jashoprakash devdas
যশোপ্রকাশ দেবদাস।

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি: শখের ফোটোগ্রাফি, তার জেরে যেতে হল জেলে। বোহেমিয়ান শখের বিপদ যে কী হতে পারে তার প্রমাণ জলপাইগুড়ির যশোপ্রকাশ দেবদাস। মধ্য চল্লিশের এই ব্যাক্তি পেশায় জলপাইগুড়ি পুরসভার ইঞ্জিনিয়ার। শনিবার রাতে তাঁকে ডুয়ার্সের কারবালা চা বাগান থেকে গ্রেফতার করে বন দফতর। তার সঙ্গে গ্রেফতার হয়েছেন আরও দুই সঙ্গী। রবিবার জলপাইগুড়ি বিশেষ  আদালতে তোলা হলে, তাঁদের এক দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেন বিচারক।

মূল অভিযুক্ত ওই ইঞ্জিনিয়ারের দাবি, তিনি শখের ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার। যদিও তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে জলপাইগুড়ি বনবিভাগ।

যেমন, ছবি তুলতে গিয়ে তিনি বন্যপ্রাণীদের রীতিমতো উত্যক্ত করতেন। বনাঞ্চলের সংরক্ষিত স্থানে যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষেধ, সেই সব জায়াগায় গাড়ি এবং দলবল নিয়ে চলে যেতেন ছবি তুলতে। দামী ক্যামেরার পাশাপাশি ব্যবহার করতেন ‘ড্রোন’-এর মতো অত্যাধুনিক দামী প্রযুক্তি। শুধু দিনে নয়, বনাঞ্চলে ঢুকে পড়তেন রাতেও, যা বন্য সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী একবারেই গর্হিত কাজ। এই সবের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের ৯ নং ধারা অনুযায়ী অভিযোগ আনা হয়েছে।

তাঁর বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ, এই সবই তিনি নিছক শখে করতেন না। এর পেছনে আছে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যও। গরুমারা বন্যপ্রাণ বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় বনাধিকারিক রাজু সরকার জানিয়েছেন, এই সব বন্যপ্রাণীদের ছবি বা ভিডিও তিনি বাণিজ্যিক ভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যবহার করতেন। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী বিনা অনুমতিতে এ সবই অপরাধমূলক কার্যকলাপ।

jasho's photo posted in social media
সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা বিতর্কিত ছবি।

বস্তুত, ধৃত যশোপ্রাকাশের নামে এই অভিযোগ বহু বার উঠেছে। একাধিকবার তাঁকে সতর্ক করা হয়েছে বনবিভাগের তরফে, জানিয়েছেন অনারারি ওয়াইল্ডলাইফ ওয়ার্ডেন সীমা চৌধুরী। কিন্তু তিনি কর্ণপাত করেননি। নিন্দুকে বলে, যশোপ্রকাশবাবুর হাতটা ‘একটু লম্বা’, তার জেরেই তিনি এত দিন নাগালের বাইরে ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে এমনও অভিযোগ রয়েছে যে পুরসভার কর্মী হিসেবে সেখানে সময় না দিয়ে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতেন। সরকারি কর্মচারী হয়েও তিনি বাণিজ্যিক কারণে ছবি তোলায়, তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও এনেছে বন দফতর। বনাধিকারিক রাজু সরকার জনিয়েছেন, অভিযুক্ত যে ভাবে বনাঞ্চলের সংরক্ষিত স্থান এবং বন্যপ্রাণীদের ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিতেন তার সু্যোগ নিয়ে থাকতে পারে চোরাশিকারিরা। কী ভাবে বনের কোন পথ ধরে গেলে কোন বন্যপ্রাণী পাওয়া যাবে তা ওই সব ভিডিও বা ছবির মাধ্যমে সহজেই বুঝে নিতে পারে চোরাশিকারীরা।

শনিবার বিকেলে বানারহাটের কারবালা চা বাগানে ঢুকে পড়ে হাতির একটি দল। সেই সময় যশোপ্রকাশ দেবদাস ও তাঁর দুই সঙ্গীও সেখানে আসেন। অভিযোগ, নিষেধ করা সত্ত্বেও হাতির দলটিকে উত্যক্ত করে ছবি তুলতে থাকেন। তখন খবর পেয়ে সেখানে আসেন ওয়াইল্ডলাইফ ওয়ার্ডেন সীমা চৌধুরী। তিনিও নিষেধ করলে যশোপ্রকাশ তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ। হুমকিও দেওয়া হয় তাঁদের। এর পরেই অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে বিন্নাগুড়ি ওয়াইল্ডলাইফ স্কোয়াড।

another photo of jashoprakash
আরেকটি বিতর্কিত ছবি।

যদিও রবিবার আদালতে আসার সময় এই সব অভিযোগ অস্বীকার করেন অভিযুক্ত ইঞ্জিনিয়ার। তাঁকে ফাঁসানো হয়েছে বলে দাবি যশোপ্রকাশ দেবদাসের। বিকেলে তাঁকে আদালতে তোলা হলে তাঁর এবং তাঁর দুই সঙ্গীর জামিনের আর্জি খারিজ করে দেন বিচারক। আদালতের সরকারি আইনজীবী প্রদীপ চ্যাটার্জী জানিয়েছেন, অভিযুক্তদের এক দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক। আগামীকাল তাঁকে ফের কোর্টে তুলে রিমান্ড-এর জন্য আবেদন জানানো হবে। অভিযুক্তের আইনজীবী বিদ্যুৎ ঘোষ এবং সন্দীপ দত্ত জানিয়েছেন, ভিত্তিহীন অভিযোগে এঁদের গ্রেফতার করেছে বোন দফতর। আগামী কাল ফের তাঁদের জামিনের জন্য আর্জি জানানো হবে।

বন দফতর সূত্রে খবর, আগামী কাল তাঁদের নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানাবে বন দফতর। যশোপ্রকাশ কী ভাবে ছবি তুলতেন এবং কী ভাবে তা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতেন তা জানার চেষ্টা করবেন বনাধিকারিকরা। তবে এই ঘটনার পর হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন পরিবেশপ্রেমীরা। জলপাইগুড়ি সায়েন্স অ্যান্ড নেচার ক্লাবের সম্পাদক অধ্যাপক রাজা রাউত জানিয়েছেন, এই অভিযোগ নতুন নয়। তিনি জানিয়েছেন, এ রকম একাধিক মানুষ রয়েছেন, যাঁরা বনাঞ্চলের নিয়ম ভেঙে নিজেদের শখ মেটান। বন দফতরের প্রশংসা করে তিনি জানান, এই কড়া পদক্ষেপে বাকিরা হয়তো নিজেদের শুধরে নেবেন। তাতে আখেরে সুরক্ষিত থাকবে বন্যপ্রাণ।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here