jalpaiguri cheater

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি: পাত্রী প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা, পাত্রও জুনিয়র হাই স্কুলের শিক্ষক। সম্বন্ধটা বেশ ভালোই মনে ধরেছিল পাত্রীর পরিবারের। পাত্রের আত্মীয়দের তালিকায় শহরের এক বিশিষ্ট নাগরিকের নাম জেনে বেশ খুশি হয়েছিল পাত্রীর পরিবার। পাকা দেখা, আশীর্বাদের পর রেজিস্ট্রি করে বিয়েটাও হয়ে যায়। শুধু সামাজিক বিয়েটাই বাকি ছিল, দিন ঠিক হয়েছিল ৩০ এপ্রিল। আশীর্বাদি স্বরূপ একটি সোনার চেন এবং বিয়ের পর ঘর সাজানোর জন্য ফার্নিচার কেনা বাবদ এক লক্ষ টাকা নগদ তার হাতে দেয় পাত্রীর পরিবার। কিন্তু একটি ফোনের সূত্র ধরে সন্দেহ জাগে পাত্রী এবং তার ভাইয়ের। খোঁজ নিতেই চোখ কপালে। পাত্র শিক্ষক তো নয়ই, আদতে তার পেশা ‘প্রতারণা’। বিভিন্ন ভাবে লোক ঠকিয়ে অর্থ রোজগার করাটাই তার পেশা। আপাতত ছাঁদনাতলার পরিবর্তে প্রতারক অনুমপ বোসের জায়গা শ্রীঘরে।

অভিযুক্ত অনুপমের বাড়ি কোচবিহারে। গত দশ মাস ধরে জলপাইগুড়ির মুহুরিপাড়ায় একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকত। ঘটনাচক্রে সেই আবাসনেই থাকেন জলপাইগুড়ির পৌরপ্রধান মোহন বোস। এক ঘটকের মাধ্যমে মুহুড়িপাড়ারই বাসিন্দা ওই তরুণীর সঙ্গে বিয়ের সম্বন্ধ হয় তার। পাত্রী প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা। অনুপম নিজেকে পাতাকাটা জুনিয়র হাই স্কুলের শিক্ষক বলে পরিচয় দেয়। পদবি এক হওয়ার সুবাদে নিজেকে ওই আবাসনের দীর্ঘদিনের বাসিন্দা তথা শহরের প্রধান নাগরিক পৌরপ্রধান মোহন বোসের আত্মীয় বলে পরিচয় দিয়েছিল সে।

ওই তরুণীর সঙ্গে তার বিয়ে পাকা হয়ে যায়। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি রেজিস্ট্রি হয় তাদের। আর্শীবাদ স্বরূপ একটি সোনার চেন অনুপমকে দেওয়া হয়। বিয়ের পর ফ্ল্যাট সাজানোর জন্য ফার্নিচার বানানো বাবদ এক লক্ষ টাকা চায় সে। তার সে আবদারও মেটায় পাত্রীপক্ষ।

দিন কয়েক আগে  হঠাৎই একটি ফোনের সূত্র ধরে পাত্রীর ভাই জানতে পারেন, শিক্ষকের চাকরি দেওয়ার নাম করে এক যুবকের কাছ থেকে পঁচিশ হাজার টাকা নিয়েছে অনুপম। এর পরেই সন্দেহ জাগে, তার সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া শুরু হয়। শিক্ষকের চাকরির প্রমাণ হিসেবে যে স্যাল্যারি স্লিপ দিয়েছিল অনুপম, তা ছিল ভূয়ো। সংশ্লিষ্ট জায়গায় খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন পাত্রীর ভাই। পৌরপ্রধান মোহন বোসের সঙ্গেও তার কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই, জানা যায় তা-ও।

সব জানার পর স্বাভাবিক ভাবেই যেন আকাশ ভেঙে পড়ে পাত্রীর পরিবারের ওপর। বিয়ের সব আয়োজন প্রায় চূড়ান্ত। সেখানে এই প্রতারণার ব্যাপার তাঁরা মেনে নিতে পারছিলেন না। মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও পাত্রীই সিদ্ধান্ত নেন এর একটা বিহিত করতে হবে। সেইমতোই অনুপমকে কিছু বুঝতে না দিয়ে বুধবার রাতে তাকে বাড়িতে ডেকে পাঠান পাত্রী। হবু শ্বশুরবাড়িতে পা দিয়েই অনুপম বুঝতে পারে কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে। কারণ পাত্রীর বাড়ির লোক ছাড়াও সেখানে স্থানীয় বাসিন্দারা এবং একটি ক্লাবের ছেলেরা উপস্থিত। শুরু হয় জেরা। প্রথমে স্বীকার না করলেও কয়েকটা চড়চাপড় পড়তেই আসল সত্য বেরিয়ে আসে। এর পর কোতোয়ালি থানার পুলিশ ডেকে তাকে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। যদিও তার আগে তাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে বেশ খানিকটা উত্তমমধ্যম দেওয়া হয়।

পাত্রীর পরিবারে পক্ষ থেকে প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছে। ঘটনা শুনে হতবাক মোহন বোস নিজেও। একই আবাসনে থাকলে ওই যুবকের সঙ্গে তার পরিচয়ই ছিল না, জানিয়েছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার অনুপমকে জলপাইগুড়ি আদালতে তোলা হয়। আদালতের সরকারি আইনজীবী প্রদীপ চ্যাটার্জী জানিয়েছেন, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রতারণা এবং প্রতারণার উদ্দেশ্যে ভুয়ো পরিচয় ব্যবহার করার অভিযোগ আনা হয়েছে। বিচারক সাত দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন অভিযুক্তের। জেরায় অনুপম জানিয়েছে, সে একটি বহুজাতিক কোম্পানির এজেন্ট। তবে এই দাবিও কতটা সত্যি তা নিয়েও সংশয় রয়েছে পুলিশের।

কোতোয়ালি থানার আইসি বিশ্বাশ্রয় সরকার জানিয়েছেন, অনুপম এই রকম আরও কোনো প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত কি না তা জানতে তাকে জেরা করা চালিয়ে যাওয়া হবে। নগদ টাকা এবং গয়না উদ্ধারেরও চেষ্টা চলবে।

তবে ঘটনার পর খুব একটা হেলদোল দেখা যায়নি অনুপমের মধ্যে। প্রতারণা কেন করতে গেল এই প্রশ্নের উত্তরে তার পালটা জবাব, পাত্রীপক্ষেরই খোঁজ নেওয়া উচিত ছিল। তার দাবি, যে ঘটকের মাধ্যমে এই বিয়ে ঠিক হয়েছিল তার পরামর্শেই এই ঘটনা ঘটিয়েছে সে। এখন সেই ঘটকের পরিচয় পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন