worshipping gopal
গোপালের পূজা। নিজস্ব চিত্র।
papiya mitra
পাপিয়া মিত্র

বাড়ি থেকে বের হতেই পাড়ার দুই মহিলাকে দেখা গেল, হাসিমুখ। এক হাতে তাল, অন্য হাতে নারকেল। আসবেন তো দিদি, ছেলের জন্মদিন। বাড়ি গিয়ে আর বললাম না, মনে কিছু নেবেন না।

কিছু মনে করার নেই, কারণ এ ছেলে আমার, আপনার, আপামর মহিলার। কোনো কোনো বাড়িতে আবার সকলেরও।

এক এক বাড়িতে এই ছেলেকে কেউ ডাকেন গোপাল, কেউ ডাকেন দুলাল, কেউ গুবলু, কেউ বা ন্যাড়া। অমন যার মাথাভর্তি চুল তাকে কিনা ন্যাড়া ডাকা? ওই যে বললাম, আদর। তা যা-ই হোক এ নেমন্তন্নে কেউ মান করে বসে থাকে না। এক বার ডাক এলেই সন্ধেবেলায় যাওয়া চাই। এক বার দোল দিয়ে আসতেই হবে। বাজারে এখন তুমুল চড়া নারকেলের দাম। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়েছে তাল নামক ফলটি।

আজ সকাল থেকে গন্ধ ছেড়েছে তাল-গাওয়া ঘি-নারকেল নাড়ুর। গুড়ের পাক হচ্ছে, নানা বাড়ি থেকে কথাবার্তা আর কড়াখুন্তির আওয়াজ ভেসে আসছে। জোরে শ্বাস নিলে দুধ জ্বাল দেওয়ার একটা মিষ্টি গন্ধও চার দিকে। কোন বাটিতে দুধ দেওয়া হবে, ছোটো ননদের দেওয়া নতুন রুপোর বাটিতে, নাকি সাবেক কালের পিতলের জামবাটিতে। এই নিয়ে দুই জায়ে একটু মনকষাকষি হয়ে গেল। অতঃপর আবার আয়োজনের ব্যস্ততা।

sweet made of palm
তালের বড়া। ফাইল চিত্র।

আজকের দিনে ঘরে ঘরে শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে জমাট আলোচনা। ছোটোগুলো চোখ গোল করে দিদান-ঠাম্মাকে ঘিরে আছে। বড়োদের মধ্যে কোনো কোনো বাড়িতে ভারতবাসীর অন্তরাত্মার সঙ্গে কৃষ্ণনাম কী ভাবে জড়িয়ে গিয়েছে, আবার কোথাও বা চৈতন্যদেব যে নবদ্বীপে চন্দ্রশেখর আচার্যের বাসভবনে কৃষ্ণলীলা নাট্যাভিনয় করেছিলেন তাতে কে কোন চরিত্রে অভিনয়ে ছিলেন, তা নিয়ে আলোচনা। পুরাণে কৃষ্ণলীলার কাহিনি ছিল পালাগানের মূল বিষয়বস্তু। লোকশিক্ষার প্রধান বাহন ছিল এই পালাগান। ‘কালীয়দমন’, ‘ননীচোর’, ‘বকাসুর বধ’ খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। এই রকম কত শত আলোচনা বাড়ির বৈঠকখানার ঘরে।

আর অন্য ঘরে জমে উঠেছে তালের বড়া নিয়ে উমনোঝুমনোর গল্প। তেলে একটা করে বড়া পড়ছে আর রাজামশাই দড়িতে গেরো বাঁধছেন। কোথাও বা দুষ্টু গোপাল মাখন খেতে গিয়ে ভেঙে ফেলেছে হাঁড়ি, কিংবা সেই যে কড়কড় করে বাজ পড়ছে, ঝিলিক দিয়ে যাচ্ছে বিদ্যুৎ, ভাদ্রমাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে গভীর রাতে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হল – এই গল্প করতে করতে হাই তোলেন ঠাম্মা-দিদানরা।

দোলায় বসে পড়েছে গোপাল। মাথার পালকটা হাওয়ায় উড়ছে। রুপোর বাঁশি চকচক করছে। কদমফুল দিয়ে সাজিয়ে ফেলা হয়েছে দরজার মাথা। চার দিকে আলপনা, ধূপধুনোর গন্ধ। বড় গামলায় তালের কাই রাখা, তাতে পড়বে নারকেল কোরা, সুজি। সামান্য খোয়া ক্ষীরও পড়ে কোনো কোনো বাড়িতে। সারা দিন ধরে নানা পদ রান্না হলে, নানা ধরনের নাড়ু হলেও সন্ধেবেলার এই তালের বড়ার আনন্দই আলাদা। তালের বড়া, তালের ক্ষীর, তালের লুচিও আজ গোপাল খাবে। আজ গোপালের হ্যাপি বার্থডে। গোপালঠাকুর খুব ভালো। একটুও রাগী নয়। এই তো গত বছরে সবে থালা ভর্তি করে তালের বড়া রেখেছে বড়োপিসি, ছোটকা টকাৎ করে একটা বড়া তুলে শূন্যে ছুড়ে হাঁ করে রইল সেটা এসে মুখে পড়ল। কিন্তু কই কলেজের ক্রিকেট ম্যাচে তো ছোটকাদের দল দিব্ব্যি জিতেছিল। কৃষ্ণঠাকুর পাপ দেয়নি তো? কৃষ্ণঠাকুর পাপ দেয় না, আসলে ও-ও তো দুষ্টু। আর বিদ্যাসাগরের বইতে আছে না ‘গোপাল বড়ো সুবোধ বালক’।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন