নুিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি: দুর্ব্যবহার, জোর করে শুটিং বন্ধ করার অভিযোগ। পুলিশের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ তুলে ডুয়ার্স থেকে কলকাতায় ফিরে গেলেন একটি মেগা সিরিয়ালের কলাকুশলীরা। ফের প্রশ্ন উঠল, ডুয়ার্সে ‘ফিল্ম টুরিজম’-এর স্বপ্ন কি অপূর্ণই থেকে যাবে?

সুন্দরী ডুয়ার্স ইতিমধ্যেই অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছে। জঙ্গল-নদী-পাহাড় ঘেরা ডুয়ার্স সিনেমা, সিরিয়ালের পরিচালকদের কাছেও পছন্দের জায়গা। শুধু টলিউড নয়, বলিউডি সিনেমার শুটিংও হয়েছে এখানে। তুলনামূলক ভাবে সস্তা এবং সুন্দর লোকেশন, মানুষের আন্তরিকতা বারবার কলকাতা বা মুম্বইইয়ের পরিচালক, কলাকুশলীদের টেনে এনেছে এখানে। এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এই ‘ফিল্ম টুরিজম’-এর ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। তা ছাড়া পাহাড়ে অস্থিরতার দরুন ডুয়ার্সই এখন একমাত্র বিকল্প।

এর আগে সিনেমার শুটিং করতে এসে অসহযোগিতার অভিযোগ তুলেছিলেন পরিচালক অরিন্দম শীল। তখন ব্যপারটা থানা-পুলিশ অবধি গড়িয়েছিল। এ দিনের অভিযোগ পুলিশেরই বিরুদ্ধে ওঠায় ফের বড়োসড়ো প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের জনপ্রিয় মেগা সিরিয়াল ‘রাখি বন্ধন’-এর শুটিং-এর জন্য গত ৭ নভেম্বর চালসার জঙ্গল ক্যাম্প রিসোর্টে এসে ওঠেন সিরিয়ালের কলাকুশলীরা। পরিচালক সীমান্ত ব্যানার্জি, দুই মুখ্য শিশুশিল্পী কীর্তিকা চক্রবর্তী, সোহম বসু রায়চৌধুরী সহ ৬০ জন ছিলেন এই দলে। শিলিগুড়ির ‘সিনে সলিউশন’ নামে একটি বেসরকারি সংস্থা এই শুটিং দলটির সমস্ত ব্যবস্থাপনার  দায়িত্বে ছিল।

two child artists
সিরিয়ালের দুই শিশু শিল্পী।

বৃহস্পতিবার সন্ধে সাড়ে সাতটা নাগাদ তাঁরা ওই রিসর্টের ভেতরেই একটি দৃশ্যের শুট করছিলেন। আটটা নাগাদ স্থানীয় মেটেলি থানার দুই অফিসার সেখানে আসেন। শুটিং বন্ধ করার নির্দেশ দেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, শুটিং করার জন্য স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের কাছ থেকে কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। শুটিং-এর কর্মকর্তারা জানান, মালবাজার থানায় আগাম অনুমিত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ওই পুলিশ অফিসারদের দাবি ছিল, এই রিসোর্টটি মেটেলি থানার পুলিশের আওতায় রয়েছে তাই ওই অনুমতি দিয়ে শুটিং করা যাবে না। তখন সিনে সলিউশনের কর্মকর্তারা সঙ্গে সঙ্গেই অনুমতি চেয়ে আবেদন করতে চান। সেই সঙ্গে তাঁরা অনুরোধ করেন যাতে শুটিং চালু থাকে, যে হেতু একটা শুটিং-এর সঙ্গে অনেক প্রস্তুতি এবং আর্থিক বিষয় জড়িয়ে থাকে। কিন্তু তাতে ওই পুলিশ অফিসাররা কর্ণপাত করেননি বরং তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ। থানার অনুমতি না নিয়ে কেন শুটিং করা হচ্ছে সেই প্রশ্ন তুলে রিসোর্টের দায়িত্বে থাকা কর্মীদেরও হুমকি দেন এক পুলিশ অফিসার। এর পর শুটিং বন্ধ করার নির্দেশ দিয়ে তাঁরা ফিরে যান। রিসোর্টের কর্মীরাও ভয় পেয়ে শুটিং চালাতে দিতে চাননি। বাধ্য হয়েই তাঁদের শুট বন্ধ করে দিতে হয়। শুক্রবার পরিচালক ও কলাকুশলীরা কলকাতায় ফিরে যান।

সিনে সলিউশনের এক কর্মকর্তা বাবলু ব্যানার্জি জানিয়েছেন, তাঁরা নেপাল, সিকিম সহ ডুয়ার্সের বিভিন্ন জায়গায় এর আগেও শুটিং করেছেন। এই ধরনের অভিজ্ঞতা তাঁদের হয়নি। তাঁদের দাবি, আউটডোর শুটিং-এর জন্য মালাবাজার থানায় জানানোই ছিল। কিন্তু প্রাইভেট রিসোর্টের ভেতর শুট করার সময় আইন-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার ব্যাপার থাকে না। সে কারণেই স্থানীয় থানায় জানানো হয়নি।

সিনে সলিউশনের অপর এক কর্মকর্তা সৈকত কুণ্ডু জানান, যে ঘটনা ঘটল তা ডুয়ার্সের ‘ফিল্ম টুরিজম’-এর ক্ষেত্রে খারাপ প্রভাব ফেলবে। এর পর এখানে শুটিং করতে আসার আগে ভাবতে হবে, মন্তব্য তাঁর।

বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর সরব হয়েছেন পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংগঠন। গরুমারা টুরিজম ওয়েলফেয়ার সোসাইটির সম্পাদক সোনা সরকার জানিয়েছেন, এই ধরনের ঘটনায় পর্যটন শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এই ধরনের শুটিং-এর ক্ষেত্রে একটা বড়ো আর্থিক লেনদেনের ব্যাপার জড়িয়ে থাকে যাতে উপকৃত হয় স্থানীয় মানুষও। তা ছাড়া ডুয়ার্সের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে রাজ্য সরকার যখন বিভিন্ন পরিকল্পনা নিচ্ছে তখন এই ঘটনা যে সুখকর নয় তা বলা যেতেই পারে। বিষয়টি কানে গিয়েছে রাজ্যের পর্যটন মন্ত্রী গৌতম দেবেরও। তিনি জলপাইগুড়ির পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দিয়েছেন বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য।

যদিও পুলিশ সুপার অমিতাভ মাইতির দাবি, বিষয়টি শুধুমাত্র ভুল বোঝাবুঝির ব্যাপার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কারণে জঙ্গল সংলগ্ন রিসোর্টগুলিতে কারা এসে থাকছে, কী করছে তা স্থানীয় থানাগুলি খোঁজখবর রাখে। ওই সিরিয়ালের টিম যে ওখানে শুটিং করবে তা পুলিশকে না জানানোতেই এই সমস্যা। তবে এই ধরনের ঘটনা আর ঘটবে না আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

এই ধরনের নেতিবাচক ঘটনা না ঘটাই ভালো বলছেন ডুয়ার্সের ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে পর্যটন শিল্পে যুক্ত সকলেই।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here