anuradha mohanto

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি: অন্যকে রক্ষা করা দূরের ব্যাপার, নিজের স্ত্রীকেই খুনের চেষ্টার অভিযোগ উঠল এক অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব ইন্সপেক্টরের বিরুদ্ধে। অভিযোগ, পুলিশের একাংশ ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে জলপাইগুড়িতে।

অভিযুক্ত পুলিশকর্মীর নাম অসীম সাহা। তিনি জলপাইগুড়ি পুলিশ লাইনে এএসআই পদে কর্মরত। আট বছর আগে মোহিতনগরের অনুরাধা মোহন্তর সঙ্গে বিয়ে হয় অসীম সাহার। বিয়ের সময় নগদ একলক্ষ টাকা পণ নেন। একমাত্র মেয়েকে নিয়ে তাঁরা ভিতর পাণ্ডাপাড়ায় থাকতেন।

অভিযোগ, গত ৩০ নভেম্বর বেলা ১১টা নাগাদ বাড়ি ফেরেন অসীম সাহা। খাওয়া নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বচসা শুরু হয়। সেই সময় স্ত্রীকে প্রথমে মারধর করেন অসীম। তার পর তাঁর গায়ে কেরোসিন ঢেলে দেন। এর পর লাইটার নিয়ে আসতে পাশের ঘরে যান। সেই সময় কোনো মতে বাড়ি থেকে পালান অনুরাধা। সোজা চলে আসেন কোতোয়ালি থানায়। কিন্তু থানায় এসে কোনো সুরাহা তো পানইনি, উলটে তাঁকে কেরোসিনে ভেজা অবস্থায় প্রায় চার ঘণ্টা থানায় বসিয়ে রাখা হয়। কোনো চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়নি কোতোয়ালি পুলিশের তরফে।

এর পর খবর পেয়ে অনুরাধার বাবা এবং ভাই এসে তাঁকে নিয়ে গিয়ে সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে ভর্তি করেন। দীর্ঘক্ষণ কেরোসিনে ভেজা অবস্থায় থাকাতে তাঁর সারা গায়ে সংক্রমণ হয়। বুধবার  হাসপাতাল থেকে ছাড়া হলেও বাড়িতেই চিকিৎসাধীন থাকতে হচ্ছে ওই গৃহবধূকে। সংক্রমণের ফলে তিনি চলাফেরার ক্ষমতাও প্রায় হারিয়েছেন। কথা বলতেও শারীরিক সমস্যা হচ্ছে তাঁর। বৃহস্পতিবার বিছানায় শুয়ে কোনো মতে সে দিনের ঘটনার বর্ণনা দিলেন। কেরোসিন ভেজা অবস্থায় তিনি কর্তব্যরত পুলিশ অফিসারকে অভিযোগ নেওয়ার কথা বললেও কর্তব্যরত পুলিশ অফিসার তাতে কর্ণপাত করেনি বলে অভিযোগ জানিয়েছেন অনুরাধাদেবী। বরং তাঁকে স্বামীর সঙ্গে বিষয়টি ‘মিটমাট’ করে নেওয়ার  পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, জানিয়েছেন অনুরাধা।

accused asi ashim saha
অভিযুক্ত অসীম সাহা।

ঘটনার পর অভিযুক্ত অসীম সাহা হাসপাতালে গিয়ে তাঁর মেয়েকে এবং বাড়িতে গিয়ে তাঁকে মামলা না করার জন্য হুমকি দিয়েছিলেন, জানিয়েছেন অনুরাধার বৃদ্ধ বাবা অনন্ত কুমার মোহন্ত।

সূত্রের খবর, ঘটনার দিন স্ত্রীর পিছু নিয়ে থানায়ও এসেছিলেন অভিযুক্ত অসীম। অন্য অফিসারদের কাছে স্ত্রীকে ‘পাগল’ পরিচয় দিয়ে হাসিঠাট্টা করে থানা থেকে চলে যান।

অনুরাধা দেবী জানিয়েছেন, বিয়ের পর থেকেই সামান্য কারণে তাঁকে মারধর করেন বদমেজাজি স্বামী। ওই গৃহবধূর অভিযোগ, তাঁর দেওর একাধিকবার তাঁকে কুপ্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি রাজি না হওয়া স্বামীকে তাঁর বিরুদ্ধে নানান মিথ্যা কথা বলেন। সেই দেওরের উস্কানিতেই অত্যাচারের মাত্রা দিনের পর দিন বেড়েছে। প্রতিবেশীরা সব জানলেও ‘পুলিশ স্বামীর’ ভয়ে তাঁরা সাহায্য করতে এগিয়ে আসতে পারেননি। ঘটনার দিনও তাঁরা মারধর এবং অনুরাধার বাড়ি থেকে ছুটে বেরিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখেছিলেন, জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভেতর পাণ্ডাপাড়ার এক গৃহবধূ।

অনুরাধাদেবীর আক্ষেপ, “আমার দুরবস্থা দেখেও প্রতিবেশীরা কেউ স্বামীর ভয়ে এগিয়ে আসেনি।”

ঘটনার পর একাধিক প্রশ্ন উঠেছে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে। কেন ওই দিন  অভিযোগ না নিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হল অনুরাধাদেবীকে? থানায় উপস্থিত হয়ে স্ত্রীকে কটাক্ষ করার মতো আশকারা কী ভাবে পেলেন অভিযুক্ত পুলিশকর্মী? অনুরাধা দেবী জানিয়েছেন, স্বামী পুলিশে কর্মরত হওয়ায় তাঁকে আড়াল করার চেষ্টা করছেন সহকর্মীদের একাংশ।

যদিও এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে কোতোয়ালি থানার আইসি বিশ্বাশ্রয় সরকার জানিয়েছেন, ওই দিন কর্তব্যরত অফিসার অনুরাধাদেবীকে আগে চিকিৎসা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তার পর অভিযোগ জানাতে আসতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তাঁরা আর আসেননি। অনুরাধার বাবার বক্তব্য, অসুস্থ মেয়ের চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত থাকার জন্যই পরে থানায় আসতে পারেননি তাঁরা।

সরকারি কাজে ইসলামপুরে রয়েছেন অসীম সাহা। সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে অভিযুক্ত অসীম সাহার দাবি, তাঁর স্ত্রী সামান্য বচসার কারণে তাঁকে শিক্ষা দিতে নিজেই গায়ে কেরোসিন ঢেলে থানায় গিয়ে হাজির হন।

বৃহস্পতিবার ফের থানায় আসেন অসুস্থ অনুরাধা এবং তাঁর বাবা। মহিলা থানায় স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন। সূত্রের খবর, অসীমবাবুর বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৮(এ) এবং ৩০৭ ধারায় অর্থাৎ বধূ নির্যাতন এবং খুনের চেষ্টার অভিযোগে মামলা রুজু করা হয়েছে।

জলপাইগুড়ি পুলিশ সুপার অমিতাভ মাইতি জানিয়েছেন, তদন্তে দোষী প্রমাণ হলে অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হবে। ঘটনার দিন কেন অভিযোগ নেওয়া হয়নি, তখন কোন অফিসার ডিউটিতে ছিলেন তা-ও খতিয়ে দেখা হবে জানিয়েছেন এসপি।

তবে পুলিশ স্বামীর আদৌ কোনো শাস্তি হবে কি না তা নিয়ে এখনও সন্দিহান অনুরাধা দেবী। তাঁর একটাই আর্তি, একরত্তি মেয়েকে নিয়ে তাঁকে যেন বেঁচে থাকতে দেওয়া হয়।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here