water atm
nilanjan dutta
নীলাঞ্জন দত্ত

খবরের কাগজের পাতায় একটা ছবি দেখে চোখ আটকে গেল। রঙিন ছবি। বড়ো রাস্তার ধারে ব্যাঙ্কের টাকা তোলার মেসিনের মতো একটা যন্ত্রের সামনে দাঁড়িয়ে দুই শিশু। দু’জনেরই এক হাতে বেলুনের গোছা, আর এক হাতে একজন যন্ত্রটায় কী যেন করছে, আর একজন একটা জলের বোতল হাতে করে দাঁডিয়ে আছে। ক্যাপশন পড়ে জানা গেল, জায়গাটা রাজধানী দিল্লি, যন্ত্রটা ‘ওয়াটার এটিএম’ আর এই দুই শিশু রাস্তায় বেলুন বিক্রি করে।

child balloon seller at water atm
ছবি: সৌজন্যে দ্য স্টেটসম্যান

বেলুন নিয়ে যাদের খেলার বয়স, তাদের এ ভাবে বেলুন বিক্রি করতে আজকাল কলকাতাতেও মাঝেমাঝেই দেখা যায়। দেখে কারও কোনো ভাবান্তর হয় বলে মনে হয় না। এ ছবির দু’জনেই যদিও কন্যাসন্তান, তাদের ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’ প্রকল্পের আওতায় আনার ব্যাপারেও কারও মাথাব্যথা হয়নি। কিন্তু খেলাধুলো ফেলে শৈশব থেকেই বাঁচার জন্য এই শ্রম করতে করতে তাদের যদি তেষ্টা পায়, তা মেটানোর জন্য মাথা খাটিয়ে এক অভিনব ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই ওয়াটার এটিএম-এ টাকা ফেললেই তারা পেয়ে যাবে পরিশ্রুত পানীয় জল। সাংবাদিকরাও বুঝে নিয়েছেন, এটা খুশি হওয়ার মতনই ব্যাপার। তাই ছবির ওপরে আবার রঙিন শিরোনাম – ‘হ্যাপি ফেসেস’।

‘সনাতন ভারতের’ কথা ভুলে যান, যেখানে তৃষ্ণার্তকে জলদান পুণ্যকাজ বলে গণ্য হত। ইতিহাসের বইগুলোর তো এমনিতেই ‘সংস্কার’ হবে শুনছি, সে সময় আশা করি কর্তৃপক্ষ সেই জায়গাগুলো ছেঁটে ফেলে দেবেন, যেখানে রাজা-মহারাজাদের পথপার্শ্বে পুষ্করিণী খননের গৌরবগাথা লেখা আছে। স্বাধীনতা-উত্তর কালের ‘কল্যাণরাষ্ট্রের’ কাহিনিও বিস্মরণে যাক।

কিন্তু মনে রাখবেন, এই শিশুগুলি বেলুন বিক্রি করে তাদের মা-বাবার হাতে যে দু’টো পয়সা তুলে দেয় এবং তাদের মা-বাবাও উদয়াস্ত পরিশ্রম করে যে পয়সা রোজগার করেন, তা দিয়ে যখন তাদের গ্রাসাচ্ছাদনের সামান্য উপকরণ কেনা হয়, তখন রাষ্ট্র তাদের কাছ থেকে নির্বিচারে তার ‘হকের পাওনা’ ট্যাক্স আদায় করে। সেই ট্যাক্সের পয়সা দিয়ে কী হয়? মানুষকে একটু পানীয় জলও দেওয়া যায় না? অর্থনীতির নব্যন্যায়ের তাত্ত্বিকরা বলবেন, যুগ পালটে গেছে। বিনি পয়সার ভোজ আর নয়। এখন ‘নাথিং কামস ফর ফ্রি’। ফেলো কড়ি, মাখো তেল। না, ভুল বলে ফেললাম। তেলের কথা তো হচ্ছে না। বলতে হবে, ফেলো কড়ি, খাও জল।

তবে তেলের কথা যখন উঠলই, তেল নিয়েই একটা প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছে। কড়ি ফেলে মাখার তেল নয়, যে তেলে গাড়ি চলে, মানে পেট্রল-ডিজেল। সারা পৃথিবীতে এই তেলের দাম যখন কমছে, তখন আমাদের দেশে তা কমার কোনো লক্ষণ নেই। এখানে তেল পরিশোধন এবং বিক্রির জায়গায় পাঠানোর খরচা ধরলেও তেলের যা দাম পড়ে, তার দ্বিগুণ দাম দিয়ে আমাদের তা কিনতে হয়। এতে সরকারের ঘরে যে বাড়তি টাকাটা আসে, তার কিছুটা রেখে দেওয়া হয় আকস্মিক অর্থনৈতিক বিপদ-আপদ সামলানোর জন্য। আর বাকিটা নাকি খরচ করা হয় দেশের ‘উন্নয়নে’। তা-ই যদি হয়, তা হলে তেলের পয়সায় একটু পানীয় জলও দেওয়া যায় না মানুষকে? সেটাও কেন কিনে খেতে হবে?

মানুষ যেখানে পানীয় জল বা স্বাস্থ্যের মতো অত্যাবশ্যক জিনিসগুলি পাচ্ছে না, তখন তাদের কাছে তা পৌঁছে দেওয়াই বড়ো কথা, তা থেকে কেউ মুনাফা করছে কিনা সেটা নয়।বলছে বিশ্বব্যাঙ্ক।

হবে, কারণ বিশ্বব্যাঙ্ক বলেছে, এটা একটা চমৎকার পরিকল্পনা। ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে প্রকাশিত একটি রিপোর্টে তারা এই ধরনের প্রকল্পের গুণগান গেয়েছে। তাদের ভাষায়, এগুলি হল ‘সোশ্যাল এন্টারপ্রাইস’ বা সামাজিক বাণিজ্য উদ্যোগ। তারা বলছে, মানুষ যেখানে পানীয় জল বা স্বাস্থ্যের মতো অত্যাবশ্যক জিনিসগুলি পাচ্ছে না, তখন তাদের কাছে তা পৌঁছে দেওয়াই বড়ো কথা, তা থেকে কেউ মুনাফা করছে কিনা সেটা নয়। তাই ‘ওয়াটারলাইফ ইন্ডিয়া’ নামে একটি সংস্থাকে বিশ্বব্যাঙ্ক উদারহস্তে টাকা জোগাচ্ছে, ভারতের দিকে দিকে পয়সা ফেলে জল খাওয়ার কল পত্তন করার জন্য।

এ ছাড়াও, বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন কোম্পানি হঠাৎ ওয়াটার এটিএম বসাতে উঠেপড়ে লেগেছে। তবে আগেকার দিনের শ্রেষ্ঠীরা যেমন পুণ্যার্জনের জন্য জলসত্র স্থাপন করত সে রকম নয়, মেসিনে পড়া কড়িগুলি দিনের শেষে তারাই গুনে নেবে। কিন্তু জল তো আর তারা হাইড্রোজেন-অক্সিজেন মিশিয়ে তৈরি করছে না। মাটির তলা থেকেই টানছে। আগে রাস্তায় টিউবওয়েল ছিল। তেষ্টা পেলে আপনি তার থেকে একটু জল পাম্প করে খেতে পারতেন। তার পর শোনা গেল অত্যধিক ব্যবহারের ফলে মাটির নীচের জলস্তর হু হু করে নেমে যাচ্ছে, তাই আর এ ভাবে জল তোলা বন্ধ। টিউবওয়েলগুলো এক এক করে তুলে ফেলা হল। আর এ বার? আপনার বেলা যা বারণ ছিল, ব্যবসায়ীদের বেলা তা বারণ নয়?

কিছুই বারণ নয়, কারণ এটাই বিশ্বব্যাঙ্ক-আইএমএফের ‘উন্নয়নের’ ছক। রাষ্ট্র জনগণের ভালোমন্দ নিয়ে বেশি না ভেবে তা ব্যবসাদারদের ওপর ছেড়ে দিক। আর ব্যবসায়ীরা যে সব কিছুতেই একটু-আধটু মুনাফা করবে, সেটা তো স্বাভাবিক বলেই ধরে নিতে হবে। আরও মজার বিষয় হল, বিনা পয়সায় কিছুই দেওয়া যাবে না, এই নীতিটা একবার প্রতিষ্টিত হয়ে গেলে এ বার সরকারকেও সেই পথেই হাঁটতে হবে।

তাই বোধহয় বছর দুয়েক হল পশ্চিমবঙ্গ সরকারও ওয়াটার এটিএম বসাতে শুরু করেছে। জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, মালদা, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, নদীয়া, বর্ধমান, বাঁকুড়া এবং দুই ২৪-পরগনায় কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। কিন্তু কেন জানি না, ২০১৫ সালের ৩০ আগস্ট দক্ষিণ কলকাতায় প্রথম জলযন্ত্রটির উদ্বোধন করতে গিয়ে রাজ্যের জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতরের মন্ত্রী বলেছিলেন, এই প্রকল্পটিও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিন্তাপ্রসূত। হাসপাতালে নিখরচায় স্বাস্থ্য পরিষেবা চালু করে, কম দামে ওষুধের দোকান খুলে কল্যাণমুখী উন্নয়নের যে প্রতিমা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী, তার সঙ্গে কি এই মডেলটা মেলে?

 

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here