নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি: সকালে চায়ের দোকানের আড্ডা হোক বা সান্ধ্য-ঠেক বা রাস্তার মোড়ে জটলা। সবার আলোচ্য বিষয় এখন একটাই। ময়নাগুড়ি সুভাষনগর হাইস্কুল এবং প্রধান শিক্ষক হরিদয়াল রায়। সবার একটাই প্রশ্ন, এর সুষ্ঠু বিহিত কবে হবে?

শুক্রবার সল্টলেকে মধ্যশিক্ষা পর্ষদের দফতরে ডেকে পাঠানো হয়েছিল প্রধান শিক্ষককে। ডাকা হয়েছিল অবর বিদ্যালয় পরিদর্শক বিশ্বনাথ ভৌমিক সহ আরও বেশ কয়েক জনকে। কিন্তু প্রায় পাঁচ ঘণ্টা শুনানির পরেও পর্ষদ কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় উৎকন্ঠায় রয়েছেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শিক্ষানুরাগী মহল। কারণ, প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ যদি সত্য প্রমাণিত হয় তা হলে শুধু ময়নাগুড়ি নয়, গোটা রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থাই কালিমালিপ্ত হবে।

maynaguri subhashnagar high school
ময়নাগুড়ি সুভাষনগর হাইস্কুল।

শনিবারও থমথমে ছিল ময়নাগুড়ি সুভাষনগর হাইস্কুল। পঠনপাঠন হলেও স্কুলের স্বাভাবিক পরিবেশ যে বিঘ্নিত হচ্ছে তা জানিয়েছেন স্কুলের শিক্ষকরাই। স্কুলের বাংলার শিক্ষক আনন্দশংকর দাম জানিয়েছেন, চারিদিকে স্কুল এবং প্রধান শিক্ষককে নিয়ে আলোচনা, সংবাদমাধ্যমের আনাগোনা ছাত্রছাত্রীদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মঙ্গলবার থেকে শুরু হচ্ছে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা, যার সেন্টার ইনচার্জের দায়িত্বে ছিলেন প্রধান শিক্ষক হরিদয়াল রায়। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের পর তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে স্কুলের অন্য শিক্ষককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিগত কয়েক বছর ধরে উচ্চ মাধ্যমিকের মেধা তালিকায় জায়গা করে নিয়েছিল এই স্কুল। কিন্তু এই বছর সে রকম হলে তা নিয়ে ফের বিতর্ক তৈরি হবে কি না তা নিয়েই দুশ্চিন্তায় রয়েছেন স্কুলের শিক্ষকরা।

গোটা ঘটনায় বিচলিত অভিভাবকরাও। প্রশ্ন ফাঁসের সত্যতা প্রমাণিত হোক বা না হোক, ঘটনাক্রম দেখে অভিভাবকদের একাংশ বেজায় ক্ষুব্ধ। সন্তানদের আদৌ এই স্কুলে পড়াবেন কি না তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন, জানালেন অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রের বাবা বিনয় কামার।

english teacher biswajit roy
ইংরেজির শিক্ষক বিশ্বজিৎ রায়।

এ দিকে অভিযুক্ত এবং অভিযোগকারীদের  মধ্যে শুরু হয়েছে আইনি লড়াইয়ের প্রক্রিয়া। প্রধান শিক্ষক হরিদয়াল রায়ের তরফে সম্মানহানির অভিযোগ তুলে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে তিন জনকে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ওই স্কুলের ইংরেজির শিক্ষক বিশ্বজিৎ রায়, ইতিহাসের শিক্ষক সম্রাট বিশ্বাস এবং অবর বিদ্যালয় পরিদর্শক বিশ্বনাথ ভৌমিক। প্রধান শিক্ষকের আইনজীবী প্রেমাংশুশেখর নন্দী জানিয়েছেন, প্রশ্ন ফাঁসের মিথ্যা অভিযোগ করে এবং সংবাদ মাধ্যমে মিথ্যা বিবৃতি দিয়ে ওই তিন জন ‘শিক্ষারত্ন’ প্রাপক প্রধান শিক্ষক হরিদয়াল রায়ের সম্মানহানি করেছেন। সাত দিনের মধ্যে লিখিত ভাবে নিঃশর্ত ক্ষমা না চাইলে তাঁদের বিরুদ্ধে আদালতে মানহানির মামলা দায়ের করা হবে।

শুক্রবারই প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং দুর্নীতির অভিযোগ তুলে প্রধান শিক্ষক হরিদয়াল রায়ের বিরুদ্ধে ময়নাগুড়ি থানায় অভিযোগ দায়ের করেছিলেন শিক্ষক বিশ্বজিৎ রায়। তিনিই প্রথম এর বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন। আইনি নোটিশ হাতে পাওয়ার পর তিনি জানিয়েছেন, বিভিন্ন দিক থেকে তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তবে তিনি এতে পিছপা হবে না। বিদ্যালয় পরিদর্শক বিশ্বনাথ ভৌমিক কলকাতায় রয়েছেন। আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে আইনি পথেই নোটিশের জবাব দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

bishwanath bhowmick
অবর বিদ্যালয় পরিদর্শক বিশ্বনাথ ভৌমিক।

এ দিকে একটি সূত্র বলছে, বিদ্যালয় পরিদর্শক বিশ্বনাথ ভৌমিককে শো-কজ করা হতে পারে পর্ষদের তরফে। তাঁর ‘অপরাধ’ সংবাদ মাধ্যমে মুখ খোলা!

তবে প্রশ্ন উঠেছে ইতিহাসের শিক্ষক সম্রাট বিশ্বাসকে নোটিশ পাঠানো নিয়ে। কারণ, অভিযোগ অনুযায়ী তিনি প্রধান শিক্ষকের সাহায্যকারী। ঘটনার পর থেকে তিনি বেপাত্তা। সংবাদমাধ্যমেও বক্তব্য দেননি। স্কুলেও আসেননি। তবে সূত্রের খবর, প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে ইংরেজির শিক্ষক বিশ্বজিৎ রায়ের সঙ্গে মোবাইলে তাঁর কথোপকথনের একটি অডিও ক্লিপ প্রকাশ্যে আসাতেই তিনি প্রধান শিক্ষকের বিরাগভাজন হয়েছেন।

এ দিকে যে মেধাবী  ছাত্রকে সাহায্য করতে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে তার পরিবারের তরফেও ময়নাগুড়ি থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। সেখানে অভিযোগ আনা হয়েছে পুরো ঘটনায় ওই মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীকে অহেতুক জড়িয়ে তার সম্মানহানি করা হচ্ছে, তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করা হচ্ছে।

পর্ষদের শুনানি হয়ে গেলেও শনিবার ময়নাগুড়িতে ফেরেননি হরিদয়াল রায়। তাঁর ফোন সারা দিনই ‘নট রিচেবল’ ছিল। ময়নাগুড়িতে তাঁর প্রাসাদোপম বাড়ির সামনে মোতায়েন করা হয়েছে পুলিশ। এ দিকে ঘটনার পর থেকে প্রতি দিনই কোনো না কোনো সংগঠন নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রধান শিক্ষকের শাস্তি চেয়ে রাস্তায় নামছে। ছাত্রসমাজ, অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের পর শনিবার বিক্ষোভ মিছিল করে বামপন্থী গণসংগঠনগুলি। এ সব দেখে রাস্তার মোড়ে জটলায় দাঁড়ানো ময়নাগুড়ির এক প্রবীণ বাসিন্দার আক্ষেপ, “কী দরকার ছিল এ সবের”।

dailyhunt

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন