Battle of Siramani

ওয়েবডেস্ক: ১৯৭১ সালের ভারত-পাক যুদ্ধ। ‘দ্য ট্রিবিউন’-এ ১৫-১৬ ডিসেম্বরের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার এইচ এস লাম্বা। তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশের খুলনা সেক্টরে ভারত-পাকিস্তানের লড়াই চলছিল। পাকিস্তানের ৯ ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের সঙ্গে ভারতের ৯ ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের লড়াই। মেজর জেনারেল দলবীর সিং-এর নেতৃত্বে লড়াই করেছিল ভারতীয় সশস্ত্রবাহিনী। অবশেষে পাকিস্তান সৈন্য কৌশলী চালে যশোর থেকে সরে এসেছে এবং খুলনা সেক্টরে শিরোমণিকে রক্ষা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতীয় সেনারা তিন বার তিনটি ব্যাটেলিয়ন পাঠিয়ে শিরোমণি দখলের চেষ্টা করেছে। কিন্তু পরিণামে এসেছে মৃত্যু আর ক্ষয়ক্ষতি।

ব্রিগেডিয়ার এইচ এস লাম্বার ভাষায় সে দিনের কাহিনি – “জেনারেল অফিসার কমান্ডিং শেষ পর্যন্ত ১৩ ডোগরা বাহিনীকে দিনের আলোয় আক্রমণ চালানোর নির্দেশ দিলেন। পুরো আর্টিলারি ডিভিশন (গোলন্দাজ বাহিনী) তাদের মদত দেবে। ১৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ১৩ ডোগরার কমান্ডিং অফিসার (সিও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল নায়ার ‘ও’ গ্রুপকে একটা ভাঙাচোরা কুঁড়েঘরে ডাকলেন। ভৈরব নদী আর লক্ষ্যবস্তুর মাঝে সড়ক তথা রেললাইন বরাবর যে জায়গা, সেখানে শেষ ৪০০ গজ জায়গা ছাড়া বাকি সবটাই ঘন জঙ্গল। লক্ষ্যবস্তু দেখা যাচ্ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে সিও নির্দেশ জারি করার ব্যাপারে নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করলেন। আমি তখন সিনিয়ার কোম্পানি কমান্ডার। আমি সিওকে আশ্বস্ত করে বললাম, কোনো নির্দেশের দরকার নেই। কারণ শত্রুরা অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে এবং তখনই লক্ষ্যবস্তু স্পষ্ট হয়ে যাবে। আমি তাঁকে এ-ও পরামর্শ দিলাম যে আমাদের এই অভিযানের সাফল্যের কোড হওয়া উচিত ‘ফাকিয়ন’।

ব্রিগেডিয়ার লাম্বার ভাষায়, “১৬ তারিখ সকাল সাড়ে ৯টা। সেনার যে বাহিনী আঘাত হানবে তারা এফইউপি (ফরমিং আপ প্লেস) ছেড়ে এগিয়ে গেল। বাঁ দিকে আলফা কোম্পানি (আমার কোম্পানি) এবং ডান দিকে চার্লি কোম্পানি। ব্রাভো আর ডেল্টা থাকল রিজার্ভ হিসাবে। জঙ্গুলে জায়গাটা ছেড়ে বেরিয়ে এসে বাহিনী ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ল। আর্টিলারি ডিভিশনের মদত সুনিশ্চিত থাকলেও তাঁদের একটা গোলাও সে দিন নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছোয়নি। দিনের আলোয় শত্রুপক্ষ কমান্ডারদের লক্ষ করে যথেচ্ছ আক্রমণ চালায়। ফলে হতাহত হয়। আমাদের প্রায় প্রতিটি পদক্ষেপই ব্যর্থ হচ্ছিল। সব সময় কেউ না কেউ পড়ে যাচ্ছে, হয় আহত হচ্ছে, আর না হয় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। আর আমরা দেখছি।”

সে দিনের ঘটনা লিখেছেন ব্রিগেডিয়ার লাম্বা – “আমার গলার নীচের অংশে গুলি লাগল। আমিই প্রথম আহত হলাম, তবে সৌভাগ্যবশত অক্ষম হয়ে পড়িনি। চোখের সামনে নিহত হলেন ক্যাপ্টেন কুলকার্নি। আর্টিলারির কাছ থেকে কেন ঠিকমতো সাহায্য পাচ্ছি না, সেটাই যখন ফরোয়ার্ড অবজারভেশন অফিসার ক্যাপ্টেন কুলকার্নিকে চিৎকার করে বলছি, ঠিক তখন শত্রুশিবিরের মেশিনগান থেকে গুলি এসে লাগে ক্যাপ্টেনের থাইয়ে। তিনি পড়ে গেলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু। রেডিওর মাধ্যমে সিও-র সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি জানান, পরিকল্পনামাফিক শত্রুদের ওপর গোলাবর্ষণ করা হচ্ছে, কিন্তু তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে যেখানে ৪ শিখ বাহিনীর জওয়ানরা আছে, সেখানে পড়ছে, ফলে তারা এগোতে পারছে না। আমি তাঁদের পরামর্শ দিলাম দিক পরিবর্তনের। বললাম, সড়ক আর রেললাইনের পুব দিকে গোলা ফেলতে যাতে অগ্রবর্তী সেনারা ঠিকমতো কভার পায়। ঠিক সেই সময় ক্যাপ্টেন টিক্কাম নামে এক জন প্লেটুন কমান্ডার আহত হলেন। কিন্তু সমস্ত বাধা উপেক্ষা করে সাহসী ডোগরারা এগিয়ে চলল।”

“এত হতাহত দেখে একটা সময় মনে হচ্ছিল সে দিনের মতো আক্রমণ পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে হবে। যখন এই ভাবনা চলছে মনের মধ্যে ঠিক সেই সময়  নায়েব সুবেদার রোশন আর মূলরাজ আমাদের উৎসাহিত করে তুললেন। আমি আরও বাহিনী চাইলাম। সেই সময় মেজর ভোলা, যিনি ব্রাভো কোম্পানির কম্যান্ডার ছিলেন, জঙ্গুলে জায়গা থেকে বেরিয়ে এলেন আর গুলি লেগে সঙ্গে সঙ্গে মারা গেলেন।”

শেষ পর্যন্ত জয় এল কী ভাবে? ব্রিগেডিয়ার লাম্বার ভাষায়, “ব্রাভো কোম্পানিকে আমার কাছে পাওয়া সমস্যার হয়নি। সেটা সম্ভব হয়েছিল কোম্পানির সিনিয়ার জেসিও সাব বুধি সিং-এর জন্য। তাঁকে বাধাই দিতেই হয়। তিনি অসম সাহসিকতা আর বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে তাঁর সেনানিদের আমার কোম্পানির কাছে নিয়ে এলেন। ইতিমধ্যে আমার ডান দিকে যে চার্লি কোম্পানি ছিল তারা শত্রুশিবিরের চাপে আরও ডান দিকে সরে গিয়েছে। কিন্তু ব্রাভো কোম্পানির সৈনিকরা আমাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার পর আমরা চূড়ান্ত আঘাত হানলাম এবং শত্রুদের লোকালিটি গুঁড়িয়ে দিতে লাগলাম। পাশাপাশি চার্লি আর ডেল্টা কোম্পানির সেনারা উত্তর দিক থেকে শত্রুদের লোকালিটির ওপর হামলা চালাল। ক্যাপ্টেন তারা সিং যে অসামান্য সাহস আর বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন তার প্রশংসা করতেই হয়। শেষ পর্যন্ত ব্যাটেলিয়ন সদর দফতরে সাফল্যের সিগন্যাল ‘ফাকিয়ান’ রেডিওর মাধ্যমে আমি পৌঁছে দিলাম। সাফল্যের আলো জ্বলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে জেনারেল অফিসার কমান্ডিং মেজর জেনারেল দলবীর সিং আমাদের কাছে এসে পৌঁছোন। আমাকে তাঁর জিপে করে নিয়ে গেলেন। সেখান থেকে যশোর হয়ে এলাম ব্যারাকপুরের সেনা হাসপাতালে। সে দিনের যুদ্ধে ১৩ ডোগরা বাহিনী পাকিস্তানি বাহিনীর চার অফিসার, এক জন  জেসিও ও ১৮ জন আরও-কে বন্দি করে। আর প্রচুর অস্ত্র ও গোলাবারুদ আটক করা হয়। ওই ব্যাটেলিয়নকে সম্মানসূচক শিরোমণি দেওয়া হয়েছিল।”

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here