biren basak awarded D. litt
srila pramanik
শ্রীলা প্রামাণিক

ফুলিয়াতেই আদিকবি কৃত্তিবাস ওঝা রচনা করেন রামায়ণ। সেই ফুলিয়াই রাজ্যের বয়নশিল্পের প্রানকেন্দ্র। যে তাঁতশিল্পের জন্য ফুলিয়ার খ্যাতি বিশ্ব জুড়ে, সেই ফুলিয়ার জামদানি শাড়িতে রামায়ণের সপ্তকাণ্ড ফুটিয়ে তুলেছিলেন তাঁতশিল্পী বীরেন কুমার বসাক। তাঁতশিল্প আর কৃত্তিবাসী রামায়ণ, ফুলিয়ার সেই দুই গৌরব মিলেমিশে একাকার।  সেই কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটেনের ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস ইউনিভার্সিটি এ বার সাম্মানিক ডি লিট দিয়ে সম্মানিত করল ফুলিয়ার এই প্রথিতযশা তাঁতশিল্পীকে।

নদিয়ার শান্তিপুর থানার ফুলিয়া চটকাতলার বাসিন্দা বীরেন কুমার বসাক গত চার দশকের বেশি সময় ধরে তাঁতশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। মাত্র আট বছর বয়সেই তাঁতশিল্পের নানা খুঁটিনাটি বিষয়ের সঙ্গে তাঁর পরিচিতি। তাঁতশিল্পে তাঁর শৈল্পিক চিন্তাভাবনার প্রকাশ ঘটেছে বারবার।

কখনও নানা প্রাকৃতিক দৃশ্যপট আঁকা ছবির মতো সুচারু ভাবে ফুটে উঠেছে তাঁর তৈরি শড়িতে। কখনও বা আপন খেয়ালেই আদিম যুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত মানবসভ্যতার বিবর্তনের কাহিনি তুলে ধরেছেন তিনি। শাড়িতে ধরা পড়েছে গুহামানব থেকে প্রস্তর যুগ, এমনকি আধুনিক যুগও। আবার সচেতনতার বার্তা নিয়ে বিশ্ব উষ্ণায়নও উঠে এসেছে তাঁর শাড়িতে। একাধিক গণেশের মূর্তি সংবলিত শাড়ি নজর কেড়েছে যেমন, তেমনি নানা বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের প্রতিমূর্তিও ঠাঁই পেয়েছে বিভিন্ন সময়ে এই বর্ষীয়ান তাঁতশিল্পীর সৃষ্টিতে।

এই ভাবেই তিনি তৈরী করেছিলেন রামায়ণ শাড়ি। জামদানি শাড়িতে নিখুঁত নকশায় ফুটে উঠেছিল কৃত্তিবাসী রামায়ণের সাতকাণ্ড। ১৯৯৫ সালে তাঁর হাতেই কৃত্তিবাসী রামায়ণ উঠে আসে জামদানি শাড়িতে। তসরের ওপরে সুতোর হাতে বোনা জামদানির কাজে উঠে আসে সপ্তকাণ্ড রামায়ণ। এই শাড়ি তৈরি অবশ্য এক দিনে হয়নি। এর প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও তৈরিতে লেগে যায় প্রায় তিন বছর।

ramayan depicted on zamdani
জামদানিতে রামায়ণ।

লিমকা বুক অফ রেকর্ডস আগেই এই রামায়ণ শাড়ির স্বীকৃতি দিয়েছে। এই রামায়ণ শাড়ির জন্য এর আগে জোড়া জাতীয় পুরস্কার গিয়েছে বীরেনবাবুর ঝুলিতে। পেয়েছেন ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড এবং কেন্দ্রীয় বস্ত্র মন্ত্রকের দেওয়া ভারতে শাড়ির সব থেকে বড়ো পুরস্কার সন্ত কবীর অ্যাওয়ার্ড। শুধু তা-ই নয়, রাজ্য সরকারের কন্যাশ্রী শাড়িও তৈরি হয়েছে তাঁর হাতেই। শনিবার দুপুরে দিল্লিতে একটি পাঁচতারা হোটেলে তাঁদের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বীরেনবাবুকে রামায়ণ শাড়ির জন্য সাম্মানিক ডি লিট উপাধিতে সম্মানিত করল ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস ইউনিভার্সিটি। এ দিন বীরেনবাবু বলেন, “ভালো লাগছে। আমি তাঁতশিল্পের জন্য আরও নতুন নতুন সৃষ্টি করে যেতে চাই।”

এই ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস ইউনিভার্সিটি ব্রিটেনের একটি স্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় যা বিশ্বব্যাপী রেকর্ড বুক সংস্থার সংকলন দ্বারা গঠিত। এর সহযোগীদের মধ্যে রয়েছে এশিয়া বুক অব রেকর্ডস, ভিয়েতনাম বুক অফ রেকর্ডস, ইন্ডো-চায়না বুক অফ রেকর্ডস, ইন্ডিয়া বুক অফ রেকর্ডস, নেপাল বুক অফ রেকর্ডস, ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস ইউনিয়ন, ওয়ার্ল্ড ক্রিয়েটিভিটি সায়েন্স অ্যাকাডেমি এবং ইন্ডো-ভিয়েতনাম মেডিক্যাল বোর্ডের মতো সংস্থা।

birenbabu busy at his work
নিজের শিল্পকর্মে ব্যস্ত বীরেনবাবু।

বিভিন্ন বিষয়ে যাঁরা রেকর্ড করেন তাঁদের রেকর্ডের ওপর নিরন্তর গবেষণা চালিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় তাঁদের সম্মানিত করে। চিকিৎসা বিজ্ঞান, সাহিত্য ইত্যাদি বিষয়ে নিখুঁত ভাবে কোনো কাজ সম্পন্ন করেছেন এবং বিশেষভাবে একটি বিশ্ব বা জাতীয় রেকর্ড করেছেন তাঁদের এ ভাবে সম্মানিত করা হয়।

লিমকা বুক অফ রেকর্ডসে বীরেন বসাকের রামায়ণ শাড়ি স্বীকৃতি পাওয়ার পরে প্রায় এক বছর ধরে তার কাজের কাটাছেঁড়া করেছে বিশ্ববিদ্যালয়। তার পর তাঁকে ডি লিট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ দিন একই সঙ্গে ভারত এবং ভিয়েতনামের ২০ জনকে নানা ক্ষেত্রে পারদর্শিতার জন্য সাম্মানিক উপাধি প্রদান করল এই বিশ্ববিদ্যালয়। আর আন্তর্জাতিক সম্মানের সেই তালিকায় যুক্ত হল বিশ্বমঞ্চে ফুলিয়ার তাঁতশিল্পের জয় পতাকা তুলে ধরা এক বঙ্গতনয়ের নামও।

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here