smita das
স্মিতা দাস

বাসে করে যেতে যেতে হঠাৎ একটা শিশুর কান্না কানে এল। ভালো করে কান করে শুনে বুঝতে পারলাম কেকের জন্য বায়না ধরেছে সে। তা-ও বড়োদিনে খাবে বলে। শিশু আর তার মায়ের কথোপকথন থেকে বোঝা গেল আগের বারের মতোই রিচ ফ্রুট কেক আনতে হবে। অন্য কিছু হলে চলবে না। আর ওই কেকটা তার বন্ধুদেরও খুব ভালো লেগেছে। মা-ও তাকে কথা দেন সেই কেকই কিনে দেবেন।

রিচ ফ্রুট কেক নামটা শুনলেই অনেকেরই একটা বিশেষ দোকানের নাম মনে চলে আসে। তা হল ‘নাহোমস’। ১১৫টা বড়োদিন পার করা এই নাম এখন কলকাতার কেকপ্রেমী মানুষদের কাছে আপনার জনের মতোই হয়ে উঠেছে।

১৯০২ সালে ইসরায়েল নাহোম শুরু করেছিলেন এই দোকান। তার পর পারিবারিক সূত্রে তাঁর ছেলে আর তার পর নাতি আইজ্যাক ইলায়েস নাহোম এখন এই দোকানের দায়িত্বে। তবে মালিকানা বদল হলেও বদল আসেনি কিন্তু কেকের স্বাদে। ঠিক একই রেসিপি মেনে একই ভাবে কেকপ্রেমীদের কাছে কেক সরবরাহ করে চলেছেন তাঁরা। তাঁদের বেশ কয়েকটি কেক বিশেষ কারিগরিতে তৈরি করা হয়। তার মধ্যে রয়েছে রিচ ফ্রুট কেক। “খ্রিস্টমাস মানেই নাহোমসের ‘রিচ ফ্রুট কেক’ – দারুণ জনপ্রিয় এই কেক” বললেন সংস্থার অ্যাকাউন্টেন্ট জগদীশ হালদার। এ ছাড়া খ্রিস্টমাস স্পেশাল মিনস পাইস, লাইট প্লাম কেক, মার্জি প্যান, ফাজের নানান আইটেম – ক্রিম ফাজ, চকোলেট ফাজ তা ছাড়া মেক্রোন আর ব্রাউনি তো আছেই। ডিসেম্বর এলেই খ্রিস্টমাসের ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়। প্রতি দিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দোকান খোলা থাকে। প্রতি দিন শ’য়ে শ’য়ে লোকে ভিড় করেন শুধু রিচ ফ্রুট কেক কেনার জন্য। এ ছাড়া অন্যান্য কেক, পেস্ট্রি, প্যাটিস তো আছেই। তবে মরশুমি চাপ কমলে গরমের সময়টা একটু মন্দা থাকে। কিন্তু তা বলে কেকের গুণমান আর রেসিপিতে কোনো রকম খামতি দেওয়া হয় না। “বংশ পরম্পরার ব্যবসা। অনেক ক্রেতাও বংশ পরম্পরায় এখান থেকে কেক কিনছেন। মান তো ধরে রাখতেই হবে”, বললেন জগদীশবাবু।

এক ক্রেতা বললেন, “যত সকালেই এখানে আসি একটা লম্বা লাইন পেরিয়ে ভিড় ঠেলে তবে নিজের পছন্দের কেক প্যাটিস হাতে পাই। তবু এই ভিড়টা ভালো লাগে কারণ স্বাদটা যে অনবদ্য।”

অন্য এক জন ক্রেতা বলেন, “বহু বছর ধরে এই দোকানের কেক খেয়ে আসছি। রিচ ফ্রুট কেকটা যেন সারা বছর জিভে লেগে থাকে। ছোটোবেলায় বাবার হাত ধরে আমি আসতাম। এখন আমার হাত ধরে আমার ছেলে মেয়েরা আসছে। ওরাও সমান ভালোবাসে নাহোমসের কেক”।

হগ মার্কেটের ভেতরে নাহোমস অ্যান্ড সন্স। এক ডাকে যে কেউ দেখিয়ে দেবেন এই দোকান বা তেমন নাক থাকলে একটু দূর থেকে নিজেই কেকের একটা সুন্দর গন্ধ শুকেই পৌঁছে যাওয়া যাবে দোকানে।

এ তো গেল ১১৫ বছরের পুরোনো দোকানের কথা। কিন্তু এই নিউ মার্কেটে নাহোমস-এর সঙ্গেই বহু পুরোনো দোকান হিসাবে পাল্লা দিচ্ছে আরও ১৪৩ বছরের পুরনো আরও দু’টো কেকের দোকান – মল্লিক কনফেকশনার্স, ইম্পিরিয়্যাল বেকার্স অ্যান্ড কনফেকশনার্স। এই দু’টো দোকানই দীর্ঘ দিন আগে থেকে কেকের ব্যবসা করে আসছে।

ইম্পিরিয়্যাল বেকার্স অ্যান্ড কনফেকশনার্সের কর্ণধার শেখ আসিফ রহমান জানান, শীতের সঙ্গে সঙ্গে কেকের একটা মেলবন্ধন রয়েছে। পাঁচ পুরুষ ধরে এটাই দেখে আসছেন তাঁরা। ১৮৭৪ সালে তাঁর ঠাকুমার বাবার তৈরি এই দোকান। ঠাকুরদা খুব ভালো কেক বানাতেন বলে ঠাকুমার বাবা ঠাকুরমার সঙ্গে তাঁর বিয়ে দেন। আর বিয়ের পর থেকে বংশপরম্পরায় তাঁরাই সামলাচ্ছেন দায়িত্ব। তিনি বলেন, বড়োদিনের আগের সপ্তাহটায় চাপ প্রতি বছরই বেশি থাকে। কাঁচামালের দাম বাড়ুক বা কমুক এটাই হয়ে আসছে। জিএসটি-র চাপ, ডিমের দাম বৃদ্ধির জন্য কেকের দাম এ বছর সামান্য বাড়াতে হয়েছে ঠিকই। কিন্তু কেকের মানের কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। খ্রিস্টমাস উপলক্ষে স্পেশাল কিছু কেক বানানো হয়। তার মধ্যে রয়েছে ওয়ালনাট, চিজ কেক, লাইট ফ্রুট কেক, রয়্যাল কাজু কেক, প্লাম কেক, আমন্ড স্পেশাল কেক। বড়োদিনের এই সময় ছাড়াও সারা বছরই কেকের কম বেশি বিক্রি থাকেই। দোকান খোলা থাকে সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত।

মল্লিক কনফেকশনার্স তেমনই একটা সুপ্রাচীন কেকের দোকান। ১৮৭৪ সালে প্রতিষ্ঠা হয় এই দোকানও। দোকানের অন্যতম কর্ণধার সৌরভ মল্লিক বলেন, প্রতি বছরের মতো এ বারেও কেকের চাহিদা তুঙ্গে। দাম তো সামান্য বাড়াতেই হয়েছে সব কিছুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে। জিএসটির চাপ, ডিমের দাম বাড়া সবটাই কেকের বাজারে প্রভাব ফেলেছে। অন্য দিকে কর্মচারীরাও চাপ দিচ্ছে মজুরি বাড়ানোর জন্য। ফলে দাম সামান্য না বাড়িয়ে উপায় নেই। কিন্তু তাতে ক্রেতাদের আনাগোনা, কেক কেনায় কোনো প্রভাব পড়েনি। সমান ভাবে বাজার বজায় আছে। কথায় কথায় তিনি বলেন, প্রায় পাঁচ প্রজন্মের দোকান এটা। ভালো কেক খাইয়ে আনন্দ পেয়েছেন তাঁদের পূর্বপুরুষরা। এখন সেই আনন্দ উপভোগ করেন তাঁরাও। তাই যা-ই হয়ে যাক কেক, প্যাটিসের গুণমানের খামতি করা চলবে না। বড়োদিনের চার-পাঁচ আগে থেকে ক্রেতাদের ভিড় খুব বাড়ে। তখন ঠিক ভাবে সবটা সামলানোই চ্যালেঞ্জ। না হলে এত দিনের সুনাম নষ্ট হবে। বছরের অন্য সময় বাজার খারাপ থাকলেও সেটা সব কেকের দোকানেরই সমস্যা। আর কনফেকশনারির ইতিহাসে মল্লিকদের দোকান একটা মনে রাখার মতো নাম।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here