রোহতক (হরিয়ানা) :ডেরার হাতে নিহত নিজের ছেলের নশ্বর দেহ ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য হরিয়ানা পুলিশের ডিজি-র কাছে অনুরোধ জানালেন মোগার এক প্রবীণ নাগরিক। ডেরা সচা সৌদার সহ-সভাপতি ড. পি আর নাইনের লোমহর্ষক স্বীকারোক্তির পরের দিনই এই অনুরোধ এল রাজ্যের পুলিশপ্রধান বি এস সন্ধুর কাছে। মঙ্গলবারই ডেরার কাজকর্ম নিয়ে তদন্তের জন্য গঠিত বিশেষ দলের (সিট) কাছে ড. নাইন কবুল করেন সিরসায় ডেরার সদর কার্যালয়ের চত্বরে ৬০০ কঙ্কাল পোঁতা রয়েছে।

ড. নাইন জানিয়েছিলেন, এক জার্মান বৈজ্ঞানিকের পরামর্শে ওই সব কবরের ওপর চাষাবাদ শুরু করা হয়েছিল। ডেরার ম্যানেজিং কমিটির চেয়ারপার্সন বিপসনা ইনসানও এই ঘটনার পক্ষে তথ্যপ্রমাণও দাখিল করেন।

২২ বছরের ছেলে জগসীর সিং-এর ফোটোগ্রাফ হাতে ধরে পঞ্জাবের মোগার অধিবাসী সরজিৎ সিং বুধবার বলেন, ১২ বছর ধরে তিনি পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁর ছেলের মৃত্যুর বিচার চেয়ে আসছেন। কিন্তু তিনি বিচার পাননি। পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ রাম রহিম ও তাঁর তাঁবেদারদের অঙ্গুলিহেলনে কাজ করেছে।

সরজিৎ-এর চোখে জল। জানালেন, জগসীর একমাত্র ছেলে। বললেন, “যে-ই রাম রহিমের বিরুদ্ধে কথা বলেছে, তাকেই চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে খুন করে ডেরার চত্বরে তার দেহ পুঁতে ফেলা হয়েছে। আর সমস্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ লোপাট করার জন্য কবরের ওপর পুঁতে দেওয়া হয়েছে চারাগাছ।”

মোগার খোসা রণধীর গ্রামের সরজিৎ জানান, তাঁর ছেলে ২০০২ সালে ডেরায় যোগ দেয়। সেখানে সে তিন বছর ছিল। ২০০৫-এ ফিরে এসে গুরমিত রাম রহিমের নানা কুকীর্তির কথা বলে। এই সব কুকীর্তির অন্যতম হল মাদকের ব্যবসা। জগসীরের সঙ্গে রাম রহিমের এক অন্তরঙ্গ অনুগামী সাধু সিং ভাঙ্গিদাসের উত্তপ্ত কথা কাটাকাটি হয়েছিল বলে সরজিৎ জানান। এই সাধু সিং ভাঙ্গিদাস হলেন রাম রহিমের মাদক ব্যবসা ও অন্যান্য অপকর্মের একান্ত অনুচর। এই ভাঙ্গিদাস এখন থাকেন কানাডার ব্র্যাম্পটনে।

সরজিৎ বলেন, “নানা ধরনের অপকীর্তি চালানোর জন্য ডেরার সদর দফতরকে কাজে লাগানো হত। বাবা মাদক বিক্রি করতেন। আমার ছেলে যখন এ ব্যাপারে অভিযোগ করে তখন আমাদের ভয় দেখানো হয়। পরে রাম রহিম কিছু লোক পাঠান। তারা আমার ছেলেকে বলে, ডেরাপ্রধানের কাছে তাকে ক্ষমা চাইতে হবে।”

জগসীরের বাবা জানান, ধর্ষক বাবার কাছে ক্ষমা চাওয়ার অছিলায় জগসীরকে ২০০৫-এর ৬ ফেব্রুয়ারি ডেরায় নিয়ে যাওয়া হয়। পনেরো দিন ধরে তার কোনো খবর মেলে না। পরে রেল পুলিশের (জিআরপি) তরফে তাঁদের জানানো হয়, রেললাইনে তাঁদের ছেলের দেহাংশ পাওয়া গিয়েছে। দেহের শরীরে যে পোশাক ছিল, পায়ে যে জুতো ছিল তা জগসীরের। কিন্তু জগসীরের দেহ তাঁদের দেওয়া হয়নি।

পরে পরিবারের সদস্যদের কাছে একটি ছবি পাঠানো হয়েছিল। তাতে দেখা যায় জগসীরের মাথাটি রেললাইনে পড়ে আছে। তাঁরা ডেরার কাছে জগসীরের মৃতদেহ চেয়ে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু রাম রহিমের পোষা গুন্ডারা তাঁদের হুমকি দিয়ে চুপ করিয়ে দেয়। পরিবারের সদস্যরা প্রধানমন্ত্রী নরেব্দ্র মোদীর কাছেও চিঠি লিখেছিলেন। কিন্তু তাঁদের আবেদনে কর্ণপাত করেনি পিএমও।

সরজিৎ-এর অভিযোগ ডেরার এক ন্যাক্কারজনক কুকীর্তির পর্দা খুলে দিল। ডেরায় ৬০০-এর মতো লোককে পুঁতে দেওয়া হয়েছে। কাদের পুঁতে দেওয়া হয়েছে, তার রেকর্ডও ডেরায় আছে।

সিট-এর কাছে ড. পি আর নাইন জানান, ডেরার অনুগামীরাই তাঁদের কবর দিয়ে দিতে বলতেন। কারণ তাঁরা বিশ্বাস করতেন, এ ভাবে তাঁরা স্বর্গে পৌঁছে যাবেন। জেরায় তিনি আরও জানান, এ ব্যাপারে এক জার্মান বিজ্ঞানীর পরামর্শ নেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, মানুষের হাড়ে ফসফরাস আছে এবং এই ফসফরাস জমিকে উর্বর করে। এই পরামর্শ পেয়েই ডেরার জমিতে মানুষদের কবর দেওয়া শুরু হয়।

তবে ডেরার এক প্রাক্তন অনুগামীর সূত্রে জানা গিয়েছে, যাঁরা ডেরাপ্রধানের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, তাঁদেরই ‘শাস্তি’ দেওয়া হয়েছে এবং সেই শাস্তি হত্যা। হয় তাঁদের ডেরার জমিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে আর না হয় নদীতে ছুড়ে ফেলা হয়েছে।

ডেরা থেকে ছ’ জন মানুষের উধাও হয়ে যাওয়ার খবর আছে। এ ছাড়া অনেক রহস্যজনক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে যেগুলি ডেরার আধিকারিকরা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। আর লখনউয়ের এক মেডিক্যাল কলেজে ১৪টি মৃতদেহ পাঠানোর ঘটনাটি তো আজও রহস্যে মোড়াই থাকল।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন