Utpalendu Mondal
উৎপলেন্দু মণ্ডল

নন্দ নাপতি দাড়ি কাটে /দাড়িতে থাকে চুল।
পচা ঠাকুর মন্ত্র পড়ে /অর্ধেক থাকে ভুল।

নন্দদা সম্পর্কে আমরা ছোটোবেলায় এই রকম সব ছড়া বলতাম। সকাল হলে গ্রামে কাঁচি, ক্ষুর নিয়ে বেরিয়ে পড়ত। ওদের ভাষায় বলে গামাল করা। সন্ধে হলে নন্দদার অন্য রূপ। খোল-করতাল সহযোগে সংকীর্তনের মহড়া চলত। লম্ফর আলোয় চলত রিহার্সাল। শুধু নাম-সংকীর্তন করে দল চলে না। যে কারণে ওরা রামায়ণপালাও করত। সেটাই ছিল আমাদের কাছে মস্ত আনন্দের। পালা, বিশেষ করে রামায়ণপালার সময় নন্দদার অন্য মূর্তি। দানপর্ব শুরু হলে ইনিয়ে-বিনিয়ে সামান্য একটা গামছার জন্য কত রকম ভঙ্গি করে গান করত!

ধারাবাহিক/ পর্ব-৯

গামছা আর কাঁসার ঘটি (দানের সামগ্রী) পরের দিকে ভাগ-বাঁটোয়ারা হত। বেশির ভাগই চার হাতের গামছা। সেই গামছা গলায় দিয়ে নন্দদা প্রতি দিন গামালে বেরুত। তার ব্যাগে একটা ক্ষার সাবান থাকত। কিন্তু কারুর দাড়ি কাটার জন্য ওই সাবান ব্যবহার করা হত না। একেবারে বাবু-বিভুঁইয়ে লোকেরা – তাদের জন্য কদাচিৎ।

আমাদের বাচ্চাদের অবস্থা করুণ…তার লম্বা হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে…একেবারে বাটি ছাঁট। মাথায় চুলও বড়ো করা যাবে না। হয়তো সে কারণে আমাদের রাগ হত। দূর থেকে দেখলে আমরা বলতাম – নন্দ নাপতি চুল কাটে দাড়িতে থাকে চুল।

এ হেন নন্দদার শেষের পর্ব বেশ খারাপ। প্রথম বউ মারা গেলে প্রায় ছেলের বয়সি একটা মেয়েকে বিয়ে করে। প্রথম ছেলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে আলাদা থাকে। বাপ-কাকাদের ব্যবসা সে করল না। সে চাষবাস নিয়ে ব্যস্ত থাকল। নন্দদার প্রথম পক্ষের মেয়েও বিয়ে করল না। পরের ছেলে লায়েক হয়ে উঠল। নন্দদার সামান্য কয়েক বিঘে জমিও সে লিখিয়ে নিল। বড়ো ছেলে, শেষ বিয়ের ছেলেও তাকে দেখল না। নাম-সংকীর্তনের দল বন্ধ হয়ে গেল। সব সময়ের সাথী তার একমাত্র ভাগনে সতীশ, তারও সংসার আছে। সে-ও দল রাখতে পারল না। নন্দদার মাথায় ব্যামো দেখা দিল। কিছুই আর মনে রাখতে পারত না। গাঙভেড়িতে বসে থাকে। পাশ দিয়ে লোক গেলে জিজ্ঞেস করে, কে যায় কত রাত হল। যে লোকটা দাপিয়ে গ্রামে গামাল করে বেড়াত, সে স্থবির। দেখারও কেউ নেই। নতুন বউও তাকে দেখে না।

এর মধ্যে আয়লা-গায়লা সবই হয়ে গেল। ঘর ভাঙার টাকা পাওয়া গেল। নন্দদা সই করতে ভুলে গেছে। তবে মাঝে মাঝে ‘শ্রীপ্রেমানন্দে হরি হরি বলো’ বলত। নন্দদা নাম-সংকীর্তনের আগে এই ধুয়াটাই তুলত।

শেষের গানের রেশ নিয়ে নন্দদা এক দিন চলে গেল। চলে গেল আমাদের গ্রামের শেষ কীর্তনীয়া। শেষ পক্ষের ছেলে বাবার আমলের ঘর ভেঙে নতুন ঘর তুলবে। আয়লার টাকা, মোদীর টাকা মিলিয়ে কোঠা বাড়ি বানাবে। ঘর ভাঙতে গিয়ে অবাক। পরিত্যক্ত শ্রীখোলে রাজ্যের ১০ টাকা, ১০০ টাকা। সব মিলিয়ে হাজার সত্তরেক টাকা। প্রথম পক্ষের বড়ো ছেলে হাত কামড়ায়। নন্দদা বড়ো আদর করে নাম রেখেছিল গোপাল। গোপাল অতি সুবোধ বালক, জন্মদাতা বাবাকে দেখেনি। কিন্তু বাবা খোলের ভিতর ৭০ হাজার টাকা রেখে গেল!

আগের পর্বগুলি পড়তে এখানে ক্লিক করুন

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here