kali at devi chowdhurani temple jalpaiguri

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি চার দিকে গাছপালার জঙ্গল। কয়েকশো  বছরের পুরোনো বটগাছ তার ঝুরিগুলো দিয়ে ঘিরে যেন পাহারা দিচ্ছে একটুকরো ইতিহাসকে।

শ্যামা-আরাধনার জন্য সেজে ওঠা দেবী চৌধুরানি শ্মশানকালী মন্দির যেন হাতছানি দিচ্ছে ভক্তদের। বৃহস্পতিবার দীপান্বিতার রাতে, এখানেই মায়ের আরাধনায় মেতে উঠল জলপাইগুড়িবাসী।

আরও পড়ুন: কালীপুজো পরিক্রমা: দেখে নিন জলপাইগুড়ির কয়েকটি পুজো

জলপাইগুড়ি শহরে ঢোকার মুখেই গোশালা মোড়। এখানেই ৩১নং জাতীয় সড়ক ঘেঁষেই রয়েছে প্রাচীন মন্দিরটি। রাস্তা থেকে দেখলে প্রায় বোঝায় যায় না, যে বিশাল বিশাল গাছের আড়ালে রয়ে গিয়েছে ইতিহাসের এক টুকরো সাক্ষী।

জাতীয় সড়ক ছেড়ে ভেতরে পা রাখলেই গা ছমছমে পরিবেশ। বড়ো বড়ো বটগাছ তার ঝুরি নামিয়ে জায়গাটাকে যেন কংক্রিট-সভ্যতার হাত থেকে আড়াল করে রেখেছে। কয়েক পা এগোলেই চোখে পড়বে মায়ের মন্দির। তবে এই মন্দিরটি নতুন তৈরি করা হয়েছে। প্রাচীন মন্দিরটি প্রায় ভগ্নদশা হয়ে পড়ায় সেটাকে নতুন করে গড়ে তোলা হয়েছে। পরিধিও বাড়ানো হয়েছে।

লোককথা অনুযায়ী প্রায় ২৩৪ বছর ধরে শশ্মানকালীর পূজো হয়ে আসছে এখানে। অনেকের দাবি এই মন্দিরের সাথে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাসখ্যাত দেবী চৌধুরানি ও ভবানী পাঠকের নাম। জঙ্গল এবং তিস্তানদী-ঘেরা জলপাইগুড়ি-সহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় গড়ে ওঠা অনেক কালীমন্দিরের সঙ্গেই উচ্চারিত হয় এই দু’টি নাম। জলপাইগুড়ির বিভিন্ন বনাঞ্চলে এই রকম বেশ কয়েকটি কালীমন্দির রয়েছে, যা ভবানী পাঠকের তৈরি বলে জনশ্রুতি। এ রকমই এক ইতিহাসের সাক্ষী গোশালা মোড়ের এই  মন্দির বলে দাবি স্থানীয়দের।

devi chowdhurani temple jalpaiguri
দেবী চৌধুরানি মন্দির, জলপাইগুড়ি।

প্রাচীন বটবৃক্ষ ঘেরা এই মন্দিরকে ঘিরে ছড়িয়ে আছে নানা ‘মিথ’। সময়টা  সতেরশো শালের শেষ দিক (১৭৮৩)। ইংরেজদের রাজত্ব চলছে।তা দের বংশবদ দেশীয় রাজারা খাজনা আদায়ের নামে প্রজাদের ওপর অকথ্য অত্যাচার চালাতেন। সেই সময় তাদের রক্ষক  হিসেবে আবির্ভাব হয় ভবানী পাঠকের। তিনি ছিলেন  একাধারে গরিবের ত্রাতা আর ইংরেজ-জমিদারদের শত্রু। তাঁর পরিচিতি ছিল ডাকাতসর্দার হিসেবে। কিন্তু সন্ন্যাসীর মতো জীবনযাপন করতেন তিনি। শোনা যায়, তিনি অত্যাচারী ইংরেজ ও দেশীয় জমিদারদের ওপর লুঠতরাজ চালিয়ে তা দীনদরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। এই সময় তাঁর ছত্রছায়ায় আশ্রয় পান অত্যাচারিত এবং শ্বশুরঘর থেকে বিতাড়িত দেবী চৌধুরানি। দু’জনে মিলে তৈরি করেন ভয়ংকর ডাকাত দল। এই দু’ জনন সন্ন্যাসী বিদ্রোহে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন ছিলেন বলে জানা যায়।

তাঁরাই এই মন্দির তৈরি করেছিলেন বলে জনশ্রুতি। এখানে ছিল ডাকাতসর্দার ভবানী পাঠক ও তাঁর দলবলের আস্তানা। লুঠ করা মাল তাঁরা এখানেই লুকিয়ে রাখতেন। এই মন্দিরে একটি সূড়ঙ্গও রয়েছে সেই ইতিহাসের নিদর্শন হিসেবে। সেই সুড়ঙ্গ দিয়ে যাতায়াত করতেন তাঁরা। ভবানী পাঠক মারা যাওয়ার পর এই দলের সর্দার হন দেবী চৌধুরানি।

আরও পড়ুন: শিকারপুর চা বাগানের কালীমন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানির ইতিহাস

সত্যিই ভবানী পাঠক এই মন্দির তৈরি করেছিলেন কি না তা নিয়ে দ্বিমত আছে ইতিহাসবিদদের মধ্যে। তবে ইতিহাস যা-ই বলুক না কেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এই মন্দির খুব জাগ্রত। তার প্রমাণও মিলল এই দীপান্বিতার রাতে। পূজোর সময় ঢল নামল ভক্তদের। দীর্ঘ সতেরো বছর ধরে এই মন্দিরে পূজো করছেন সেবাইত সুভাষ চৌধুরী। তিনি জানালেন, এখনও প্রাচীন রীতি অনুযায়ী পূজো হয় এই মন্দিরে। এখানে অধিষ্ঠিতা মায়ের শ্মশানকালী রূপ। পুজো হয় তন্ত্রমতে। কারনসুরা দিয়ে মাকে স্নান করানো হয়। হয় পাঁঠাবলি। দীপান্বিতার মধ্যরাত অবধি পূজো চলে। দেওয়া হয় আমিষ ভোগ। জলপাইগুড়ি তো বটেই দূরদূরান্ত থেকে এখানে বৃহস্পতিবার পূজো দিতে এসেছিলেন অনেকে। তা ছাড়া মায়ের নিত্যপূজা হয় এই মন্দিরে।

শহর থেকে একটু দূরে গাছগাছালি ঘেরা এই মন্দিরের শান্ত পরিবেশ মানুষকে আকর্ষণ করে। তাই পূজো ছাড়াও এখানে সাধারণ মানুষ আসেন ঘুরতে, সময় কাটাতে। জেলার পর্যটন মানচিত্রে এই মন্দির একটা বড়ো আকর্ষণ।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here