দরভা (বস্তার, ছত্তীসগঢ়) : ২০১৫-এর ২৯ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার হয়েছিলেন সাংবাদিক সন্তোষ যাদব। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে দীর্ঘ সতেরো মাস পর জামিন পেলেন তিনি। তিন কন্যার পিতা সন্তোষ। যখন গ্রেফতার হন তখন ছোটোটির বয়স ছিল দু’ মাস। 

এই সতেরো মাস কম অত্যাচার সহ্য করতে হয়নি ‘নবভারত’-এর এই সাংবাদিককে। কোনো প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও তাঁর বিরুদ্ধে দাঙ্গা বাধানো, সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের (মাওবাদী) সঙ্গে যোগসাজশ, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের ধারা আনা হয়। সেই সঙ্গে জেলে থাকাকালীন পুলিশের হাতে বেদম মার খেয়ে ছ’ ঘণ্টা অজ্ঞান ছিলেন এই সাংবাদিক।

মাওবাদী দমনের নামে বস্তারের নিরীহ গ্রামবাসীদের ওপর পুলিশের যে অত্যাচারের অভিযোগ এতদিন হয়ে আসছে, তা ফের একবার সামনে এল সন্তোষের এই ঘটনায়।

কিন্তু সন্তোষের দোষ কী ছিল?

পুরো বিশ্লেষণ করার জন্য ফিরে যেতে হবে ২০১৩ সালে, যখন এই দরভাতেই মাওবাদীদের অতর্কিত হামলায় নিহত হন প্রবীণ কংগ্রেস নেতা-সহ সাতাশজন। এর পর মাওবাদী দমনে নামে পুলিশ। কিন্তু মাওবাদীদের ধরার নাম করে নিরীহ গ্রামবাসীদের ওপর বাড়তে থাকে পুলিশের অত্যাচার। বিনা দোষে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন অনেক গ্রামবাসী। যখনই পুলিশি অত্যাচারের বিরুদ্ধে গ্রামবাসীদের তরফ থেকে প্রতিবাদের আয়োজন করা হত তখনই ক্যামেরা নিয়ে স্পটে চলে যেতেন সন্তোষ।

ধীরে ধীরে সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের কাছে সন্তোষ হয়ে উঠেছিলেন প্রধান ‘লিঙ্ক ম্যান’। তাঁর ভরসায় বস্তারের প্রত্যন্ত প্রান্তে ঘুরেছেন সারা দেশ থেকে আসা অনেক সাংবাদিক। এমনকি বস্তারের কোনো খবরের সত্যতা যাচাইয়ের জন্যও সঞ্জয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন অনেকে। অঞ্চলের সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর করার জন্যও সাহায্য করেছেন সঞ্জয়।

শুধু কি সর্বভারতীয় সাংবাদিক? স্থানীয় গ্রামবাসীদের কাছেই ‘মুশকিল আসান’ ছিলেন সন্তোষ। গ্রেফতার হওয়া গ্রামবাসীদের পরিবারকে জগদলপুরে নিয়ে গিয়েছেন তিনি। সাক্ষাৎ করিয়েছেন ‘জগদলপুর লিগ্যাল এড গ্রুপ’-এর সঙ্গে। পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া মানুষদের বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দেয় এই সংস্থাটি। অনেকের মতে, এই সব ‘কাণ্ডকারখানা’ করার জন্যই পুলিশের ‘টার্গেট’ হয়ে যান এই সাংবাদিক।

পুলিশের কাছে সুযোগ এসে যায় ২০১৫-এর ২১ আগস্ট। সেই দিন মাওবাদী হানায় নিহত হন এক পুলিশকর্মী। ঘটনাস্থলে থাকা ছত্তীসগঢ় পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের কম্যান্ডার মহান্ত সিংহের অভিযোগের ভিত্তিতেই পরের মাসে গ্রেফতার হন সন্তোষ। মহান্তের অভিযোগ ছিল, তিনি নাকি রাতের অন্ধকারে মাওবাদীদের ফাটানো বোমার আলোতে সঞ্জয়কে দেখেছেন। সন্তোষ নাকি একজন মাওবাদী নেতার পেছনে দাঁড়িয়েছিল। যদিও পরবর্তীকালে টিআই প্যারেডে এই সাংবাদিককে চিনতে অস্বীকার করেন তিনি।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, মাওবাদী হামলার এক মাসেরও বেশি পরে কেন সন্তোষকে গ্রেফতার করা হয়? জেলে ঢোকানোর পর প্রথম ক’দিন তাঁর বিরুদ্ধে মাওবাদী যোগাযোগের কোনো অভিযোগই আনতে পারেনি পুলিশ। কিন্তু ওই বছরের ২ অক্টোবর পুলিশ জানায়, সন্তোষের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে ওই মাওবাদী হামলার ঘটনাস্থল থেকে নাকি ওই হামলায় ব্যবহৃত সামগ্রী উদ্ধার করেছে তারা। জগদলপুর লিগ্যাল এড গ্রুপের আইনজীবী ঈশা খান্ডেলওয়ালের মতে, “মনে হয় সঞ্জয়কে গ্রেফতার করার পর তাঁর বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর সব অভিযোগ আনার জন্য হন্নে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল পুলিশ।”

সন্তোষ কিন্তু একমাত্র সাংবাদিক নন, যিনি পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন। ২০১৫-এর ২৯ সেপ্টেম্বরের আড়াই মাস আগে সোমারু নাগ নামে আরও এক সাংবাদিককে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধেও সন্তোষের মতোই সব অভিযোগ আনা হয়। কিন্তু এই সব অভিযোগ মিথ্যে প্রমাণিত হয়, এবং এক বছরের মধ্যেই ছাড়া পেয়ে যান সোমারু।

উল্লেখ্য, সাংবাদিকদের হেনস্থার বিরুদ্ধে গত বছর একটি কমিটি গঠন করে ছত্তীসগঢ় সরকার। দু’জন সাংবাদিক, পুলিশ এবং প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্তাদের নিয়ে গঠিত হয় কমিটিটি। সরকারের নির্দেশমতো সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে করা কোনো এফআইআর প্রথমে আসবে জনসংযোগ দফতরের কাছে। এই দফতর তার পর পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিশদ খোঁজ নেবে।

ছত্তীসগঢ় জনসংযোগ দফতরের ডিরেক্টর রাজেশ টোপ্পোর স্বীকারোক্তি, তাঁদের কাছে সন্তোষ যাদবের ঘটনাটি আসে, কিন্তু তাঁর ব্যাপারে জানার জন্য যখন পুলিশের কাছে রিপোর্ট চাওয়া হয়, তখন পুলিশ স্পষ্টতই জানিয়ে দেয় সন্তোষ নাকি সাংবাদিক নন। অবশ্য সন্তোষ যে সাংবাদিক সেটা পরিষ্কার করে দিয়েছেন ‘নবভারত’-এর সম্পাদক রুচির গর্গ। তিনি জানিয়েছেন, “নবভারত সন্তোষের অবদানের কথা কখনও অস্বীকার করেনি।”

হেফাজতে থাকাকালীন পুলিশি অত্যাচারেরও শিকার হয়েছেন সন্তোষ। জগদলপুর সেন্ট্রাল জেলে খাবার মান নিয়ে বাকি বন্দিদের সঙ্গে অনশনে বসেন সন্তোষ। এর পরই তাঁকে বেদম মারে পুলিশ। ঘটনার ফলে প্রায় ছ’ ঘণ্টা অচৈতন্য ছিলেন তিনি। এ ব্যাপারে একটি রিপোর্ট দেয় জগদলপুর লিগ্যাল এড গ্রুপ। রিপোর্টে তারা জানায়, তাঁর নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতার জন্যই পুলিশের লক্ষ্য ছিলেন তিনি। এর কিছুদিন পর তাঁকে কানকের জেলে স্থানান্তরিত করে দেওয়া হয়।

জামিন পাওয়াতেও কম দুর্ভোগ পোহাতে হয়নি সন্তোষকে। গত বছর জানুয়ারি এবং জুনে জগদলপুরের জাতীয় তদন্তকারী সংস্থার কোর্টে তাঁর জামিন নাকচ হওয়ার পর আগস্টে ছত্তীসগঢ় হাইকোর্টেও জামিন নাকচ হয় সন্তোষের। মূলত মহান্ত সিংহের অভিযোগ এবং গ্রেফতার হওয়ার সময় সন্তোষের থেকে উদ্ধার হওয়া মোবাইল ফোন, ২২০ টাকা সমেত পয়সার ব্যাগ এবং প্যান নম্বরের ভিত্তিতেই জামিন নামঞ্জুর করে হাইকোর্ট।

একটুও সময় নষ্ট না করে শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হন সন্তোষের আইনজীবীরা। গত বছর সেপ্টেম্বরে শীর্ষ আদালতে দায়ের করা জামিনের আবেদনে সন্তোষের আইনজীবীরা যুক্তি দেন, সন্তোষের কোনো অপরাধমূলক কাজকর্মের অতীত নেই, অভিযোগ দায়ের করার চল্লিশ দিন পরে গ্রেফতার হন তিনি। নিজের বাড়ি থেকে গ্রেফতার হয়েছিলেন সন্তোষ সুতরাং তিনি কখনোই পলাতক ছিলেন না। আরও বলা হয়, যাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে সন্তোষকে গ্রেফতার করার হয়েছিল, টিআই প্যারেডে সন্তোষকে চিনতেই পারেননি তিনি। এই সব ব্যাপার খতিয়ে দেখে সন্তোষ যাদবের জামিন মঞ্জুর করল সুপ্রিম কোর্ট।

১৭ মাস পর পরিবারের কাছে ফিরে এলেন সন্তোষ। আগে জগদলপুর জেলে থাকার সময় স্ত্রী পুনম নিয়মিত দেখা করতে যেতেন। কিন্তু দরভা থেকে ১৯৫ কিমি দূরে কানকের জেলে সন্তোষকে সরিয়ে দেওয়ার পর আর দেখা হয়নি। সাড়ে তিন মাস পর বাড়ি আবার দেখা হল। তিন মেয়ে বড়ো হয়েছে কিছুটা। বড়ো ৬ বছর, মেজো ৪ আর ছোটো ১ বছর ৯ মাস। “কিন্তু ছোটোটা তো চিনতেই পারছে না বাবাকে” — বললেন পুনম।

জামিনে মুক্ত হলেও, ফের কী সমস্যার মুখোমুখি হন সন্তোষ এখন সেটাই দেখার।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন