হোলি আর লাঠ মারো হোলিতে জমে উঠেছে বৃন্দাবন-মথুরা-বারসানা

0
861

ashokkundu

অশোক কুমার কুণ্ডু:

লাঠ মারো লাঠ মারো হোলি/আজ পেয়ারি কা দিন আ গয়ি।

বছরভরই প্রেমের দিন একটু একটু করে জমে ওঠে হৃদয় আর স্নায়ুতন্ত্রীতে, তার পর উছলে ওঠে, বিস্ফারিত হয় দোলের দিন। বৃন্দাবন-মথুরা-বারসানা, ইউপি-রাজস্থানে দোল নয়, হোলি। তবে যে শব্দবন্ধেই রং-এর বন্দনা করা হোক না কেন, তা তো একই। বৃন্দাবন-মথুরা-বারসানার হোলি উৎসব কিন্তু বাংলার মতো এক দিনের বা এক বেলার নয়। তিথি-নক্ষত্রের বয়ান মোতাবেক এ বছর দোলপূর্ণিমা পড়েছে ২৮ ফাল্গুন, ১২ মার্চ। সে দিন বৃন্দাবন-মথুরায় হোলিকা দহন। হোলি তার পরের দিন, ১৩ মার্চ। কিন্তু পঞ্জিকা, তিথি, নক্ষত্র যা-ই বলুক বৃন্দাবন-মথুরা-বারসানা-নন্দগাঁওয়ে হোলি কার্যত এক পক্ষকালের উৎসব। আর এ বার তো বারসানা-নন্দগাঁওয়ের ‘লাঠ মারো হোলি’ উদযাপিত হয়ে গেল ৬ আর ৭ মার্চ। তবে এখন এই অঞ্চলের কোথাও হোলির মহড়া চলছে, কোথাও রয়েছে ‘লাঠ মারো হোলি’র রেশ।   

চমকে গিয়েছি বৃন্দাবন পৌঁছে। মোবাইলে কলার টিউন ‘রাধে রাধে’। এখানে মথুরা-বৃন্দাবনে আম আদমিরই ‘রাধে রাধে’ কলার টিউন। যস্মিন দেশে যদাচার/কোঁচা তুলে নদী পার। আমার মোবাইলে ভরে নিলাম ওই টিউন, বেটার কমিউনিকেশনের জন্য। ‘রাধে রাধে’ বলে হাত জোড় করে সম্বোধন এবং বিদায় 

lath-mathuজীবনের সেরা বিস্ময়। রঙ ভরা শরীর-মন নিয়ে বৃন্দাবনের বাজারে এক চোরকে পেটানো হচ্ছে। এক ঘা দেওয়ার আগে ক্রোধী জনতা বলে নিচ্ছে ‘রাধে রাধে’। চোরও মারের আগে-পরে বলছে “রাধে রাধে, ম্যায় নে চোরি নেহি কিয়া”। পুলিশ এল, “রাধে রাধে, আরে মুরখ্‌ আদমি, ছোড় দো উসকো। হোলি কা দিন চল রহা হ্যায়”। বেচারা চোর খদ্দেরের অন্যমনস্কতার সুযোগে রাবড়ির হাঁড়ি নিয়ে পালাচ্ছিল। আমি এতটাই বিস্ময়ে স্তব্ধ যে, আমার শালপাতার বাটির রাবড়িতে মাছি বসেছে, গোটা বিশেক মাছি, খেয়াল করিনি। দোকানদার আমার ধ্যান ভাঙালেন “রাধে রাধে, আরে বাঙ্গালিবাবু, রাবড়ি খা লো। অহি তো হর দিন কা মামলা”।

একদা তিনটি ধর্মীয় উৎসব বা মেলার খ্যাতি অখণ্ড বঙ্গ পেরিয়ে, বৈষ্ণবপাট ডিঙিয়ে সর্ব ভারতে ছড়িয়ে পড়েছিল। শান্তিপুরের রাস উৎসব এবং বৃন্দাবন-মথুরার হোলি। অবশ্যই শ্রীকৃষ্ণের নন্দগ্রাম আর রাধারানির গ্রাম বারসানার ভূমিকা পরে জুড়ে গেছে। হোলি খেলার আগে আবির কিন্তু কৃষ্ণকে নিবেদন করা হয়ে থাকে। এটা সর্ব ভারতীয় বৈষ্ণব-রীতি। রাধা কিন্তু অখণ্ড বঙ্গে নিজস্ব। রাধার ধর্মীয় ক্রমবিকাশ বাঙালির, যে হেতু রাধার সঙ্গে কৃষ্ণের সম্পর্কের জটিলতা অনুমোদন পায়নি ভারতের ভিন্ন ঘরানার বৈষ্ণবদের কাছে। কারণ কৃষ্ণের স্ত্রী তো রাধা নন, তা-ই। বিবাহিত স্ত্রী ছাড়াও যাকে সেকেন্ড রিলেশন বলা হয়, তা কিন্তু বাঙালিরাই স্থাপন করেছে, যদিও তত্ত্বের পরিভাষায় রাধা ও কৃষ্ণ একই। কৃষ্ণের হ্লাদিনী রূপ রাধা, ঐশ্বরিক প্রেম। এখানে আবার শরীরতত্ত্ব কোথায়? এ যে পবিত্র – রামধনুর বর্ণময়তার মতো, হোলির রঙ- রেণুর মতনই।

lath-lathiহপ্তাখানেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল লাঠ মারো হোলির মহড়া। মহড়া চলে নন্দগ্রাম এবং বারসানায়। সেই মহড়া শেষ পর্যন্ত মূলে পৌঁছোয় দিন পাঁচেক আগে।

লাঠি দিয়ে পুরুষ পেটানো চলল। ওখানে সংসারীদের বাড়ির ছাদ থেকে ভিস্যুয়াল ভারী সুন্দর। ফোটোগ্রাফাররা চড়ে বসল ছাদে। গৃহস্থের বউ-ঝিরা শরবত-মিঠাই দিয়ে আপ্যায়নও করল। তবে এখানে এক মুঠো নয়, বস্তা বস্তা আবির বেচাকেনা হল। রাস্তার ধারে বসে গেল পারিবারিক পিকনিক। গৃহস্থের মনের কপাট, ঘরের দরজার অর্গল মুছে গেল এ দিন। আমি তো গুঁড়ো আবির নয়, এখানে জ্যান্ত রঙ দেখেছি প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে। এত বর্ণময় পোশাক পরে এখানকার নারীরা যে, সব সময় মনে হয়, মিশে গেছে হোলির রঙের সঙ্গে পোশাকের রঙ। অবশ্য পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থানের নারীরা রঙিন পোশাক পরে নিত্য দিন। হোলির দিন তো আরও বেশি। কম যান না বয়স্ক মহিলারাও।

লাঠ মারো হোলির দিনে মুক্ত মনে যে কেউ অন্য কাউকে রঙ দেয়। বয়স্কদের পায়ে আবির দিয়ে তার পরে আবিরের প্লাবন। বারসানা গ্রাম রাধারানির বাপের বাড়ি। সব মেয়েই এ দিন হয়ে ওঠে রাধিকা। আর নন্দগ্রামের সব পুরুষ হয়ে ওঠে চতুর প্রেমিক কৃষ্ণ। হোলির পক্ষকাল আগে বারসানার সুন্দরীরা এসেছিল গোপরাজের নন্দগ্রামে। নন্দগ্রামের রাধাকৃষ্ণের মন্দিরে পুজো দিল। ওখানকার গাঁওবুড়ো ও মানীদের নিমন্ত্রণ করে অনুমতি নিল লাঠ মারো হোলির জন্য। অন্য ভাবে বললে, নন্দগাঁয়ের পুরুষদের পেটানোর জন্য অনুমতি চেয়ে নিল। পরের দিন নন্দগাঁয়ের পুরুষরা বারসানার সুন্দরীদের হাতের লাঠির মার খাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ করে এল। এ এক অদ্ভুত হোলি পরম্পরা।

জানা গেল, বারসানা এবং নন্দগ্রামের নারী-পুরুষের বিয়ে হয় না। বিয়ে হলে সামাজিক সূত্রে ভাসুর-দেওর, তার পর সন্তান হলে ভাই-বোন, কেমন করে গায়ে দেবে প্রেমের রঙ? কিন্তু সত্যি যদি কেউ প্রেমে পড়ে, কী হবে তার পরিণতি, তা জানা গেল না। তবে সুন্দরীর কিল-ও সুন্দর। লাঠির ঘা-ও সুন্দর। তবে লাঠির আঘাত মাথায় পড়ে পুরুষপ্রবরদের। লাগে না, কারণ মাথায় বিরাট চট-কাপড়ের প্যাডিং। জোরে জোরেই আঘাত পড়ে, কিন্তু কিছুই হয় না। তা হলে মারে কেন? মারবেই তো। পুরুষ, প্রেমিক কৃষ্ণ কম কষ্ট দিয়েছে শ্রীরাধিকাকে? কত কত দিবস-রজনী তার চোখের জল ফেলিয়েছে। চন্দ্রাবলীর ঘরে রাত কাটিয়ে পোড়ার মুখো কৃষ্ণ ভিন্ন গপ্পো ফেঁদেছে ভোররাতে শুকতারাকে সাক্ষী রেখে। কাব্যিক মিথ্যা। ধরাও পড়েছে নাগর – ওষ্ঠে তাম্বুলের চিহ্ন।

bar-chadদোলের দিন, হোলির দিন কাটবে মথুরা-বৃন্দাবনে। এ দু’টো স্থলে, বিশেষ করে বৃন্দাবনের হোলি একটু সাবেকি চিত্র। বৃন্দাবনের হোলি জমে দোলের দিনে। এখানে যে বাঙালি পরম্পরা। সব মন্দিরে ভোরের আরতির পরে রাধা-কৃষ্ণকে আবির নিবেদন, পরে নিজেদের মধ্যে হবে আবির খেলা।

ভুলব না এখানকার ‘হোলিকা দহন’ দেখতে। মনে পড়ে বাংলা প্রবচন, ‘আজ আমাদের মেড়া পোড়া/কাল আমাদের দোল’। বাংলার গ্রামে এখনও ওই অগ্নি উৎসব বেঁচে আছে। বাঁশে মোটা করে খড়ের ব্যান্ডেজ। চারিদিকের ভূমিতে শুকনো পাতা, আবর্জনা জড়ো করে আগুনে পড়ানো। আগুন জ্বালো। ধ্বস্ত প্রাণের আবর্জনা তবুও কি সবটা পোড়ে?

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here