mayda kali bari
papiya mitra
পাপিয়া মিত্র

শিয়ালদহ স্টেশন থেকে লক্ষ্মীকান্তপুর লোকালে বহড়ু স্টেশন। ভ্যানরিকশায় মাত্র তিন কিলোমিটার গেলে ময়দা গ্রাম।

‘ময়দা’ নামের উৎপত্তি নিয়ে দু’টি কাহিনি প্রচলিত। রাবণরাজার শ্বশুরমশাই তথা ব্রহ্মার বরপ্রাপ্ত স্থপতি ময়দানবের বাস ছিল নাকি এখানেই। তাঁর নামেই এই অঞ্চলের নাম ময়দা। আর একটি কাহিনি পর্তুগিজদের ঘিরে। বহড়ুর এই অঞ্চল আদিগঙ্গার প্রবাহপথের ওপর অবস্থিত। বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ করার রাস্তা হিসাবে এই জলপথটি পর্তুগিজ জলদস্যু ও ব্যবসায়ীদের খুব পছন্দের ছিল। তারা এই অঞ্চলকে বলিত ‘মদিয়া’। সেখান থেকেই এসেছে ‘ময়দা’ নাম।

ময়দা গ্রামের পুব দিকে উত্তর থেকে দক্ষিণ বরাবর একটি রাস্তা প্রসারিত ছিল, যা দ্বারির জাঙ্গাল নামে খ্যাত। বর্তমানে সেটি লুপ্ত। আদতে এই পথ ছিল তীর্থপথ। হরিদ্বার থেকে সাগর পর্যন্ত প্রসারিত এই পথ ব্যবহার করতেন তীর্থযাত্রীরা। কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীর চৈতন্যচরিতামৃত ও বৃন্দাবনদাসের চৈতন্যভাগবত থেকে জানা যায়, শ্রীচৈতন্যদেবের সপার্ষদ নীলাচলযাত্রার পথও ছিল এটি। আদিগঙ্গার প্রবাহপথ ধরে শ্রীচৈতন্য ময়দা গ্রামের উত্তরে বারুইপুরের কাছে আটিসারা গ্রামে আসেন। সেখানে তিনি অনন্ত পণ্ডিতের বাড়িতে আশ্রয় নেন। তার পরে অনন্ত পণ্ডিতের বাড়ি থেকে আদিগঙ্গার পূর্ব তীরস্থ দ্বারির জাঙ্গাল দিয়ে তিনি ছত্রভোগ যান। সেখান থেকে নৌকাযোগে জগন্নাথধামে।

সেই ময়দা গ্রামেই ময়দা কালীবাড়ি। মন্দিরের ফটকের মাথায় লেখা ‘ময়দানবের পরমারাধ্যা দেবী পাতালভেদী দক্ষিণাকালী ময়দানবেশ্বরী’।  প্রায় ৭৩ শতক জায়গা জুড়ে মন্দিরপ্রাঙ্গণ। দক্ষিণমুখী প্রবেশপথ দিয়ে ঢুকেই চোখে পড়ল যূপকাষ্ঠ। সামনে নাটমন্দির, তার পিছনেই মূল মন্দির। মন্দিরে কোনো মূর্তি নেই। একটি চতুষ্কোণ গহ্বরে দেবীর প্রতীকস্বরূপ সিঁদুর মাখানো শিলাকে দক্ষিণাকালী ধ্যানে পুজো করা হয়।

inside mayda kali templeপশ্চিমে মায়ের পুকুর এক বিঘে। পূর্ব-দক্ষিণে শিবমন্দির। মন্দিরের পিছনে পশ্চিম-উত্তর কোণ করে বিশাল কাণ্ড নিয়ে বকুল গাছ, সিদ্ধবকুল। তারই নীচে ভবানী পাঠকের পঞ্চমুণ্ডির আসন ও মূর্তি। ধর্মরাজের মন্দির আছে মায়ের মন্দিরের উত্তর-পূর্ব কোণে।

ময়দার পাতালভেদী কালীমন্দির বড়িষার সাবর্ণ রায়চৌধুরীরা নির্মাণ করেন ১১৭৬ বঙ্গাব্দে এবং রাঢ়ীয় বন্দ্যোপাধ্যায়দের মন্দিরের পুরোহিত ও সেবায়েত নিযুক্ত করেন। হঠাৎ এখানে এই মন্দিরের কী ভাবে প্রতিষ্ঠা হল তা নিয়েও কাহিনি আছে। কথিত, সাবর্ণ রায়চৌধুরীর কোনো এক পুরুষ বজরা নিয়ে গঙ্গার বুকে বেড়াতে বের হন। হঠাৎ চোখে পড়ে দূরে বকুল গাছের ডালে একটি ছোটো মেয়ে দোল খাচ্ছে। জমিদার বজরা থামিয়ে খোঁজ করতে থাকলে মাঝিরা জানায়, ও ডাইনি, ওকে ধরা যায় না। জমিদারকে রাতে ওই বালিকা স্বপ্নে জানায়, সে পাতালভেদী দক্ষিণাকালী। বকুল গাছের গোড়ায় যে মাটির স্তূপ আছে তা খুঁড়লে দেখা যাবে এক খণ্ড শিলা। ওখানেই মন্দির তৈরি করে দেওয়ার আদেশ দেয় ওই বালিকা।

কালীপুজো উপলক্ষে মন্দিরে এখন সাজো সাজো রব। তবে শুধু কালীপুজোতেই নয়, বিশেষ বিশেষ তিথিতে পুজো দেওয়ার জন্য যে লাইন পড়ে তা বিস্ময় জাগায়। মায়ের পুকুরে স্নান করে পুণ্যার্থীরা ময়দানবের পরমারাধ্যা দেবী পাতালভেদী ময়দানবেশ্বরী দক্ষিণাকালীর পুজো দেন ভক্তিভরে।

দক্ষিণাকালীবাড়ি উন্নয়ন সমিতির তরফ থেকে জানা গেল, ভাদ্রমাসে তালনবমী, শ্রাবণের অম্বুবাচী এবং বৈশাখ ও মাঘ মাসের প্রথম দিনেও এই মন্দিরে উৎসব পালিত হয়। বহু মানুষের উপচে পড়া ভিড়ে মন্দিরপ্রাঙ্গণ মুখর হয়ে ওঠে। জ্যৈষ্ঠপূর্ণিমা ও শারদনবমীতেও বিশেষ পুজোর আয়োজন করা হয়। এ ছাড়া প্রতি মঙ্গলবার ও শনিবার বেশ ধুমধাম করে পুজো হয়।

ছবি – সুমন সাহা

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here