shantipur raas rally
srila pramanik
শ্রীলা প্রামাণিক

এক টাকার কয়েন নিয়ে সমস্যা থেকে বাহুবলী, কন্যাশ্রী থেকে বাংলার লোকসংস্কৃতির ময়ুরপঙ্খি গান। আর একাধারে রাইরাজা থেকে বিগ্রহবাড়িগুলির ঐতিহ্যবাহী বিগ্রহ নিয়ে শোভাযাত্রা। আধুনিকতা আর ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে সোমবার আনন্দোৎসবের জনপ্লাবনে অদ্বৈতভুমি ভাসল রাতভর।

অদ্বৈতাচার্যের হাতে শুরু হওয়া শান্তিপুরের রাসের ইতিহাস প্রায় চারশো বছরের পুরোনো। তবে রাসের শোভাযাত্রার সঙ্গে অবশ্য জড়িয়ে আছে বড়ো গোস্বামীবাড়ির নাম। অদ্বৈতাচার্যের পৌত্র মথুরেশ গোস্বামীর পুত্র রাঘবেন্দ্রর বংশধর বড় গোস্বামী বাড়ি। তাদের কুলদেবতা রাধারমণ জিউ। এক সময় এই বিগ্রহ পুরীতে পূজিত হত দোলগোবিন্দ নামে। বাংলার বারো ভুঁইয়াদের অন্যতম বসন্ত রায় সেই বিগ্রহ নিয়ে আসেন যশোহরে। পরে মানসিংহের বাংলা আক্রমণের সময়ে পাঠানসেনার ভয়ে তিনি মূর্তিটি দেন মথুরেশ গোস্বামীকে। তিনি তা শান্তিপুরের বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেন। সেখান থেকেই একদিন উধাও হয়ে যায় কৃষ্ণমূর্তি। পরে স্বপ্নাদেশ পেয়ে তা উদ্ধার হয় দিগনগরের কাছে একটি দিঘি থেকে। সেই সময়ে সকলের ধারণা হয়, কৃষ্ণ একা আছেন বলে চলে যাচ্ছেন। পরে অষ্টধাতুর রাধিকামূর্তি গড়ে রাসপূর্ণিমার দিন যুগলমিলন ঘটানো হয়। আর তা সাধারণ মানুষকে প্রত্যক্ষ করানোর জন্য তৎকালীন বড়ো গোস্বামীবাড়ির শিষ্য খাঁ চৌধুরীবাড়ির তরফে শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। সে-ও প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে। যা আজ মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্র।

শান্তিপুরের ৩৭টি বিগ্রহবাড়ির মধ্যে ১৭টি বিগ্রহবাড়ি রাসের শোভাযাত্রায় যোগ দেয়। সঙ্গে যোগ দেয় প্রায় ষাটটির মতো বারোয়ারি। তবে আজও প্রথমে বড় গোস্বামীবাড়ির শোভাযাত্রা বের হয়। তার পর অন্যদের।

প্রতিটি বিগ্রহবাড়ি তাদের বিগ্রহ সুদৃশ্য হাওদায় তুলে সাজিয়ে শোভাযাত্রায় যোগ দেয়। তবে বিগ্রহের আগে থাকে তাদের রাইরাজা। কথিত আছে, বৃন্দাবনে এক দিন রাধা অর্থাৎ রাই কৃষ্ণ সেজেছিলেন। তার থেকেই এই রাইরাজার ধারণা। বিগ্রহবাড়িগুলির শোভাযাত্রায় বিগ্রহের আগে থাকে রাইরাজা। কিশোরীদের রাইরাজা সাজানো হয়। এক সময় রাইরাজা সাজার জন্য বহু পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যেতে হত। তাকে সুন্দর শারীরিক গঠন, পানের মতো মুখশ্রী, পটলচেরা চোখ, টিকোলো নাক এবং স্থির মানসিকতার হতে হয়। কারণ কয়েক ঘণ্টা তাকে অপলক দৃষ্টিতে বসে থাকতে হবে।

rairaja
রাইরাজা।

আগে অনূর্ধ্ব-বারো কিশোরীদের রাইরাজা সাজানো হত। তাদের সদ্‌ব্রাহ্মণ এবং নিখুঁত কুমারী হতে হবে। রাইরাজাকে শোভাযাত্রায় সকলে দেবতাজ্ঞানে শ্রদ্ধা করেন। তাই তাকে নিষ্কলঙ্ক হতে হবে। আগে তাদের তিন পুরুষের ইতিহাস জেনে রাইরাজা সাজার সুযোগ দেওয়া হত। এখন অবশ্য সুন্দরী ব্রাহ্মণ কিশোরীই রাইরাজা সাজার অধিকারী। তবে  অব্রাহ্মণ বাড়ির রাইরাজা যে কোনো সুন্দরী কিশোরীই হতে পারে।

এ তো গেল ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্যের পাশাপাশি এখন যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন বারোয়ারির নানা আধুনিকতা সমৃদ্ধ শোভাযাত্রা। বেজপাড়া বারোয়ারির শোভাযাত্রায় যেমন উঠে এসেছে বাহুবলী। সুদৃশ্য আলোকসজ্জা এবং মডেলের মাধ্যমে বাহুবলীর নানা দৃশ্য তুলে ধরেছেন তাঁরা। ভারতমাতা বারোয়ারির শোভাযাত্রায় আবার ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মানুষের জীবন কী ভাবে মোবাইলে বন্দি হয়ে রয়েছে। কী ভাবে যন্ত্রের কাছে মানবিক সম্পর্ক হারিয়ে যাচ্ছে তা তুলে ধরা হয়েছে। দত্তপাড়া পাঁচমাথা মোড় বারোয়ারির শোভাযাত্রায় উঠে এসেছে কয়েন সমস্যা। একই সঙ্গে তাঁরা কন্যাসন্তানের এগিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়েছেন।

a part of raas rally
রাস শোভাযাত্রায়।

নানা সামাজিক বার্তার পাশাপাশি ময়ূরপঙ্খি গান, লোকগীতির মতো বাংলার লোকসংস্কৃতির নানা দিক তুলে ধরা হল এই শোভাযাত্রায়। প্রদর্শিত হল জাগলিং, রনপা-নাচ সহ নানা শারীরিক কসরত। সঙ্গে সুদৃশ্য আলোকসজ্জা। রাতভর চলেছে এই শোভাযাত্রা। এর টানে রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছেন মানুষ, এই মহোৎসবের সাক্ষী হতে। তাঁরা কেউ রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে বসে উপভোগ করলেন রাসযাত্রার শোভাযাত্রা। সুশৃঙ্খল শোভাযাত্রার শেষে আবার আগামী বছরের প্রতীক্ষা শুরু।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here