mohammad-aamir-khan
nilanjan-mandal
নীলাঞ্জন মণ্ডল

প্রতিটি দেশেরই গুপ্তচর ব্যবস্থা থাকে। এই চরেরা যেমন দেশের ভিতরে কাজ করে, তেমনই অন্য দেশের মাটিতেও চরবৃত্তি করে থাকে। র, আইএসআই, মোসাদ, সিআইএ  প্রভৃতি নামগুলির সঙ্গে আমরা সকলেই কম বেশি পরিচিত। এদের কাজই  হল অন্য দেশের মাটিতে চরবৃত্তি করা। তবে এক দেশের চর যখন অন্য দেশের মাটিতে ধরা পড়ে তখন তার দায় তার দেশ নেয় না। তাকে পচে মরতে হয় বিদেশের জেলখানায়। তার সঙ্গে শারীরিক এবং মানসিক অত্যাচার তো আছেই।

কুলভূষণ যাদবের নাম আপনারা সংবাদপত্রে পড়েছেন নিশ্চয়। তিনি বর্তমানে পাকিস্তানের জেলে বন্দি। পাকিস্তানের অভিযোগ, তিনি পাকিস্তানের মাটিতে র-এর হয়ে কাজ করছিলেন। যদিও ভারত তা অস্বীকার করেছে।

রবিন্দর কৌশিকের নাম আপনারা শুনেছেন হয়তো। তিনি খুব কম বয়স থেকে পাকিস্তানের মাটিতে র-এর হয়ে কাজ করতেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ধরা পড়েন। কারাবাস হয়। পাকিস্তানের জেলেই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর পরিবারের অভিযোগ, বলিউডের ছবি ‘এক থা টাইগার’ তাঁকে নিয়েই। যদিও ছবিটির পরিচালক তা অস্বীকার করেছেন।  

মহম্মদ আমির খানের জীবনটাও হয়তো কেটে যেত পাকিস্তানের জেলেই। তা হয়নি। ভারত রাষ্ট্রের চর হতে ব্যর্থ হওয়ায় এ দেশের জেলখানাতেই তাঁকে কাটাতে হয়েছে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়টা। শেষ পর্যন্ত তিনি যখন সমস্ত মামলায় নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে কারাগারের বাইরে এলেন তত দিনে কেটে গিয়েছে ১৪টা বছর। এই দীর্ঘ কারাবাসের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি নাগরিক অধিকার আন্দোলনের এক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব নন্দিতা হাকসারের সঙ্গে একটি বই লিখেছেন। বইটির নাম ‘ফ্রেমড্‌ অ্যাজ আ টেরোরিস্ট’।

বইটি থেকে জানা যায় আমির পুরোনো দিল্লির বাসিন্দা। তার পিতা ছিলেন কংগ্রেস কর্মী। আমিরের বড়দির বিয়ে হয় করাচির এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে। ১৯৯৭ সালে। আমিরের বয়স তখন কুড়ি। করাচিতে দিদির কাছে যাবে। নভেম্বরের এক দুপুরবেলা। আমির পাকিস্তান হাইকমিশনের অফিস থেকে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করে রাস্তায় পা দেওয়া মাত্র এক ব্যক্তি তার সঙ্গে আলাপ জমান। ওই ব্যক্তি নিজেকে গুপ্তাজি বলে পরিচয় দিয়ে জানান, তিনি গোয়েন্দা দফতরের সঙ্গে যুক্ত। আমির কোনো দিনই গুপ্তাজির আসল নাম বা তিনি কোন গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত তা জানতে পারেনি। গোয়েন্দা সংস্থাটি সম্ভবত আইবি বা র। আমির কোথায় যাচ্ছে, কার কাছে যাচ্ছে সব জেনে নেন তিনি। তার পর আমিরের কাছে জানতে চান, সে দেশের জন্য কিছু করতে চায় কিনা। তার ও তার পরিবারের সমস্ত রকম নিরাপত্তার ব্যবস্থা গুপ্তাজি করবেন এবং আমিরকে এ কাজের জন্য টাকাও দেওয়া হবে। দিদির কাছে যাওয়ার আনন্দে মশগুল আমির রাজি হয়ে যায়। যে কাজ করার জন্য সে সম্মতি জানায়, সে সম্পর্কে তার বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না।

কয়েক দিন পর গুপ্তাজি আমিরের বাড়ি আসেন। আমিরকে তিনি জানান, তাকে (আমিরকে) করাচিতে অবস্থিত পাকিস্তান নৌবাহিনীর সদর দফতরের বিভিন্ন অংশের ছবি তুলে আনতে হবে এবং চৌধুরী বলে এক জনের সঙ্গে দেখা করতে হবে। চৌধুরী  যে সমস্ত নথি দেবেন তা দেশে নিয়ে এসে গুপ্তাজির হাতে তুলে দিতে হবে।

framed-as-a-terrorist১২ ডিসেম্বর, ১৯৯৭। আমির সমঝোতা এক্সপ্রেস ধরার অপেক্ষায় পুরোনো দিল্লি স্টেশনে। আবার গুপ্তাজির আবির্ভাব। আমিরকে একটি ক্যামেরা এবং পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে নিজের পেজার নম্বরটি (তখনও মোবাইল পরিষেবা শুরু হয়নি) একটি কাগজে লিখে দেন।

করাচি পৌঁছে দিদি, জামাইবাবু, ভাগনে-ভাগনিদের পেয়ে আমির খুবই খুশি। এক দিন গুপ্তাজির দেওয়া কাজের কথা মনে পড়ায় আমির ক্যামেরা নিয়ে পাকিস্তান নৌবাহিনীর সদর দফতরের দিকে রওনা দেয়। সেখানে পৌঁছে আঁটোসাঁটো নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখে সে ভয় পেয়ে যায়। সে ফিরে আসে। পরে আরেক দিন আবার সে চেষ্টা করে, কিন্তু বুঝে যায় যে এ কাজ তার দ্বারা হবে না। চৌধুরীর সঙ্গে অবশ্য সে দেখা করে। চৌধুরী তাকে একটি ব্যাগ দেয়।

দেশে ফেরার দিন। নিয়মমাফিক তল্লাশির জন্য সবার সঙ্গে আমিরকেও লাইনে দাঁড়াতে হয়। কিন্তু তল্লাশির বহর দেখে আমির ভয় পেয়ে যায়। স্টেশনের শৌচাগারে গিয়ে সে জানলা দিয়ে ব্যাগটি ছুড়ে ফেলে দেয়।

দেশে ফেরার পর গুপ্তাজি আমিরের সঙ্গে দেখা করেন এবং আমিরের কাছে সব কিছু শুনে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। গুপ্তাজি বলতে থাকেন আমির আসলে পাকিস্তানের চর। “দেশের হয়ে কিছু করতে না পারার” মূল্য চোকানোর পালা শুরু হল আমিরের।

২০ ফেব্রুয়ারি রাতে মসজিদে নামাজ পড়ে ওষুধ কিনতে যাওয়ার পথে দিল্লি পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চের একটি দল তাকে অপহরণ করে। তাকে আদালতে হাজির করানো হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি। মাঝের সাত দিন তাকে বেআইনি ভাবে হেফাজতে রেখে চালানো হয় নারকীয় অত্যাচার। নগ্ন করে দাঁড় করিয়ে রাখা, মুখে প্রস্রাব করে দেওয়া, শরীরে ইলেকট্রিক শক দেওয়া, পায়ুতে পেট্রোল ইনজেকশন দেওয়া, উপুড় করে শুইয়ে দিয়ে শরীরে রোলার চালানো, হাত-পায়ের নখ উপড়ে নেওয়া – অত্যাচারের অভিধানে যা কিছু আছে তা প্রয়োগ করা হয় আমিরের উপর। তার সঙ্গে আমিরের ধর্ম তুলে গালাগালিও চলতে থাকে। বারবার তার কাছে জানতে চাওয়া হয় চৌধুরীর কাছ থেকে পাওয়া ব্যাগের হদিশ। আমিরের কাছ থেকে বারবার একই উত্তর পেয়ে অত্যাচারের মাত্রা বাড়তে থাকে। তাকে পাকিস্তানের চর বলে অভিহিত করতে থাকে পুলিশ।

ধারাবাহিক অত্যাচারে এক সময় ভেঙে পড়ে আমির। তাকে দিয়ে শ’ দেড়েকের মতো সাদা কাগজে সই করিয়ে নেওয়া হয়। কয়েকটি ডায়েরিতে কয়েকটি নির্দিষ্ট তারিখে পুলিশ তাকে দিয়ে উর্দুতে তাদের ইচ্ছামতো যা খুশি লিখিয়ে নেয়। যেমন, “ম্যায় নে সদরবাজার পার্টি কো মাল দিয়া। ইমাম সাহিব সে মুলাকাত কি আউর দো পার্টি কো মাল দিয়া।” একটি ইসলামিক ডায়েরি দিয়ে তাতে কয়েকটি রাসায়নিকের নাম লিখতে বলা হয় তাকে। এই পুরো সময়টাই উপস্থিত ছিলেন গুপ্তাজি।

এর পর তাকে আদালতে পেশ করা হয়। আদালতে নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়িতে তুলে তাকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয় সে যেন আদালতে মারধরের বিষয়ে কিছু না বলে। কারণ তাকে আবার এখানেই ফিরিয়ে নিয়ে আসা হবে। মুখ খুললে তার বাবা-মাকেও তুলে নিয়ে আসা হবে। আদালতের পথে গাড়ি রওনা দেওয়ার সময় এক পুলিশ আওয়াজ তোলে ‘জয়’, অন্য পুলিশরা আওয়াজ তোলে ‘বজরংবলি কি’। আদালত থেকে তাকে চাণক্যপুরীর ইন্টারস্টেট ক্রাইম সেলের দফতরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে দেশের নানা প্রান্তে ঘটে যাওয়া বিস্ফোরণের দায় স্বীকার করতে বলা হয়। তাকে এটাও বলা হয় যে এগুলি যেহেতু মিথ্যা মামলা, তাই কিছু দিন পরেই সে ছাড়া পেয়ে যাবে। অস্বীকার করায় যথারীতি আমিরকে অত্যাচারের সম্মুখীন হতে হয়। যথারীতি অত্যাচার করে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয় এবং একে একে উনিশটি মামলায় তাকে জড়িয়ে দেওয়া হয়।

সব ক’টি মামলায় বেকসুর খালাস পেয়ে আমির যখন জেলের বাইরে এলেন, তত দিনে কেটে গিয়েছে চোদ্দোটি বছর। আমির জেলে থাকাকালীনই তার বাবা মারা যান। বাড়ি ফিরে দেখেন তার মা শয্যাশায়ী। বাকশক্তি হারিয়েছেন। আমিরের নিজের দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়েছে। তৈরি হয়েছে নানা শারীরিক সমস্যা। এতগুলি বছর রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে কেবল চরবৃত্তি করতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য এবং মুসলমান হওয়ার অপরাধে। জেল থেকে বেরিয়ে আমির শবনম হাশমির অসরকারি সংস্থা অনহদ-এ যোগ দেন এবং নাগরিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে শামিল হন। আমিরের মতো আরও মানুষ আছেন যাঁদের জীবনের অনেকগুলি বছর ‘সন্ত্রাসবাদী’ তকমা নিয়ে কেটে গিয়েছে কারাগারের অন্ধকারে। জীবনের অনেকগুলি বছর হারিয়ে তাঁরা নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here