mamun and moslem munshi
সাদা জামা পরা মামুনের সঙ্গে করমর্দন করছেন সাফারি স্যুট পরিহিত মোসলেম মুন্সি।

নিজস্ব সংবাদদাতা, নদিয়া: এক সময় এলাকার এক অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় আঘাত নেমে এসেছিল তাঁর ওপরে। প্রবল মানসিক নির্যাতনের পরে তা^কে পাগল প্রতিপন্ন করার চেষ্টা হয়েছে। ‘এই জীবনে বিচার নাই’ লিখে একসময় আত্মঘাতী হওয়ার কথাও ভেবেছেন। আত্মহত্যা অবশ্য করেননি বরং নিজের জীবন দর্শন দিয়েই লিখে ফেলেছেন মানবজীবনের এক অসামান্য রূপকথা। নাকাশিপাড়া থানার গলায় দড়ি গ্রামের বাসিন্দা মোসলেম মুন্সির সেই রূপকথা বদলে দিয়েছে বহু মানুষের জীবন। তাঁর হাত ধরে নিজের পরিবার ফিরে পেয়েছেন বহু মানসিক ভারসাম্যহীন ভবঘুরে। দু’ বছর পার করে এসে যেমন এখন মোসলেমের সহায়তায় নিজের ঘর ফিরে পেল বাংলাদেশের মামুন রসিদ। রবিবার মামুন ফিরল নিজের বাড়িতে, পরিবারের কাছে।

বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার চামটা তিন নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মামুন মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। এক দিন কোনো ভাবে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন তিনি। পথ চিনে আর বাড়ি ফিরতে পারেননি। সীমান্ত পার হয়ে ও-পার বাংলা থেকে চলে আসেন এ-পারে। নদিয়ার চাপড়া সীমান্ত থেকে তাঁকে উদ্ধার করে বিএসএফ, ২০১৫ সালের নভেম্বরে। তখন তিনি একেবারেই মানসিক ভারসাম্যহীন।

কৃষ্ণনগর সদর মহকুমাশাসক মারফত মামুন আসেন মোসলেমের কাছে। সেটা ২০১৫ র ২ নভেম্বর। এর পর মোসলেম সেখানেই তাঁর পরিচর্যা শুরু করেন। চুল দাড়ি কেটে স্নান করিয়ে পরিষ্কার জামা কাপড় পরানো হয় তাঁকে। একটি পা ভাঙা ছিল তাঁর। শুরু হয় তাঁর চিকিৎসা। ক্রমে সুস্থ হয়ে ওঠেন মামুন। নিজের নাম ঠিকানা বলতে পারার পরেই তাঁর কাছ থেকে ঠিকানা জেনে তাঁর বাড়িতে চিঠি লেখেন মোসলেম।

ইতিমধ্যে মামুনের খোঁজ না পেয়ে বাংলাদেশ প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছিলেন তাঁর বাবা। কিন্তু সে দেশের প্রশাসন তাঁর কোনো খোঁজ দিতে পারেনি। গত বছর মোসলেমের চিঠি পেয়ে মামুনের মামা নুরুল ইসলাম ছুটে আসেন এ দেশে। শুরু হয় মামুনকে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ। সরকারি নিয়মের বেড়াজালে অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে দেশে ফেরা হয়নি তাঁর। কয়েক দিন আটকে থাকার পরে অবশ্য মেলা দেশে ফেরার ছাড়পত্র। রবিবার বিকেলে পরিবারের লোকেদের সঙ্গে গেদে সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশ পাড়ি দিলেন মামুন। পরিবারের কাছে ফেরার দিনেও অবশ্য চোখে জল মামুনের। এত দিন তো মোসলেমের সংসারেই এক জন হয়ে উঠেছিলেন তিনি। মামুনের কথায়, “আমার ওনাকে ধন্যবাদ জানানোর ভাষা নেই। ওনার জন্য আজ পরিবার ফিরে পেলাম। আমি আবার এখানে আসব দেখা করতে।”

চোখে জল মোসলেমেরও। বলছেন, ওরা নিজেদের পরিবার ফিরে পায়, এতেই আমার আনন্দ। এত দিন আমার বাড়িতে থেকে ঘরের লোক হয়ে উঠেছিল। একটু মন খারাপ তো হয়ই।

সেরিকালচার বিভাগের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মী মোসলেম নিজের উদ্যোগে এই কাজ করে আসছেন। একাকী নিজেই উদ্যোগ নিয়েছিলেন ১৮ বছর আগে। একদিন বেথুয়াডহরি স্টেশনের কাছে দাঁড়িয়েছিলেন মোসলেম। একটি তেলেভাজার দোকানের সামনে এক মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি তেলেভাজা চেয়ে হাত বাড়াতেই তাঁর হাতে গরম তেল ঢেলে দেন দোকানদার। সেই মানসিক ভারসাম্যহীন যখন যন্ত্রণায় ছটফট করছেন তখন তাঁর পাশে দাঁড়ান মোসলেম। নিয়ে আসেন নিজের বাড়িতে। হাতের ক্ষতে ওষুধ লাগানোর পাশাপাশি তাঁকে স্নান করিয়ে পরিষ্কার জামা কাপড় পরান। শুরু হয় চিকিৎসকের কাছে তাঁর চিকিৎসা। কয়েক মাস পরে সুস্থ হয়ে উঠে তিনি তাঁর নাম-ঠিকানা বলেন। তাঁর বাড়িতে যোগাযোগ করা হয়। বাড়ির লোক এসে ফিরিয়ে নিয়ে যান তাঁকে। সেই শুরু। এক হাজারেরও বেশি মানুষ এ ভাবেই মোসলেমের সহায়তায় নিজের পরিবার ফিরে পেয়েছেন।

রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো মানসিক ভারসাম্যহীন আর ভবঘুরেদের দেখে প্রাণ কেঁদেছিল তাঁর। তাঁদের প্রতি মানুষের অবহেলা আর নির্যাতন সহ্য করতে পারেননি। নিজেই বেরিয়ে যেতেন বাড়ি থেকে। প্রায়শই রাস্তা থেকে ধরে আনতেন ভবঘুরে বা মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষগুলোকে। বাড়িতে তাঁদের রেখে সাফসুতরো করে পরিচ্ছন্ন জামাকাপড় পরিয়ে চলত চিকিৎসা। আর তা হত সম্পূর্ণ ব্যাক্তিগত উদ্যোগে।  চিকিৎসা চলার পরে কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠে সেই মানুষগুলো নিজেদের নাম ঠিকানা জানাতে পারলে তিনি নিজেই যোগাযোগ করেন তাঁদের বাড়িতে।

নদিয়ার নাকাশিপাড়া থানার বেথুয়াডহরির গলায় দড়ি গ্রামের বাসিন্দা মোসলেম মুন্সির উদ্যোগে গত ১৮ বছরে এ ভাবেই ঘর ফিরে পেয়েছেন ১০১৮ জন। তাঁর বাড়িতে সব সময়ে এই ধরনের মানুষের ভিড়। তাঁদের আলাদা থাকা খাওয়ার ব্যবস্থাও করেছেন মোসলেম। অল্প আয়ে এত সংখ্যক মানুষকে নিজের বাড়িতে খাওয়া-পরা দিয়ে সুস্থ করে তোলার বিপুল খরচ সামলাতে হয়েছে অনেক ধারদেনা। মোসলেমের কথায়, সরকারি তরফে বা অন্য কেউ যদি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন তা হলে আমার এই কাজে অনেক সুবিধা হয়।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here