girijadevi
papiya mitra
পাপিয়া মিত্র

শহর কলকাতা থেকে ‘ঠুংরির রানি’ গিরিজাদেবী চলে গেলেন। ভারতীয় রাগ সংগীতসমাজের উজ্জ্বল নক্ষত্র গিরিজাদেবী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মঙ্গলবার রাতে প্রয়াত হন। বৃহস্পতিবার বারাণসীতে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। ১৯৭৭-এ স্বামীর মৃত্যুর পরে কলকাতায় চলে আসেন ও এই শহর হয়ে ওঠে তাঁর শেষ আশ্রয়। পণ্ডিত বিজয় কিচলুর একান্ত অনুরোধ তিনি ফেলতে পারেননি। সংগীত নিয়েই তাঁর সংসার গড়ে ওঠে এই শহরে।

বারাণসীতে জন্ম এই শিল্পীর। সংগীত পরিবেশনের জন্য ঘুরেছেন দিল্লি-লখনউ-মুম্বই-অমদাবাদ-পুণে-বারানসী-জয়পুর – কোথাও নয়। সেই শিল্পী জীবনের শেষ চারটে দশক কাটিয়ে গেলেন এই শহরে, যা আমাদের পরম পাওয়া। তাঁর কাছে সংগীতশিক্ষা যাঁরা নিতে পেরেছেন তাঁরা ভাগ্যবান।

২০০৮-এর শেষ শ্রাবণে সৌভাগ্য হয়েছিল সাক্ষাৎকারের জন্য তাঁর মুখোমুখি হওয়ার। এই শহর কেমন লাগে? কলকাতাকে কত কাছের মনে হয় ইত্যাদি জানার জন্য? সে দিন বুঝেছিলাম কত প্রাণখোলা মানুষ তিনি এবং সোজা কথা সোজা করে বলতে উনি ভয় পান না।

সে দিন প্রশ্ন করার আগে তিনি প্রশ্ন ছুড়েছিলেন, “কী এনেছ আমার জন্য? ফুল এনেছ? কিছুই তো নেই? আমি কেন কথা বলে সময় নষ্ট করব?” ইতস্তত ভাব সরিয়ে খাট থেকে কাঁথাস্টিচের শাড়িখানা দেখিয়ে বললেন, “কত দাম জানো? দশ হাজার। এটা পরে গাইতে যাব। তোমায় দেখালাম একটাই কারণে। আমি কলকাতাকে কত ভালোবাসি সেটা বোঝানোর জন্য। এখানকার সুন্দর সুন্দর শাড়ি আমার মন ভরিয়ে দেয়।”

আরও পড়ুন: গিরিজা দেবীর মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ সংগীত সমাজ, বৃহস্পতিবার বারাণসীতে শেষকৃত্য

মন ভরিয়ে দিলেন কথা বলে। আর ভয় নেই। এক আলমারি পুতুল দেখিয়ে বললেন, পুতুল ভালোবাসি খুব। সঙ্গের আলোকচিত্রীকে দেখিয়ে দিলেন পিছনে পুতুলের আলমারি নিয়ে ছবি তুলতে। টালিগঞ্জের সংগীত রিসার্চ অ্যাকাডেমির চার ধারে সবুজের সমাহার। সদ্য স্নান সেরেছে গাছগাছালি। জানলা দিয়ে ভিজে বাতাসে মনের ভয়-দ্বিধা কেটে যেতে লাগল। দেখো, আমি ভীষণ ভালোবাসি বাঙালির রোজকার রান্না। ধোঁকা, মোচা, শুক্তো, চচ্চড়ি, ঝিঙেপোস্ত, লুচি। বাংলার নানা শাড়ির সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। সে ধনেখালি বলো আর ফুলিয়াই বলো। শান্তিপুরি, বাটিক, টাঙ্গাইলও আমার প্রিয়।

মনে পড়ে যাচ্ছে কত কথা। সেই প্রবাদপ্রতিম মানুষটি যে এত দ্রুত কাছে টেনে নেবেন তা ভাবতেই পারিনি।

দেখো, আমি ভীষণ ভালোবাসি বাঙালির রোজকার রান্না। ধোঁকা, মোচা, শুক্তো, চচ্চড়ি, ঝিঙেপোস্ত, লুচি। বাংলার নানা শাড়ির সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। সে ধনেখালি বলো আর ফুলিয়াই বলো। শান্তিপুরি, বাটিক, টাঙ্গাইলও আমার প্রিয়।

বাবা রামদাস রায় ও মা সূর্যমুখীদেবীর ন’সন্তানের ষষ্ঠ সন্তান গিরিজা। স্বামী বারাণসীর ব্যবসায়ী মধুসূদন দাস। কন্যা সুধার বিয়ে হয়েছে এক বাঙালি পরিবারে। দই-নতুন গুড়ের সন্দেশ-রসগোল্লা প্রিয় মিষ্টি। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, বাউল, রাগপ্রধান, কীর্তনকে ভালোবেসেছেন। এখান থেকে আর বলার অপেক্ষা রাখে না কলকাতা তাঁর প্রিয় কিনা বা বাঙালিদের তিনি কত কাছের ভাবেন। শহর কলকাতায় প্রিয় পছন্দের জায়গা ছিল দক্ষিণেশ্বর, গঙ্গার ঘাট, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল আর নিকো পার্ক।

১৯৫৫-তে সদারঙ্গ সংগীত সম্মেলনে গাইতে এই শহরে প্রথম আসা। সে দিনের সেই স্মৃতি তিনি মনে জাগিয়ে রেখেছিলেন। অবাক হয়েছিলেন রাস্তায় বসা শ্রোতাদের দেখে। এই শহরে সিদ্ধেশ্বরীদেবী, বড়ি মতিবাঈ, রসুলুনবাঈ, বেগম আখতারের সঙ্গে এক মঞ্চে গান গাইতে না পারার একটা আপশোশ থেকে গিয়েছিল। তবে কলকাতার বাইরে সেই তৃষ্ণা মিটিয়ে নিয়েছিলেন।

১৯৭৮ থেকে আইটিসি সংগীত রিসার্চ অ্যাকাডেমিতে ‘বেনারস ঘরানা’র গুরুর পদ আলোকিত করেছিলেন। দু’বছরের জন্য বারাণসী চলে গেলেও পরে ফিরে আসেন কলকাতায়। ছেড়ে থাকতে পারেননি তিনি এই শহরকে।

পাঁচ বছর বয়স থেকে সরযূপ্রসাদ মিশ্রের কাছে তালিম। পরে শ্রীচন্দ্র মিশ্রের কাছে শিক্ষাগ্রহণ করেন। প্রথম সংগীত পরিবেশন ইলাহাবাদে। ১৯৪৯ থেকে রেডিওতে গান গাওয়া শুরু। সংগীতসম্মেলনে যোগ দিতে প্রথমে যান বিহারের আরায় (১৯৪১)। তার পর ১৯৪২-এ নিজের শহর বারাণসীতে সংগীত পরিবেশন। সে বছরেই দিল্লিতে।

এর পরের ব্যস্ততা ইতিহাস। ছোটোবেলায় বড়োদিনের ছুটিতে কলকাতায় বেড়াতে আসতেন বাবার সঙ্গে। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ে মামা কুস্তিগির ঠাকুর রাজকিশোর সিংহ থাকতেন। ভাইবোনেরা মিলে উঠতেন সেই মামাবাড়িতে। এক বার ঘুরতে এসে টালিগঞ্জের মদন স্টুডিওয় গান গেয়েছিলেন।

নাকে কানে হিরের দ্যুতি, কপালে হলুদ টিপ শ্বেতশুভ্র কেশরাশি নিয়ে এই শহর আর দেখতে পাবে না পূরব অঙ্গের ঠূংরি ঘরানার কিংবদন্তিকে। ৮৮ বছর বয়সে থেমে গেল তাঁর কণ্ঠের দাদরা-টপ্পা-কাজরি-বসন্ত মুখারী।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here