jalpaiguri jail

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি: উদ্ধার গোটা পঁচিশেক মোবাইল ফোন, প্রায় ৪০০ গ্রাম গাঁজা আর বেশ কিছু ধারালো অস্ত্র। না, কোনো স্মাগলার বা চোরাপাচারকারীর কাছ থেকে পাওয়া যায়নি এ সব। এ সব উদ্ধার হয়েছে সংশোধনাগারের ভেতর থেকে!

শোলে সিনেমায় আসরানি অভিনীত জেলর চরিত্রটির বিখ্যাত ডায়লগ ছিল “হামারি জানে বিনা ইহা পরিন্দা ভি প্যার নেহি মার শকতা”। কিন্তু তার চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল জয়-বীরু। যদিও সেটা ছিল সিনেমা। কিন্তু আসলেও যে ‘কাগুজে’ নিরাপত্তায় ফাঁকফোকর বিস্তর, জলপাইগুড়ি কেন্দ্রীয় সংশোধনাগার থেকে এই ধরনের সামগ্রী উদ্ধার হওয়া, তা প্রমাণ করে দিল।

কারারক্ষীদের মাদক খাইয়ে, গত শনিবারই আলিপুর সংশোধনাগার থেকে পালিয়েছিল তিন বন্দি। নিরাপত্তার ফাঁকফোকর চোখে পড়েছিল তখনই। জলপাইগুড়ি কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারের আজকের এই ঘটনা বুঝিয়ে দিচ্ছে ফাটলটা বেশ বড়ো।

AIG (prison) kalyan kumar pramanik
এআইজি (কারা) কল্যাণ কুমার প্রামাণিক।

মঙ্গলবার দুপুরে জলপাইগুড়ি কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারে অতর্কিত অভিযানে আসেন এআইজি (কারা) কল্যাণ কুমার প্রামাণিক। আলিপুর সংশোধনাগারের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই এই অভিযান বলে সূত্রের খবর। দুপুর দেড়টা থেকে তিনি সংশোধনাগারে তল্লাশি শুরু করেন। এখানে ১৪০৫ জন বন্দি রয়েছেন। সেলের সংখ্যা ২৪। তা ছাড়াও রান্নাঘর, লাইব্রেরি, বাগান এবং খোলা জায়গা মিলিয়ে বিশাল চত্বর। কারারক্ষী কম থাকায় কোতোয়ালি থানা থেকে অতিরিক্ত পুলিশবাহিনী নিয়ে আসা হয়। সবাইকে নিয়ে প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে চলে তল্লাশি। উদ্ধার হয় পঁচিশটি মোবাইল, যার মধ্যে স্মার্টফোনের সংখ্যাই বেশি। কিছু সেলে, কিছু আবার বাগানের ঝোপেঝাড়ে ‘সাইলেন্ট মোডে’ লুকোনো ছিল। পাওয়া যায় প্রায় ৪০০ গ্রাম গাঁজা। উদ্ধার হয় ছুরি জাতীয় ধারালো অস্ত্র। পাওয়া যায় দড়ি, হুক যা পালানোর জন্য উপযুক্ত।

এখন প্রশ্ন, কারাগারের চার দেওয়ালের কড়া নিরাপত্তা ভেদ করে কী ভাবে এল এই সব? প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন এআইজি (কারা) কল্যাণ কুমার প্রামাণিক নিজেই। তাঁর বক্তব্য, “এ সব তো ভগবান উপর থেকে ফেলে না, আমরাই ফেলি। এর জন্য কারারক্ষীরাই দায়ী।”

কারা দফতরের রাজ্য আধিকারিকের গলায় এই স্বীকারোক্তি চমকে যাওয়ার মতোই। তবে সংশোধনাগারের ভেতর যে নানা অনিয়ম আকছার চলে তা চার দেওয়ালের এ পাশে কান পাতলেই শোনা যায়। পছন্দের খাবার, নেশার সামগ্রী, ফোন সবই মেলে এখানে। তবে তা সহজলভ্য নয়। বরং বেশ চড়া মূল্য চোকাতে হয় তার জন্য। চাহিদামতো টাকা ফেললে কারারক্ষীদের একাংশের মদতে পছন্দের জিনিস চলে আসে ভেতরে। দীর্ঘদিন ধরে সংশোধনাগারে থাকা কিছু বন্দি এবং কারারক্ষীদের একাংশ এতে জড়িত। এর আগেও একাধিকবার, শুধু জলপাইগুড়ি নয়, রাজ্যের বিভিন্ন জেলে এই ধরনের অনিয়ম ধরা পড়েছে। শাস্তিও হয়েছে কারারক্ষীদের। কিন্তু বন্ধ হয়ে যায়নি এই লাভজনক ব্যবসা। বরং রমরম করে চলছে কাঁচা টাকার আমদানি।

কারারক্ষীরা এতে যুক্ত স্বীকার করলেও তাঁদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়া হবে কি না তার কোনো স্পষ্ট উত্তর দেননি রাজ্য কারা-আধিকারিক। তবে তিনি জানিয়েছেন, কর্মী কম থাকাও নিরাপত্তায় ঘাটতির একটা কারণ। নজরদারি আরও বাড়াতে জেলে সিসিটিভি লাগানোর পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন এআইজি (কারা)। শুধু কারারক্ষীরাই নন, বাইরের মানুষও এতে জড়িত বলে দাবি তাঁর।

সংশোধনাগারের জেলার রাজীব রঞ্জন জানিয়েছেন, আজকের সমস্ত ঘটনার রিপোর্ট রাজ্য কারা দফতরে পাঠানো হবে।

কারারক্ষী বাড়ানো হবে, সিসিটিভি লাগানো হবে, অনিয়মের রিপোর্টও পাঠানো হবে। সবই হয়ত হবে। প্রশ্ন শুধু একটাই, অনিয়মগুলো আদৌ বন্ধ হবে কি?

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন