবেন আপনার সন্তান ঠিকমতো বেড়ে উঠছে। এই হরমোন ব্রেন হার্ট মাংসপেশি স…ব কিছুরই বৃদ্ধির জন্য দায়ী।

এই গ্রোথ হরমোন আবার একা কাজ করতে পারে না। থাইরয়েড ইনসুলিন এবং সেক্স হরমোন – সবার সঙ্গে সহযোগিতা করে সে কাজ করে। আমরা জানি শিশু বয়সে থাইরয়েড কমে গেলে ক্রেটিন হয় (ক্রেটিনিজম)। তাতে মানসিক ও শারীরিক, দু’ রকম বৃদ্ধিই বন্ধ হয়ে যায়। সুতরাং গ্রোথ হরমোন থাইরয়েড এবং অন্যান্য হরমোন ছাড়া কাজ করতে পারে না।

বেড়ে ওঠার আসল বয়সটা হোলো বয়ঃসন্ধিকাল। এ সময়ে সমস্ত হরমোনের কাজ তুঙ্গে থাকে, তাই গ্রোথ হরমোন ক্ষরণ সব থেকে বেশি হয়। বাচ্চা হুহু করে বাড়তে থাকে। আবার মনে রাখতে হবে হাড়ের তরুণাস্থি জুড়ে গেলে আর দৈর্ঘ্য বাড়বে না।

তা হলে এ বার লম্বা হওয়ার গোপন কোথায় আসি। কোনো বাচ্চার বৃদ্ধি আশানুরূপ না হলে ডাক্তার দেখান। থাইরয়েড আর গ্রোথ হরমোন পরীক্ষা করান। এখানে কোনো অসুবিধা থাকলে এন্ডোক্রিনোলজিস্ট চিকিৎসা করবেন – কেননা এই সব ওষুধের মাপযোগ অত্যন্ত কঠিন। এমনকি হাজারে একজনের পিটুইটারি গ্ল‍্যান্ডে টিউমার‌ও থাকতে পারে, যার ফলে গ্রোথ হরমোন কম বা বেশি বেরোতে পারে। অযথা দুশ্চিন্তা না করে আপনার বাচ্চার সর্বাঙ্গীন বিকাশের জন্য ডাক্তারবাবুদের সঙ্গে কথা বলুন।

(লেখক একজন সাধারণ চিকিৎসক)

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন