vacation at digha
সমর মিত্র

এই মেঘ, এই বৃষ্টি, এই রোদ। আবার ফিরে ফিরে মেঘ বৃষ্টি ও রোদের পুনরাগমন — এই সার্কাস চলছে। মেঘের কোলে রোদ হেসেছে, বাদল গেছে টুটি – এই গানটি গাইতে গিয়েও বালক-বালিকার দল থমকে যাচ্ছে। কারণ কুণ্ঠা। কুণ্ঠা কেন ? কারণ তা হলে তো এর পর গাইতে হবে আজ আমাদের ছুটি রে ভাই, আজ আমাদের ছুটি। তা হলে যে যত বার রোদ উঠবে তত বার গাইতে হবে ছুটির কথা। এত বার ছুটির কথা বললে যে লজ্জা লাগে, কুণ্ঠা জাগে। কুলোকে বলবে, এত ছুটিতেও সাধ মিটল না? কত ছুটি চাই? সত্যই তো।

এই তো দুর্গা পূজো গেল। দুর্গার সঙ্গে যাঁরা এলেন মায়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁরাও পুজো পেলেন। মেয়ে লক্ষ্মী তো কয়েক দিন পর একাই এসে হাজির। দোষ হয় শুধু কার্তিকের। কার্তিকঠাকুর হ্যাংলা, একবার আসে মায়ের সাথে, একবার আসে একলা। হ্যাংলামিতে কেউ কম যান না। গণেশদাদা, সরস্বতী, সব শিয়ালের এক রা। সবাই একলা একলা পূজো পেতে চান। তাতে বোধহয় কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। কারণ এর সঙ্গে ছুটিও তো মেলে। ছুটি পেলে সব সহ্য হয়। পূজোর ছুটির মধ্যেই পড়ে কালীপূজো, দেওয়ালি, ভাইফোঁটা। এর পর জগদ্ধাত্রীপূজো।

এর মাঝেই জায়গা করে নিল ছটপূজো। মানে ছুটির ছটপূজো। আগে ছিল না। এটা হালের সংযোজন। ছট্ বাঙালিদের পুজো নয়। মূলত বিহারিদের পুজো এটি। ছট হয়তো এসেছে ষষ্ঠী থেকে। ষষ্ঠীতে এই পুজো হয়। ভাষাতাত্ত্বিকরা বলেন, ষষ্ঠী থেকে ষট, ষট থেকে ছট। আমরা অনেকেই ছটকে আপন ভেবে নিই। কারণ বাঙালিদেরও অনেক ষষ্ঠী আছে – নীলষষ্ঠী, চাপড়াষষ্ঠী, অশোকষষ্ঠী, জামাইষষ্ঠী। তার সঙ্গে না হয় যুক্ত হল আর এক ষষ্ঠী — ছটষষ্ঠী। ছটেরও আবার প্রকার ভেদ আছে। ছট দ্বিবিধ। একটা তো সবে গেল। আর একটা হয় চৈত্রে। আমাদের কাজের মেয়ে চৈত্রের ছটে ছুটি নিয়ে দেশে যায়। এ বারও যাবে। এই অন্য মতের শরিকরা যদি ছুটির জন্য আবদার করে? মানা হবে কি? মানলে আর একটা ছুটি মিলবে। মন্দ কী। ছট বললেই ছুট শব্দটি মনে আসে। আর ছুট বললেই ছুটি। ছুটি মানেই দে ছুট।

পঞ্জিকাও দুই রকম। মানে চলছে আর কী। নইলে বিজ্ঞানসম্মতভাবে পঞ্জিকা একটাই, দৃকসিদ্ধান্ত পঞ্জিকা। কিন্তু সাধারণ মানুষ অন্য পঞ্জিকা মেনে চলেন। যেটা আবহমানকাল থেকে চলে আসছে। পূজো ইত্যাদির দিনক্ষণ এই দুই পঞ্জিকার অনেক সময় মিল থাকে না। এমনও তো হতে পারে, দুটোকেই মান্যতা দিয়ে একই উপলক্ষে দু’ দিন ছুটি পাওয়া গেল। আসলে প্রজানুরঞ্জন।

ইতিমধ্যে খবর পাওয়া গেল, সরকার দোল সম্পর্কে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। কী তৎপরতা! আগে ঠিক ছিল ২ মার্চ শুক্রবার দোলের ছুটি থাকবে। পরের দিন শনিবার হোলি। তবে শনিবার এমনিতেই সরকারি অফিস বন্ধ থাকে। রাজ্যের অর্থ দফতর দোলের দিন এক দিন এগিয়ে এনেছেন। বিজ্ঞপ্তিও দিয়েছেন। অর্থাৎ দোলের জন্য ১ মার্চ বৃহষ্পতিবার ছুটি। ২ মার্চ শুক্রবার ছুটি থাকবে হোলির। তার পর তো শনি আর রবি। ক্ষণে ক্ষণে জনদরদের রেকর্ড ভেঙে যাচ্ছে। ভক্তকুল তথা ভোটদাতার আগাম ‘হোলি হ্যায়’ বলে চিৎকার শুরু করে দিয়েছেন। হয়তো তৈরি করে নিয়েছে ওই ক’দিনের জন্য আগাম কোনো সূচিও। অনেকে মনে করছেন, আমাদের পূজো অনুষ্ঠানই তো দুই মতে হয়। গোস্বামী মত আর শাক্তমত। পঞ্জিকাও দুই রকম। মানে চলছে আর কী। নইলে বিজ্ঞানসম্মতভাবে পঞ্জিকা একটাই, দৃকসিদ্ধান্ত পঞ্জিকা। কিন্তু সাধারণ মানুষ অন্য পঞ্জিকা মেনে চলেন। যেটা আবহমানকাল থেকে চলে আসছে। পূজো ইত্যাদির দিনক্ষণ এই দুই পঞ্জিকার অনেক সময় মিল থাকে না। এমনও তো হতে পারে, দুটোকেই মান্যতা দিয়ে একই উপলক্ষে দু’ দিন ছুটি পাওয়া গেল। আসলে প্রজানুরঞ্জন। প্রজাকে সন্তুষ্ট রাখতে হবে। মহার্ঘভাতা নিয়ে প্রজারা খেপে আছে। কেন্দ্রের বেতনের সঙ্গে রাজ্যের বেতনের ফারাক বেড়েই চলেছে। আগুনে জল ঢালার ব্যবস্থা থাকা চাই। গ্রামবাংলায় একটা কথা আছে। কী হবে বেতনে, মেয়েদের খ্যাটনে। খ্যাটন মানে খাওয়া-দাওয়া। মাইনে যা-ই দিক, কর্তার বাড়িতে খেয়েদেয়েই পুষিয়ে নেব। ছুটি আর খ্যাটন তো একই মুদ্রার দু’ পিঠ।

পুরো দিন ছুটি দেওয়ার অসুবিধে থাকলে পাইকারি ভাবে আধাদিন, সিকিদিন ছুটিও চালু করা যেতে পারে। এখন তো আধাদিন ছুটি চালু আছে। মনে পড়ে গেল ইস্কুল জীবনের কথা। জেলা স্কুল পরিদর্শক আমাদের ইস্কুলে এসেছেন। পরিদর্শন হয়ে গেছে। আমরা ছাত্ররা অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে তাঁর কাছে গেলাম। অ্যাপ্লিকেশনে ‘অগস্ট ভিজিট’ বলে একটা কথা ছিল। পরিদর্শক একজনকে জিজ্ঞেস করলেন ‘অগস্ট ভিজিট’ কেন ? সে তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ভুল হয়ে গেছে স্যার, ওটা এপ্রিল ভিজিট হবে। পরিদর্শক মশাই ‘অগস্ট’ শব্দের অর্থ বুঝিয়ে দিয়ে বললেন যাও তোমাদের একদিনের ছুটি দেব না। ভুল করেছ বলে আজ তোমাদের হাফ স্কুল হবে। বন্ধুটির পিঠে বেশ কয়েকটা কিল পড়লেও হাফ স্কুলের আনন্দও আমাদের কম ছিল না। কারণ বিকেলে ফুটবল পেটার সময় অনেকটা বেড়ে যেত। আমাদের একজন মাস্টারমশাইয়ের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। আমরা ছুটির জন্য লাফালাফি করলে তিনি বলতেন, ও অসুরেরা, তোমরা এখন তোমরা এখন ছুটি ছুটি করিয়া লাফাইতেছ, পরে দেখিবে অফুরান ছুটি। কিছুই করার নাই। কী করি? না, একটু তামুক খাই।

আরও বলি, মনুষ্যেতর প্রাণীর জন্যও ছুটির ব্যবস্থা আছে। ছুটি না থাকলে কাজের এনার্জি থাকে না। তাদের উৎসাহে ভাটা পড়লে আমাদের সর্বনাশ। প্রত্যন্ত পশ্চিম রাঢ়ে বাঁধনা পরব উপলক্ষে গোরু-মোষের পাঁচ দিন ছুটি। সঙ্গে ভালো খাওয়াদাওয়া। এ ছাড়া তাদের ছুটি থাকে দশহরায়, আষাঢ় নবমীতে, পঞ্চমীর ঝাঁপানে, দুর্গাপূজো ইত্যাদি পুজোপার্বণে। তবে বেশি দিন ছুটি পেলে আর কাজ করতে ইচ্ছে করে না। গোরু-মোষ শিং নাড়ে, কাঁধে জোয়াল নিতে চায় না। যে হেতু তারা মনুষ্যেতর জীব, তাই তাদের পিঠে আছড়ে পড়ে পাচনবাড়ি। অনেকে বলেন, বেশি ছুটি পেলে কর্মসংস্কৃতির বারোটা বাজবে। কাজ করার অভ্যাসে ফিরতে বিলম্ব ঘটবে। তাতে আমাদের ক্ষতি। আমাদের মনে রাখতে হবে, মানুষ ছুটি পায় কাজ করে বলেই। কাজ না থাকলে ছুটিও থাকে না। মাস্টারমশাইয়ের কথাটাই সার মনে হয়, একদিন দেখবে, কাজ নাই, অফুরান ছুটি। তখন কী করি? না, একটু তামুক খাই।

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here