এএসআই-এর খননকার্য আর-এক বার প্রমাণ করল কলকাতার কোনো জন্মতারিখ নেই, কোনো জন্মদাতাও নেই   

0
kolkata

কলকাতা: কী অদ্ভুত সমাপতন! আজ থেকে ঠিক ১৯ বছর আগে এমনই এক ১৬ মে তারিখে কলকাতা হাইকোর্ট জানিয়ে দিয়েছিল, কলকাতা শহরের কোনো জন্মতারিখ নেই। ওই রায়ে কলকাতার জন্মতারিখ হিসাবে অভিহিত ১৬৯০ খ্রিস্টাব্দের ২৪ আগস্ট তারিখটি বাতিল করে দেয় হাইকোর্ট।

১৯ বছর পর ঠিক এই সময়েই ভারতের পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণও (আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া, এএসআই) জানিয়ে দিল, আড়াই হাজার বছর আগেও মানবসভ্যতার অস্তিত্ব ছিল এই কলকাতায়। দমদম ক্লাইভ হাউসে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য চালিয়ে তারা যে অসংখ্য প্রাচীন সামগ্রী পেয়েছে, সেই সব সামগ্রীই ইঙ্গিত দিচ্ছে মহানগরীর প্রাচীন অস্তিত্বের। এএসআই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইতিহাসের ক্ষেত্রে প্রত্নতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতার ক্ষেত্রেও যা বলা হচ্ছে তা প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নমুনা দেখেই বলা হচ্ছে। বর্তমান পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য পাওয়া গিয়েছে।

১৯ বছর আগে হাইকোর্ট জানিয়ে দিয়েছিল, কলকাতা মহানগরীর কোনো জন্মতারিখ নেই। আর জব চার্ণক তো দূরের কথা, এই শহরের কোনো প্রতিষ্ঠাতাও নেই। এর পরেও কিন্তু বহু মানুষের মধ্যে কলকাতার জন্ম নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা থেকে গিয়েছে। এমনকি বহু বিখ্যাত মানুষও ২৪ আগস্ট সোশ্যাল মিডিয়ায় এই শহরকে ‘শুভ জন্মদিন’ জানিয়ে বসেন। এ ব্যাপারে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করে সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবার পরিষদ তাঁদের বিরুদ্ধে বার বার আইনি নোটিশও পাঠায়।

কলকাতার জন্ম নিয়ে গবেষণা

এর আগেও কলকাতার প্রাচীনত্ব নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে। উনিশ শতকে ব্রিটিশ গবেষকরা দাবি করেছিলেন, সমুদ্রের কাছাকাছি এই ভূখণ্ডের ইতিহাস বেশি পুরোনো নয়। পরে বিশ শতকের গোড়ার দিকে একদল বাঙালি গবেষক বলেছিলেন, আদি-মধ্য যুগের শেষ দিক থেকেই কলকাতায় মানবসভ্যতার অস্তিত্ব ছিল। এএসআইয়ের পাওয়া নমুনা তাঁদের সেই বক্তব্যকেই জোরালো ভাবে প্রতিষ্ঠিত করছে।  

১৯৯৭-৯৮ সালে কলকাতার বেথুন কলেজে মাটির তলা থেকে বেশ কিছু প্রত্নসামগ্রী উদ্ধার হয়েছিল। সেগুলি বিশ্লেষণ করে জানা যায়, কলকাতায় ষষ্ঠ-সপ্তম শতকেও মানবসভ্যতা ছিল।

দমদম ক্লাইভ হাউসের ঢিপি থেকে ২০০১ সালে কিছু প্রত্নসামগ্রী মেলে। সেগুলির গুরুত্ব বুঝেই ২০০১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত এএসআই খননকার্য চালায় এবং বিভিন্ন রঙের মৃৎপাত্র, ঘর ও স্থাপত্যের অবশেষ মেলে। পরীক্ষা করে জানা যায়, সেগুলি আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসের নিদর্শন।

দু’মাস আগে ফের ক্লাইভ হাউসে খননকার্য শুরু করে এএসআই। এ বারও উদ্ধার হয়েছে মৃৎপাত্র-সহ নানা সামগ্রী, যেগুলি খ্রিস্টপূর্ব সময়ের সভ্যতার নিদর্শন। 
এ ছাড়াও ওই জায়গা থেকে পাওয়া গিয়েছে কয়েকশো বছরের পুরোনো একাধিক মূর্তি, খেলনা, অলংকার, ধাতব বস্তু, মুদ্রা, সিলমোহর-সহ নানা জিনিস। পাওয়া গিয়েছে নরকঙ্কালও।

বর্তমান পত্রিকার ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার কলকাতা সার্কেলের সুপারিন্টেন্ডেন্ট শুভ মজুমদার জানান, আগের বারের খননে সাতটি স্তর পাওয়া গিয়েছিল। এ বার ১২টি স্তর মিলেছে। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয়-দ্বিতীয় শতাব্দীতেও কলকাতায় মানব সভ্যতার নিদর্শন মিলেছে। এ ব্যাপারে আরও বিস্তারিত জানতে যাবতীয় নমুনার বিজ্ঞানসম্মত ‘ডেটিং’ করা হচ্ছে। গর্বের কলকাতার আরও গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস যে সামনে আসবে সে ব্যাপারে শুভবাবু আশাবাদী।

ভ্রান্ত ধারণার নিরসন 

২০০৩-০৪ সালের আগে পর্যন্ত ২৪ আগস্ট কলকাতার জন্মদিন পালিত হত মহাসমারোহে। কাহিনিটা ছিল এই রকম – ১৬৯০ সালের ২৪ আগস্ট কলকাতায় পা রাখেন জব চার্নক। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সুতানটি, গোবিন্দপুর ও কলিকাতা নামে হুগলি নদীর তীরবর্তী তিনটি গ্রাম সাবর্ণ রায় চৌধুরীদের কাছ থেকে কিনে নেয়। এর পর থেকেই সেই দিনটাই স্মরণ করে পালিত হত কলকাতার জন্মদিন।

কিন্তু জব চার্নক আদৌ কি কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা? আর ১৬৯০ সালকেও কি কলকাতার জন্মবর্ষ বলা যায়, বিশেষ করে যখন ১৬৯০-এর অনেক আগে থেকেই এই গ্রামগুলোর অস্তিত্ব ছিল? তা ছাড়া চার্নক নিজেও তো ১৬৯০-এর আগে দু’ বার এই অঞ্চলে পা রাখেন? এই সব প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে ইতিহাসবিদদের মহলে।

সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবার নিজেদের উদ্যোগে গত শতকের নব্বই দশকের শেষ দিকে একটি তথ্যানুসন্ধানী অভিযান শুরু করে। শেষ পর্যন্ত কলকাতা হস্তান্তরের প্রকৃত নথি তারা হাতে পায় ১৯৯৭ সালে। পারসি ভাষায় লেখা সেই নথিতে বলা হয়েছে, বছরে ১৩০০ টাকার বিনিময়ে সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবার ওই তিনটি গ্রাম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে লিজ দিয়েছিল। এবং সেটা জব চার্নকের মৃত্যুর ছ’ বছর পরে। ওই পারসি নথির ভিত্তিতেই সাবর্ণ পরিবারের পক্ষ থেকে ২০০১ সালে কলকাতা হাইকোর্টে জনস্বার্থের মামলা দায়ের করা হয়। পারসি নথিতে কী আছে সেটা জানিয়েছিলেন মামলায় সাবর্ণদের হয়ে যিনি লড়েছিলেন সেই আইনজীবী স্মরজিৎ রায় চৌধুরী।

দু’ পক্ষের বক্তব্য শোনার পর হাইকোর্ট পাঁচ খ্যাতনামা ইতিহাসবিদকে নিয়ে কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি ২০০২ সালের নভেম্বরে রিপোর্ট দেয়। তাতে বলা হয়, কলকাতার কোনো নির্দিষ্ট জন্মদিন নেই। যে ভাবে গ্রামীণ বসতি গড়ে ওঠে সে ভাবেই এর সূত্রপাত। কলকাতার জন্মদিন বলে কোনো বছরকে নির্দিষ্ট করা যায় না। আর কোনো এক জনকে প্রতিষ্ঠাতাও বলেও চিহ্নিত করা যায় না। কমিটির রিপোর্টের বিরদ্ধে রাজ্য সরকার কোনো আবেদন পেশ করেনি।

শেষ পর্যন্ত ২০০৩ সালের ১৬ মে প্রধান বিচারপতি এ কে মাথুর এবং বিচারপতি জয়ন্ত বিশ্বাসের বেঞ্চ জানিয়ে দেয়, ২৪ আগস্ট কলকাতার জন্মদিন হিসাবে গণ্য হবে না। এবং কোনো ইতিহাস বইতেই কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে জব চার্নকের নাম উল্লেখ করা যাবে না।

কলকাতার প্রাচীনত্ব নিয়ে এএসআইয়ের অনুসন্ধান আরও একবার প্রমাণ করল, এই শহরের নির্দিষ্ট কোনো জন্মতারিখ নেই, কোনো জন্মদাতাও নেই।

আরও পড়তে পারেন

নির্ধারিত সময়ের পাঁচ দিন আগে আন্দামানে ঢুকে গেল বর্ষা

ব্যারাকপুরে বিরিয়ানির দোকানে গুলি, আহত দুই

পরিস্থিতি অনুকূল, আপাতত রোজই ঝড়বৃষ্টির সম্ভাবনা দক্ষিণবঙ্গে

সংক্রমণ ও সক্রিয় রোগী আরও কমল ভারতে

পর্যটনের মরশুম শুরু হতেই দুর্যোগের আশংকা উত্তরবঙ্গে, আগামী পাঁচ-ছ’দিন অতি ভারী বৃষ্টি

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন