demonstration of IT professionals
nilanjan dutta
নীলাঞ্জন দত্ত

বেশির ভাগ কাগজই খবরটা ছাপেনি। একটা মাত্র ‘জাতীয়’ টেলিভিশন চ্যানেল ভালো করে দেখিয়েছে। কিন্তু বুধবার, ৭ ফেব্রুয়ারি হায়দরাবাদ হাইকোর্ট ৫২ জন তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীর যে আবেদন শুনানির জন্য গ্রহণ করেছে, তার বিষয়বস্তু চমকে দেওয়ার মতো। এঁরা সবাই বিশাল মার্কিন বহুজাতিক তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানি ভেরিজন ডেটা সার্ভিসেস-এর ভারতীয় শাখায় কাজ করছিলেন। হঠাৎ গত ডিসেম্বর মাসের ১২ আর ১৩ তারিখ তাঁদের ছাঁটাই করে দেওয়া হয়। ঠিক ছাঁটাই নয়, তাঁদের দিয়ে জোর করে পদত্যাগপত্র লিখিয়ে নেওয়া হয়।

ব্যাপারটা কেবল হায়দরাবাদের ৫২ জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, ইত্যাদি জায়গা মিলিয়ে শুধু ভেরিজনের ক্ষেত্রেই কর্মচ্যুতদের সংখ্যাটা ৯০০ ছাড়িয়ে গেছে। এ ছাড়া সারা দেশে গত কয়েক মাসে ২০০০-এর ওপর আইটি কর্মী সংশ্লিষ্ট লেবার কমিশনার বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) ডেভেলপমেন্ট কমিশনারদের কাছে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি কোম্পানির বিরুদ্ধে জবরদস্তি ছাঁটাই আর লে-অফের অভিযোগ জানিয়েছেন।

এত জন উচ্চশিক্ষিত, বুদ্ধিদীপ্ত তরুণ-তরুণীকে বলা হল আর তাঁরা নিজেদের ক্যারিয়ারের মৃত্যু-পরোয়ানায় সই করে দিলেন? কর্মীরা বলছেন, না করে উপায় ছিল না। কারণ, তাঁদের প্রত্যেকের ঘাড়ের ওপর তখন নিঃশ্বাস ফেলছে এক-দুজন করে ষণ্ডামার্কা লোক। হ্যাঁ, তাঁদের সাধের ঝাঁ-চকচকে সারি-সারি কম্পিউটারশোভিত অফিসের মধ্যেই। এরা নাকি পেশাদার ‘বাউন্সার’ – শুঁড়িখানায় বেয়াড়া মাতালদের বার করে দেওয়ার জন্য যাদের পোষা হয়। এমনটাই জানাচ্ছে মূলত দক্ষিণ ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের সংগঠন ‘ফোরাম অভ আইটি প্রফেশনালস’।

বলবেন, এ কি কয়লাখনি না চটকল, যে মালিকরা শ্রমিক ঠেঙাতে গুণ্ডা ভাড়া করে আনবে? তথ্যপ্রযুক্তির মতো ভদ্রলোকের শিল্পে এ সব কখনও হতে পারে? কিন্তু বিশ্বাস করুন বা না-ই করুন, শিল্প যত আধুনিকই হোক না কেন, শ্রমিকদের ওপর জোর খাটানোর জন্য মালিকদের পদ্ধতিগুলো একই রয়ে গেছে। বরং বলা চলে, আগের থেকে আরও নিষ্ঠুর হয়েছে। এই শ্রমিকরা তো পোস্টারও মারেনি, পিকেটিং-ও করেনি। তা হলে তাদের ওপর এমন জুলুম কেন?

IT employees demonstrateতাদের একমাত্র অপরাধ, মালিকরা নতুন প্রযুক্তি আনছে, যার সঙ্গে এরা ‘আশানুরূপ’ দ্রুততায় খাপ খাওয়াতে পারছে না। এদের মধ্যে কারও হয়ত কাজ করতে একটু বেশি সময় লাগে, কারও বয়স একটু ‘বেশি’ হয়ে গেছে (৩০-এর ওপর হলেই যথেষ্ট), কেউ আবার অন্তঃসত্ত্বা। কিন্তু বিষয়টা ব্যক্তিগত ক্ষমতা-অক্ষমতার নয়। এরা সবাই কিছু দিন আগেই কাঁড়ি-কাঁড়ি টাকা খরচ করে একেবারে ‘স্টেট অভ দি আর্ট’ বা সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে নিজেদের শিক্ষিত করে তুলেছিল, সব চেয়ে আধুনিক শিল্পে যোগ দেবে বলে। সেই প্রযুক্তি যে এত তাড়াতাডি ‘পুরোনো’ হয়ে যাবে আর তার সঙ্গে তারা নিজেরাও ‘অচল’ হয়ে পড়বে, তা তারা বুঝবে কী করে?

কিন্তু তা বললে কী আর চলে? এখন ‘আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স’ বা যন্ত্রবুদ্ধি এসে গেছে, যাকে ‘চতুর্থ শিল্পবিপ্লব’ বলা হচ্ছে। মজুরি দিয়ে মানুষ পোষার থেকে একবার বিপুল বিনিয়োগ করে বুদ্ধিমান যন্ত্র বসালে আখেরে মালিকদের মুনাফা বাড়বে। যন্ত্র যতই বুদ্ধিমান হবে, মানুষ মজুর ততই কম লাগবে। তাই তাদের ঝেঁটিয়ে বিদেয় করতেই হবে। আগেই বলেছি, এই বিদেয় করার পদ্ধতিটা কিন্তু সেই সাবেক কালেরই রয়ে গেছে।

অবশ্য কোনো কোনো কোম্পানি এ ক্ষেত্রেও কিছু ‘আধুনিক’ কৌশল নিচ্ছে বই-কি। যেমন, তারা ‘বাউন্সার’দের সঙ্গে সঙ্গে কিছু ‘কাউন্সেলার’ও ভাড়া করে আনছে। এরা রীতিমতো পাশ করা ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল সাইকোলজিস্ট’ বা শিল্প-মনস্তত্ত্ববিদ। এরা আপনার মনটাকে বিভিন্ন ভাবে বাঁকিয়ে-চুরিয়ে আপনাকেই বুঝিয়ে দেবে, যে আপনার এখানে আর থাকা উচিত নয়। এখানেও অবশ্য শেষ অস্ত্র সেই অপমান আর চাপ। অন্তঃসত্ত্বা কর্মীরা বা কয়েক বছর দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে যথেষ্ট সিনিয়ার পদে পৌঁছেছেন এমন কেউ কেউ নাম গোপন রেখে জানিয়েছেন, চাকরি বাঁচানোর জন্য তাঁরা যখন অনুনয় বিনয় করেছেন, তখনই তাঁদের ওই সব ‘ডাক্তার’ বা ‘কাউন্সেলার’-এর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। ব্যাপারটা এমনিতেই যথেষ্ট অপমানজনক, তার ওপরে ওই ‘মনোবিদ’রা যখন বলেন, “এত দুর্বল মন নিয়ে আপনি এত চ্যালেঞ্জিং কাজ করবেন কী করে?” তখন ভেঙে পড়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকেনি।

আর একটা কৌশল হল কিছু চমকদার ‘ম্যানেজমেন্ট’ তত্ত্ব প্রয়োগ করা। নামে চমক থাকলেও আসলে এগুলো ঝাড়-ফুঁক ছাড়া আর কিছু নয়। এমনই তিনটে পদ্ধতির খবর দিয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের আর একটি সংগঠন, ফোরাম ফর আইটি এমপ্লয়িজ।

এক, ‘পারফরম্যান্স ইমপ্রুভমেন্ট প্ল্যান’ (পিআইপি)। কগনিজ্যান্ট-সহ কিছু কোম্পানি এই পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছে। দু’মাস ধরে এই প্রক্রিয়া চলে। এই দু’মাসে কর্মীদের ওপর কিছু অদ্ভুত অদ্ভুত শর্ত চাপিয়ে দিয়ে দেখা হয়, তাঁরা সেগুলো পূরণ করতে পারছেন কিনা। যেমন, এই সময়ে তাঁরা কোনো ছুটি নিতে পারবেন না, তাঁদের কোনো বেতন বৃদ্ধি হবে না, তাঁরা কোনো সহকর্মীর সঙ্গে তর্ক করতে পারবেন না। বহু কর্মীই বলেছেন, এই প্রক্রিয়া চলাকালীন তাঁদের ওপর এত চাপ দেওয়া হয় যে তাঁরা হয় তা সহ্য করতে না পেরে কোনো না কোনো শর্ত লঙ্ঘন করে বসেন (যা তাঁদের চাকরি থেকে তাড়ানোর অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়), অথবা নিজেরাই চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।

IT professionals demonstrate in hyderabadদ্বিতীয় পদ্ধতি হল ‘অ্যাসেসমেন্ট’। বড়কত্তাদের মর্জি অনুযায়ী কিছু কর্মীকে প্রথমে ‘বেঞ্চে’ পাঠিয়ে দেওয়া হল, অর্থাৎ বসিয়ে দেওয়া হল। তার পর হঠাৎ তাঁদের কাছে ইমেল গেল, দু’দিন বাদেই একটা পরীক্ষা দিতে হবে। পরীক্ষায় এমন কোনো নতুন প্রযুক্তির ওপর প্রশ্ন এল, যার সঙ্গে তাঁরা পরিচিতই নন। কর্তৃপক্ষের মহানুভবতার নিদর্শন হিসেবে আরও একবার সুযোগ দেওয়া হল। তাতেও যাঁরা ৭০ শতাংশের ওপর নম্বর তুলতে পারলেন না, তাঁদের চাকরি নট।

আর যদি কেউ সেই অসাধ্যসাধন করতে পারেন? ধরে নেওয়া হল, তিনি নিজেকে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ‘আপগ্রেড’ করতে পারেন। কিন্তু নতুন প্রযুক্তিতে তো অত লোকের দরকার নেই। তাই তাঁর জন্যে অপেক্ষা করছে ঝাড়ফুঁকের তৃতীয় পদ্ধতি। আগের মতো কোম্পানি তাঁকে কাজ দেবে না। দু’মাস সময় দেওয়া হবে, এর মধ্যে তাঁকেই এমন একটা প্রজেক্ট খুঁজে নিতে হবে, যাতে তিনি কাজ করতে পারবেন বলে তাঁর মনে হয়। সাবধান, এ বড়ো পিছল পথ। যদি এর মধ্যে এমন কোনো প্রজেক্ট খুঁজে না পান, তা হলে তাঁর জন্যে আর এখানে কোনো জায়গা নেই। আর যদি একটা প্রজেক্ট বাছার পর দেখা যায় তাতে তিনি ‘ঠিকমতো’ কাজ করতে পারছেন না, তা হলেও তাঁর চাকরি থাকবে না।

তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ‘অমানবিক’ আচরণের বিরুদ্ধে ডিসেম্বর মাসেই ‘ফোরাম অভ আইটি প্রফেশনালস’ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাছে এক অভিযোগপত্র পাঠিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, “আইটি কোম্পানিরা বেআইনি ছাঁটাই, জবরদস্তি, বা জোর করে পদত্যাগ করানোর আশ্রয় নিচ্ছে এবং কর্মীদের একেবারে পথে বসিয়ে দিচ্ছে আর তারা যাতে আদালতে না যায় তার জন্য শাসানি দিচ্ছে। সরকার উপযুক্ত পদক্ষেপ না নেওয়ায় কর্মীরা অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়েছে।… আমরা আপনাদের গোচরে আনতে চাই যে কোম্পানিরা আমাদের প্রতি যে আচরণ করছে তাতে ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১, অনুচ্ছেদ ১৯, অনুচ্ছেদ ১৪ এবং অনুচ্ছেদ ১৬ আমাদের যে জীবনের অধিকার, ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার, মতপ্রকাশের অধিকার এবং যে কোনও জায়গায় কাজ করার অধিকার দিয়েছে, তা লঙ্ঘিত হচ্ছে।”

সরকার কিন্তু চোখ ফিরিয়েই আছে। যে দিন হায়দরাবাদ হাইকোর্টে তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের মামলাটা গৃহীত হল, সে দিনই তো প্রধানমন্ত্রী লোকসভায় বললেন, বিরোধীরা বেকারি নিয়ে এত শোরগোল করছে কেন, আজকাল তো শিক্ষিত যুবকযুবতীরা চাকরি করতেই চায় না, তারা সবাই ব্যবসা করতে চায়, নতুন নতুন শিল্প গড়তে চায়! ভালো যুক্তি। যদি ধরে নেওয়া হয় চাকরি ব্যাপারটাই আজকের দুনিয়ায় অচল হয়ে গেছে, চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে আর মাথা না ঘামালেও চলবে।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন