স্মিতা দাস

কলকাতার শহরতলিতে অবস্থিত বরানগর। এই বরানগরের অলিতে-গলিতে কত মন্দির ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, তা হিসাব করে ওঠা কঠিন। এ হেন মন্দিরনগরীর এক উল্লেখযোগ্য মন্দির হল প্রামাণিক ঘাট রোডে প্রামাণিক কালীবাড়ি। এই মন্দিরে ব্রহ্মময়ী কালী অধিষ্ঠিতা।

কথিত আছে, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী কালীকে ‘মা’ এবং জয় মিত্র কালীবাড়ির কৃপাময়ী কালীকে ও প্রামাণিক কালীবাড়ির ব্রহ্মময়ী কালীকে ‘মাসি’ বলে ডাকতেন।

বরানগরের কুঠিঘাট থেকে ১০ মিনিটে হাঁটার দূরত্বে এই প্রামাণিক কালীবাড়ি। এটি নবরত্ন মন্দির এবং গঠন-বৈশিষ্ট্যে তা জয় মিত্র কালীবাড়ির অনুরূপ। সাধারণত নবরত্ন মন্দির বলতে আমরা চিরাচরিত বাঁকানো চালের শৈলী বুঝি, যেমন দক্ষিণেশ্বরের মন্দির। কিন্তু প্রামাণিক কালীবাড়ি হল দোতলা দালান মন্দির। প্রতি তোলার কোণে কোণে চূড়া বা রত্ন বসানো।   

কথা হচ্ছিল মন্দিরের পুরোহিত সোমনাথ বড়ালের সঙ্গে। তিনি জানালেন, তাঁরা এই মন্দিরে পাঁচ পুরুষ ধরে পুজো করছেন। তিনি বলেন, তাঁদের পূর্বপুরুষ কালীপদ বড়াল এই মন্দিরে পূজা শুরু করেন।

মন্দির প্রতিষ্ঠার ইতিহাস জানা গেল সোমনাথবাবুর কাছ থেকে। তিনি বলেন, এই মন্দির হল দে প্রামণিক পরিবারের। দে প্রামাণিকদের আদিবাড়ি বর্ধমানের পুলিনপুর গ্রামে। সেই পরিবারের কুলপুরোহিত ছিলেন বড়ালরা। প্রামাণিকরা এক সময় ব্যবসাবাণিজ্যের জন্য বর্মায় বসবাস করতেন। কিন্তু সেখানে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে দেশে ফিরে আসেন। তার পরই দে প্রামণিক পরিবারের কামদেব দে কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। তাঁরই বংশধর রামগোপাল দে দুর্গাপ্রসাদ দে ১২৫৯ বঙ্গাব্দের  (১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দ) মাঘী পূর্ণিমার দিন এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরের দু’ বছর আগেই এই মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

শোনা যায়, দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণীর মূর্তি যিনি গড়েছিলেন দাঁইহাটের সেই ভাস্কর নবীনচন্দ্র পালই এই ব্রহ্মময়ী বিগ্রহ তৈরি করেন। আসলে নবীন ভাস্কর একই কষ্টিপাথর থেকে তৈরি করেছিলেন তিন মূর্তি – ভবতারিণী কালী, ব্রহ্মময়ী কালী এবং কৃপাময়ী কালী। প্রতিটি মূর্তিই তৈরি হয়েছিল দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরের জন্য। মন্দিরের আকার অনুযায়ী রানি রাসমণির মনে হয়েছিল, ব্রহ্মময়ী কালী ও কৃপাময়ী কালীর মূর্তি ছোটো, মন্দিরের সঙ্গে ঠিক খাপ খায় না। পরে নবীন ভাস্কর ভবতারিণীর মূর্তি তৈরি করেন। কৃপাময়ী ও ব্রহ্মময়ী মূর্তি অধিষ্ঠিতা হন জয় মিত্র কালীবাড়ি ও প্রামাণিক কালীবাড়িতে।   

এখনও মাঘী পূর্ণিমার দিন প্রতিষ্ঠাতিথিতে বিশেষ পুজোর আয়োজন করা হয়ে থাকে প্রামাণিক কালীবাড়িতে। চলে হোম-যজ্ঞ, ভোগ বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়। কালীপুজোর দিন দেবীকে সাজানো হয় বিশেষ বসনে। কালের নিয়ম মেনেই এই মন্দিরে পশুবলি বন্ধ।

আরও পড়ুন: বরানগরের জয় মিত্র কালীবাড়িতে পশুবলি বন্ধ হয়েছিল বালানন্দ ব্রহ্মচারীর বিধানে

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন