শান্তিপুরে বিগ্রহবাড়ির দোলযাত্রার পাশাপাশি গোপালপুজো এক অন্য মাহাত্ম্য বহন করে

0

শুভদীপ রায় চৌধুরী

সামনেই দোলযাত্রা। আপামর বাঙলির কাছে দোলযাত্রা এক অন্য রকম অনুভূতির উৎসব। সকলেই আবির মেখে বসন্তের উৎসব পালন করে, কেউ নিজের প্রিয়জনদের সঙ্গে, আবার কেউ বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে। আর এই দোল উৎসবকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন বাড়ির ঠাকুরদালানও সেজে ওঠে আবিরে-রঙে-গুলালে। প্রাচীন পরিবারগুলিতে রাধাকৃষ্ণের দোলযাত্রা যেন এক মিলনক্ষেত্র রচনা করে যা এই বাংলার এক অন্যতম সংস্কৃতি।

দোল উৎসবকে কেন্দ্র করে শান্তিপুরে এক বিরাট মহোৎসব অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন বাড়িতে রাধাকৃষ্ণের দোল হয় এবং পাশাপাশি বিরাট বিরাট গোপালের বিগ্রহপুজো – এ যেন এক অন্য রকম মুহূর্ত, যা শান্তিপুর প্রতি বছরই উপহার দেয় আমাদের। শান্তিপুরে পূর্ণিমায় দোলযাত্রা ছাড়াও পঞ্চমদোল, সপ্তমদোল, রামনবমীতে দোল ইত্যাদি পালিত হয়।

বিগ্রহবাড়ি, বারোয়ারি উৎসব ছাড়াও শান্তিপুরে শ্যামচাঁদ মন্দিরের দোল বিখ্যাত। তবে এই মন্দিরে দোল উৎসব পালিত হয় পূর্ণিমার পরের দিন, প্রতিপদে। দোলের দিন সন্ধ্যায় হয় চাঁচর পোড়ানো এবং পরের দিন ভোগ, নামসংকীর্তনের শেষে সন্ধ্যায় শ্যামচাঁদকে নিয়ে এক শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়, যা দেখতে দূরদূরান্ত থেকে আসা অগণিত ভক্ত ভিড় করেন রাস্তার দু’ ধারে।

গোকুলচাঁদ বাড়ির দোল।

বড়োগোস্বামী বাড়ির দোলযাত্রাও বিখ্যাত শান্তিপুরে। এই বাড়িতে চার দিন দোল উৎসব পালিত হয়। দোলপূর্ণিমার দিন শ্রীশ্রীরাধারমণের দোল উৎসব পালিত হয়। আগের দিন রাসমঞ্চের সামনের প্রাঙ্গণে চাঁচড় পোড়ানো হয়। পরের দিন দোলমঞ্চে ওঠেন রাধারমণ এবং শ্রীমতী, বিশেষ পূজা হয়। দোল উপলক্ষ্যে বিশেষ সাজসজ্জা হয় তাঁদের। দুপুরে বিশেষ ভোগ নিবেদন হয়। ভোগে থাকে সাদাভাত, পোলাও, নানা রকমের ভাজা, তরকারি, চাটনি, পায়েস ইত্যাদি। সন্ধ্যায় আবার শ্রীশ্রীরাধারমণকে দোলমঞ্চে এসে বসানো হয়, বিকাল থেকে শুরু হয় নামসংকীর্তন।

দোলপূর্ণিমার পঞ্চমী তিথিতে অনুষ্ঠিত হয় পঞ্চমদোল। ওই দিন মদনমোহন-শ্রীমতীকে দোলমঞ্চে আনা হয় এবং রীতি মেনেই সেবাপূজা হয়ে থাকে বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্য সুদীপ্ত গোস্বামী। দু’ দিন পরে সপ্তমদোল। এর একটি বিশেষত্ব আছে। তা হল এই দিনের দোলকে ‘সীতানাথের দোল’ও বলা হয়ে থাকে। কারণ ওই দিন শ্রীঅদ্বৈতাচার্যকে কেন্দ্র করে দোল উৎসব পালন করা হয়। বিশেষ পূজারও আয়োজন করা হয়ে থাকে।

বড়োগোস্বামী বাড়িতে রামনবমীর দিনও দোল উৎসব পালিত হয় রামচন্দ্রকে কেন্দ্র করে। তিন দিনব্যাপী রামনবমীর দোল ও মেলা বেশ সাড়ম্বরেই পালিত হয়। এ বছরও নিয়ম মেনেই পালিত হবে বড়োগোস্বামী বাড়ির দোল, এমনটাই জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।

মুখোপাধ্যায় বাড়ির গোপাল।

শ্রীঅদ্বৈতাচার্যের প্রপৌত্র ঘনশ্যাম গোস্বামী থেকেই মধ্যমগোস্বামী বাড়ির উৎপত্তি হলেও অধস্তন তৃতীয়পুরুষ রঘুনন্দন গোস্বামীই ছিলেন এই বংশের প্রাণপুরুষ। এই বাড়ির দোল উৎসবও খুবই প্রাচীন, বর্তমানে তা ‘গোকুলচাঁদের দোল’ বলেই পরিচিত। দোল উৎসবের আগের দিন চাঁচড় পোড়ানো হয় এবং পরের দিন সকালে দেবদোল অনুষ্ঠিত হয়।

গোকুলচাঁদ বাড়ির দোলমঞ্চের হাওদায় বিরাজ করেন শ্রীশ্রীরাধাগোকুলচাঁদ জিউ। পরিবারের সকলে তাঁদের আবির দেন এবং চলে দোলপূর্ণিমার বিশেষ পূজা। সেই সঙ্গে পালিত হয় মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের জন্মতিথি উৎসব। অতীতে এই দোল উৎসবকে কেন্দ্র করে লাঠিখেলা, পুতুলনাচ, নাটক ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হত। তবে বর্তমানে নিষ্ঠার সঙ্গে শুধু দোল উৎসবটুকুই পালিত হয় মধ্যমগোস্বামী বাড়িতে।

শান্তিপুরের প্রাচীন পাগলাগোস্বামী ঠাকুরবাড়ির দোলযাত্রাও খুব বিখ্যাত। এই বাড়ির আদিপুরুষ অদ্বৈতাচার্যের চতুর্থ পুত্র বলরামের দশম পুত্র কুমুদানন্দ গোস্বামী ছিলেন পণ্ডিত ব্যক্তি। এক সময় তিনি কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি কর্তৃক প্রদত্ত সম্পত্তি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এই পরিবারের দুই বিগ্রহ কৃষ্ণরায় জিউ এবং কেশবরায় জিউ-এর দোল উৎসব তাঁদের মন্দিরেই অনুষ্ঠিত হয়।

মদনগোপাল বাড়ি।

কথা হচ্ছিল পরিবারের সদস্য তন্ময় গোস্বামীর সঙ্গে। তিনি জানালেন, দোলপূর্ণিমার আগের দিন চাঁচর পোড়ানো হয় এবং পরের দিন ভোরবেলা দেবদোল অনুষ্ঠিত হয়। দেববিগ্রহ মন্দিরের সামনে হাওদায় বিরাজ করেন এবং পরিবারের সকল সদস্য তাঁদের আবির দেন। দেবদোলের সময় ঠাকুরকে বাল্যভোগ নিবেদন করা হয় এবং তার পর পরিবারের কুলপুরোহিত এসে পূর্ণিমার বিশেষ পূজা শুরু করেন।

তন্ময়বাবুর কাছে আরও জানা গেল যে তাঁরা গরমকালের বিভিন্ন রান্নার পদ ঠাকুরকে নিবেদন করার আগে গ্রহণ করেন না। তাই এই দোলের দিন ভোগে সেই সমস্ত রান্নার পদ নিবেদন করা হয়। তার পর তাঁরা সবাই সেই পদগুলি খেতে পারেন।

শান্তিপুরের আর এক প্রাচীন বাড়ি মুখোপাধ্যায় বাড়ি ‘চাঁদুনীবাড়ি’ নামে পরিচিত। এই বাড়িতেও দোল উৎসব পালিত হয়। তবে এখানে হয় গোপালের দোল। কথা হচ্ছিল চাঁদুনীবাড়ির সদস্য সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তিনি জানালেন, এই গোপালের বয়স প্রায় ২৫০ বছর। চাঁদুনীবাড়ির এক সদস্যা এই গোপালকে পান তাঁদেরই এক শাখার সদস্যদের কাছ থেকে। সেই বাড়িতে তিনি সিন্দুকে ছিলেন। মুখোপাধ্যায় বাড়ির সদস্যরা তাঁকে এনে পুজো শুরু করেন। এই গোপাল অষ্টধাতুর তৈরি। তাঁর নিত্য সেবাপূজা হয়। তবে পরিবারের কোনো সদস্য তাঁকে স্পর্শ করতে পারেন না যে হেতু তাঁর সঙ্গে পরিবারের প্রাচীন শ্রীশ্রীনারায়ণ জিউও থাকেন।

দোলের আগের দিন চাঁচর পোড়ানো হয়। রাজবেশে সুসজ্জিত হয়ে সেখানেও উপস্থিত থাকেন গোপাল। পরের দিন দেবদোলের পর বাড়ির সদস্যরা গোপালকে আবির দেন। দুপুরে স্নানের পর ভোগ নিবেদন হয়। ভোগে থাকে সাদাভাত, পোলাও, নানা রকমের ভাজা, তরকারি, মিষ্টি ইত্যাদি। তার পর সন্ধ্যায় আরতি ও শীতলভোগের পর গোপাল আবার নিজ গর্ভগৃহে ফিরে যান।

শান্তিপুরের বড়োগোপাল।

শান্তিপুরের দোল উৎসবে বিগ্রহবাড়ির পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন বারোয়ারি পুজো। এই পুজোগুলির বিশেষত্ব হল বিরাট আকৃতির গোপাল বিগ্রহের পুজো। এই বিশেষ ধরনের নাড়ুগোপালের বিগ্রহ শান্তিপুরের মৃৎশিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। গোপালের বর্ণ হয় মূলত আকাশি বা গোলাপি। কৃষ্ণের বাল্যবয়সের এই অপূর্ব বিগ্রহই পুজো হয় শান্তিপুরের দোল উৎসবে। বিভিন্ন নামে বিভিন্ন অঞ্চলের গোপাল পরিচিত, যেমন – বড়োগোপাল, মেজোগোপাল, ছোটোগোপাল, থ্যাবড়াগোপাল, ধেড়েগোপাল, ননীচোরা ইত্যাদি।

বিরাট আকৃতির গোপাল ঠিকই কিন্তু এত সুন্দর শিশুসুলভ মুখশ্রী যা প্রতিটি দর্শনার্থীর মন কাড়ে। শিশুদের মঙ্গলকামনায় অথবা সন্তানলাভের জন্য বহু ভক্ত পুজো দিয়ে থাকেন গোপালের কাছে। দোলের দিন গোপালদের পরানো হয় সোনা-রুপোর গহনা যা শান্তিপুরের চিরাচরিত প্রথা বলেই পরিচিত। দোলের পর দিন শোভাযাত্রা সহকারে গোপালের বিসর্জন হয়। দোলযাত্রাকে কেন্দ্র করে শ্রীধাম শান্তিপুরের এই প্রাচীন রীতিনীতি বাংলার ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে গৌরবান্বিত করে।

আরও পড়ুন: Dolyatra 2021: শ্রীশ্রীগোপীনাথকে কেন্দ্র করে দোলের দিন মেতে ওঠেন শোভাবাজার ছোটো রাজবাড়ির সদস্যরা

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন