modi-mamata
দেবারুণ রায়

বিরোধীরা অনাস্থা এনে সরকারকে আদৌ সংকটের মুখে নিয়ে যেতে পারছে কি না তা বুঝতে শুক্রবারের বিকেল পেরিয়ে যাবে। কিন্তু অনাস্থার সিদ্ধান্ত আজকের রাজনীতির জলছবি প্রায় পুরোটাই ফুটিয়ে তুলেছে দেশের ক‍্যানভাসে। ছবিতে আয়নার মতো দেখা যাচ্ছে দেশের সব মত ও পথের কর্ণধারদের মুখ। দেখা যাচ্ছে তাঁদের দলগুলোর ঘরে-বাইরে সক্রিয় উল্লেখযোগ্য জনপ্রতিনিধি ও সাংগঠনিক  প্রধানদের অবস্থান। জানা যাচ্ছে প্রতিক্রিয়াও।

কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী মা সনিয়ার পরামর্শেই অনাস্থা আনার পথে এগিয়েছেন। এবং মায়ের কথাতেই সীতারাম ইয়েচুরি ও দক্ষিণের বিরোধী নেতাদের সঙ্গে কথা বলে নিয়েছেন। কংগ্রেস, বাম ও স্ট‍্যালিন বা চন্দ্রবাবুর উদ‍্যোগেই ত্বরান্বিত হয়েছে অনাস্থা প্লস্তাব। অনাগত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়েই মমতা, চন্দ্রশেখর রাও বা নবীন পট্টনায়কের সঙ্গে আগাম কথা বলেনি কংগ্রেস। প্রথমত, এঁরা কখনও সার্বিক বিরোধী ঐক‍্যের চিন্তা মাথায় নিয়ে চলেন না। চলেন নিজস্ব অ্যাজেন্ডা অনুযায়ী। তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর পদপ্রার্থী নিয়ে আগাম প্রশ্ন তুলে বিজেপিকে বার্তা বা ফিলার দিয়েছেন। ১৯-এর ভোটের পর গরিষ্ঠতায় টান পড়বে ধরে নিয়েই বিজেপি এখন পারানির কড়ি হিসেবে হাতে রাখতে চাইছে বিরোধী জোটের তিন মূর্তিকে। কারণ এঁদের কথাতেই স্পষ্ট, এঁরা প্রধানমন্ত্রীর পদটিকেই মূল বিবেচ‍্য বিষয় হিসেবে তুলে ধরছেন, কার্যত যা কোনো ইস‍্যুই নয়। যে কোনো জোটের সরকার গড়ার ক্ষেত্রে স্বীকৃত বিধি হল, বৃহত্তম দল থেকেই প্রধানমন্ত্রী মনোনীত হন। এবং নেতা কে হবেন তা ঠিক কর সেই দল‌। এ বিষয়ে অন‍্য কোনো শরিকদল হস্তক্ষেপ করতে পারে না বা করে না। এই বিধি মেনেই জোট সরকার চিরকাল  স্থায়ী হয়েছে। যুক্তফ্রন্টের সরকার টেকেনি অনেক ছোটো দলের নেতারা প্রধানমন্ত্রী হওয়ায়। অথচ অটলবিহারী বাজপেয়ী ছ’ বছর এবং মনমোহন সিং দশ বছর প্রধানমন্ত্রী থেকেছেন বৃহত্তমদলের নেতা হিসেবে। এবং তাঁদের মনোনয়ন করেছে তাঁদেরই দল। তা নিয়ে অন‍্য কারও মত খাটেনি। এটাই কোয়ালিশন সরকার গড়ার ন্যূনতম বাধ‍্যতা। কিন্তু কংগ্রেস ও রাহুল গান্ধী নিয়ে গোড়াতেই প্রশ্ন তুলেছে তৃণমূল এবং কংগ্রেসের সঙ্গে কার্যত নো ট্র‍্যাক নীতি নিয়েছেন চন্দ্রশেখর ও নবীন। কট্টর কংগ্রেসবিরোধী অবস্থান ও বাধ‍্যতা সত্ত্বেও চন্দ্রবাবু ও কেরলের বিজয়নকে গিলতে হচ্ছে কংগ্রেসকে। না হলে জোটে অনৈক্য  দেখিয়ে ফায়দা তুলতে ভুল করবে না বিজেপি।

এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেস, বাম ও দক্ষিণী কিছু নেতার সিদ্ধান্ত বিপাকে ফেলেছে বিরোধীদের মধ্যে বেসুরোদের। ওডিশা ও তেলঙ্গানার মুখ‍্যমন্ত্রীর সমস্যা নেই। কারণ তাঁদের রাজ্যে সংখ্যালঘুরা সে ভাবে কংগ্রেসের সঙ্গে নেই। তা ছাড়া তাঁরা সংখ‍্যায় বাংলার মতো বিপুল নয়। তাই অনাস্থা প্রস্তাবে কংগ্রেসের সঙ্গে না থাকলে তাদের কুছ পরোয়া নেই বলেই তারা মাভৈ। কিন্তু বাংলায় মূলত বাঙালি মুসলমান জনতার অকুণ্ঠ সমর্থনই এই রাজ‍্যে পরিবর্তন এনেছে। এই বিরাট সমর্থনভূমির ধসই বামেদের ক্ষমতাচ্যুত করেছে। এই অংশের মানুষ বিজেপি-বিরোধী জোটে ফাটল সহ‍্য করবেন না। ফাটলের  কারিগরদের ছেড়ে কথা বলবেন না। সুতরাং সময়োচিত পদক্ষেপ মমতার। কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত পছন্দসই না হলেও বিজেপি-বিরোধী জোটের স্বার্থে হুইপ দিয়েছেন অনাস্থার পক্ষে।

অন‍্য দিকে মোদী মহাশয় কিন্তু কৌশলের পাশাপাশি মাথায় রাখেন বাস্তবতা ও রাজনৈতিক মতাদর্শকে। অবাস্তব কল্পনার বশবর্তী হয়ে মূল শত্রু বামেদের রাস্তা সাফ করতে চান না। তাই সুপ্রিম কোর্ট যে দিন নারদ-সারদা নিয়ে ধমক দিল সিবিআই কে, তার আগের দিনই মেদিনীপুরে দাঁড়িয়ে মোদী পঞ্চায়েত আর সিন্ডিকেট নিয়ে বিরোধী দল হিসেবে জাহির করেন বিজেপির পরিচয়। জেলার নেতাদের মতো। তিনি যে সিবিআইয়ের সমস্ত কাজের জন‍্য দায়বদ্ধ এবং দেশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা তা তাঁর কথায় বোঝা যায় না। বোঝাই যায় না যে সারদা বা নারদ নামে কোনো সাড়া-জাগানো কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে এই বঙ্গে এবং দুর্নীতি দমনের শপথ-সহ সব কালো টাকা উদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন তিনি। সততার আরেক প্রতীক তিনি। বলেছেন, খাবও না, কাউকে খেতেও দেব না। দিলীপ ঘোষ বা মুকুল রায়ের মুখের কথায় তিনি ভুলতে নারাজ। মেদিনীপুরে আসার আগে অমাত্যদের কাছ থেকে রিপোর্ট নিয়ে দেখেছেন, বঙ্কিম-বিতর্ক দিয়ে বাংলাকে এখনই বিজেপির দিকে বাঁকানো যাবে না।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here