sayla festival
indrani sen
ইন্দ্রাণী সেন

আকুই, বর্ধমান জেলার সীমানাবর্তী বাঁকুড়া জেলার একটি গ্রাম। ঝিকনাড়া, আকুই-সংলগ্ন একটি ছোটো গ্রাম। দুয়ে মিলে আকুই-ঝিকনাড়া। বন্ধুত্বের পরব সয়লায় মেতে উঠেছে এই অঞ্চল। এই পরবে কোনো ধর্ম নেই, কোনো জাতপাত নেই। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক আশ্চর্য পরব সয়লা।

সহেলা, আঞ্চলিক ভাষায় সয়লা, আদতে মা মনসার পূজা। মূলত কার্তিক মাসেই এই সয়লা অনুষ্ঠিত হয়। রাঢ় বাংলার খেতমাঠ এখন সোনালি ফসলে ভরা। শীতঘুমে যাওয়ার আগে এই সময় সাপের ক্রিয়াকলাপ বেশ বাড়ে। আর তাই সর্পের দেবী মা মনসাকে তুষ্ট করতে এই উৎসবের প্রচলন। কিন্তু উৎসবের মূল সুর বাঁধা সখ্যতা পাতানোয়। সহেলা বা সয়লা শব্দটির মধ্যেই রয়েছে সখা, সই, স্যাঙাত, বকুলফুল বা বন্ধু। মানবিক বন্ধন বা একতা বা বন্ধুত্বই হল সয়লা পরবের প্রধান কথা।

বর্তমান যুগে যেখানেসেখানে আমরা আধুনিকতার জোয়ারে গা ভাসাতে অভ্যস্ত। কিন্তু এই বাংলার এই দুই জেলা এই সয়লা পরবের মাধ্যমে অনেক যুগ আগে থেকেই ভ্রাতৃত্ব  বা বন্ধুত্বের বন্ধনে বাঁধা। এখন আমরা ঘটা করে ফ্রেন্ডশিপ ডে পালন করি। সোশ্যাল মিডিয়ার সৌজন্যে সই, স্যাঙাত, বন্ধুরা আজ ফ্রেন্ড। কিছুটা সময় পিছিয়ে গিয়ে যদি আমরা বাংলা সাহিত্যের পাতার দিকে তাকাই তা হলে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বা বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের লেখায় এই সই-স্যাঙাতদের অবাধ বিচরণ লক্ষ করি। এমনকি স্বয়ং রবিঠাকুরের গানেও ‘সই’ শব্দটির উল্লেখ পাই বারবার ।

আকুই-ঝিকনাড়া সয়লা কমিটির উদ্যোগে তিন দিনব্যাপী সয়লা পরব উদযাপিত হচ্ছে। শনিবার থেকে শুরু হয়েছে এই উৎসব। প্রায় ১০০ বছরের পুরোনো এই সয়লা পরব। বর্তমানে পুজো কমিটির প্রধান উদ্যোক্তা চিন্তাহরণ গুপ্ত, অরূপকান্তি গুপ্ত, বিশ্বনাথ গুপ্ত,  নীহাররঞ্জন গুপ্ত ও নিখিল সাউ জানান, শুধুমাত্র আকুই নয় আশেপাশের খড়শি, পুঁজুর,  আম্বা,  গুইর,  গোপালবেড়া থেকে হাজারো মানুষের সমাগম ঘটছে এই উৎসবে।

scene of communal harmony in saylaঅরূপবাবু জানান, এই উৎসব সর্বজনীন। এখানে ধর্ম, জাত, সম্প্রদায়ে কোনো ভেদাভেদ নেই। হিন্দু ও মুসলিম, দুই সম্প্রদায়ই সমান ভাবে অংশগ্রহণ করছেন এই উৎসবে। তাঁর দাবি, বর্ধমান-বাঁকুড়ার এই অঞ্চলে সাম্রদায়িক সম্প্রীতির অন্যতম নিদর্শন এই উৎসব।

goya of sayla
সয়লার গোয়া।

ঝিকনাড়ায় সয়লার প্রস্তুতি শুরু হয় এক মাস আগে থেকেই। প্রতি চার বছর অন্তর এই সয়লা অনুষ্ঠিত হয়, স্থানীয় চণ্ডীমায়ের সঙ্গে বিশেষ পুজোর মাধ্যমে ‘গোয়া’ চালিয়ে। ‘গোয়া’ হল সয়লার ঝাঁপি। এই ঝাঁপি বা ঝুড়ির মধ্যেই থাকে সয়লার বিশেষ উপাচার যেমন দই, গোটা  হলুদ, পঞ্চশস্য, সিঁদুর, খই-এর চড়া, সুপারি, পান বাতাসা ইত্যাদি। সয়লাতলায় নতুন সই-স্যাঙাত পাতাতে হয়। আর যাঁরা পুরোনো সই-স্যাঙাত তাঁদের বাড়িতে গিয়ে ‘গোয়া’ দিতে হয়।

সয়লাতলায় শোলার মালা পরে, দইযের ফোঁটা দিয়ে, মিষ্টি মুখ করে শনিবার সয়লা পালন করলেন পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে সবাই। সয়লা পরবকে কেন্দ্র করে তিন দিন ধরে চলবে মেলা। তিন দিনই থাকছে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, জানালেন উদ্যোক্তারা।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here