convent of jesus and mary

নিজস্ব সংবাদদাতা, কৃষ্ণনগর: রানাঘাটের সত্তরোর্ধ্ব সিস্টারকে ধর্ষণ মামলায় দোষী সাব্যস্ত হল ছয় দুষ্কৃতীকে মঙ্গলবার দোষী সাব্যস্ত করেন বিচারক। এদের মধ্যে এক জন ডাকাতি ও ধর্ষণের দায়ে, চার জন ডাকাতির দায়ে এবং এক জন অপরাধের ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। বুধবার সাজা ঘোষণা।

আড়াই বছর আগের এক অভিশপ্ত রাত আতঙ্ক ডেকে এনেছিল রানাঘাট শহর লাগোয়া ডনবস্কো পাড়ায়। কনভেন্ট স্কুলে দুষ্কৃতীদের লুটপাট এবং সত্তরোর্ধ্ব সিস্টারকে ধর্ষণের ঘটনা তোলপাড় ফেলেছিল গোটা রাজ্যে। ছুটে এসেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রানাঘাট মহকুমা হাসপাতালে ভর্তি নির্যাতিতা সিস্টারকে দেখে এসে তিনি দোষীদের কঠোর শাস্তির আশ্বাস দিয়েছিলেন। জাতীয় সড়কে মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ি আটকে বিক্ষোভের ঘটনাও ঘটে। সে দিনের ঘটনার কয়েক মাসের মধ্যেই ছয় দুষ্কৃতীকে গ্রেফতার করে সিআইডি। একজন এখনও পলাতক। সেই মামলার রায় ঘোষণা হল মঙ্গলবার কলকাতার নগর দায়রা আদালতে।

ছয় জনের মধ্যে শুধু নজরুল ইসলাম ওরফে নজুকে ডাকাতির পাশাপাশি বৃদ্ধা সিস্টারকে ধর্ষণের ঘটনায় দোষী করা হয়েছে। বাকিদের  মধ্যে ওহিদুল ইসলাম ওরফে বাবু, খালেদার রহমান মিন্টু ওরফে ফারুক, মিলন সরকার, সেলিম শেখকে ডাকাতির ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত করেছেন বিচারক।

আদালতের পর্যবেক্ষণ ঘটনাটি গণধর্ষণ নয়। ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন বৃদ্ধা। আর তাতে যুক্ত ছিল নজু একাই। রাত দু’টো থেকে ভোর পাচটা পর্যন্ত কনভেন্টে তাণ্ডব চালায় দুষ্কৃতীরা। গোপাল সরকার বাদে বাকিরা বাংলাদেশের বাসিন্দা এবং সেখানকার কুখ্যাত দুষ্কৃতী। কনভেন্ট কাণ্ডের দিন কয়েক আগে তারা এ দেশে আসে। হাবড়ার বাসিন্দা গোপালের এক আত্মীয়ের বিয়ে উপলক্ষে তারা গোপালের বাড়িতে জড়ো হয়। সেখানেই ষড়যন্ত্র রচিত হয়। শুধু এ ক্ষেত্রেই নয়, গোপাল এর আগেও বিভিন্ন দুষ্কৃতীকে তার বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছে বলে তদন্তে উঠে আসে।

দোষীদের কঠোর সাজা চাইছে গোটা ডনবস্কো পাড়া। এখানকার বাসিন্দা কাকলী বিশ্বাস বলেন, “সে দিনের অভিজ্ঞতা ছিল ভয়ংকর। ভোরবেলায় খবরটা কানে আসে। ট্রমা কাটিয়ে উঠতে আমাদের বহু দিন লেগেছে। সভ্য সমাজের কেউই এই ঘটনা মেনে নিতে পারবে না। দোষীদের কঠোর সাজা হোক, যাবজ্জীবন বা ফাঁসি।” একই এলাকার বাসিন্দা লীনা ডিরোজা, লতা বিশ্বাসদের কথায়, “মানুষ যে এত নীচে নামতে পারে তা ভাবিনি। এদের সর্বোচ্চ সাজা হোক। তা ফাঁসি হোক বা যাবজ্জীবন, যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের অপরাধ করার আগে মানুষ ভাবে।”

বৈদ্যপুর ২ গ্রাম পঞ্চায়েত সেই সময় ছিল গাংনাপুর থানার অধীনে। ২০১৫ সালের ১৩ মার্চ রাতে সেখানকার ডনবস্কো পাড়ার একটি কনভেন্ট স্কুলে হানা দেয় দুষ্কৃতীরা। সেখানে উপস্থিত তিন সন্ন্যাসিনী এবং নৈশপ্রহরীকে হাত পা বেঁধে একটি ঘরে আটকে রাখে দুষ্কৃতীরা। লুট করা হয় ১১ লক্ষ টাকা, ল্যাপটপ, ক্যামেরা, মোবাইল, গহনা-সহ নানা মূল্যবান জিনিস। লুটপাটের পাশাপাশি সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধা সিস্টারকে ধর্ষণ করা হয়। গাংনাপুর থানায় অভিযোগ দায়ের করেন স্কুলের অধ্যক্ষা সিস্টার পি মেরী শান্তি। এই ঘটনার মাস দেড়েক পরে বৈদ্যপুর ২ গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে আসা হয় রানাঘাট থানার অধীনে।

ঘটনার পরের দিনই তদন্তের দায়িত্বভার সিআইডির হাতে তুলে দেন মুখ্যমন্ত্রী। স্কুলের সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়েছিল অপরাধীদের ছবি। দুষ্কৃতীদের ছবি এবং স্কেচ প্রকাশ করা হয় তদন্তকারীদের তরফে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ, উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান, মেডিক্যাল রিপোর্ট সহ নানা তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে সিআইডি। ঘটনার সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে অবশ্য সাফল্য পায় সিআইডি। সেই বছরেরই ২৬ মার্চ মুম্বই থেকে প্রথম গ্রেফতার হয় সেলিম শেখ। ২৭ মার্চ হাবড়া থেকে গ্রেফতার হয় গোপাল সরকার। ২৩ এপ্রিল বনগাঁ স্টেশন থেকে খালেদার রহমান মিন্টু ওরফে ফারুক গ্রেফতার হয় সিআইডির হাতে। ৮ মে শিয়ালদহ স্টেশন থেকে গ্রেফতার হয় মিলন সরকার এবং অহিদুল ইসলাম ওরফে বাবু। ১৮ জুন গ্রেফতার হয় নজরুল ইসলাম ওরফে নজু। ঘটনার প্রায় তিন মাস পরে ২০১৫ সালের ২০ জুন রানাঘাট মহকুমা আদালতে নজু বাদে বাকি পাঁচ জনের নামে ৯৯৫ পাতার চার্জশিট পেশ করে সিআইডি। মাস তিনেক পরে ১১ সেপ্টেম্বর আরও ১৪৫ পাতার সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিট জমা দেয় সিআইডি। তাতে নজুর নাম ছিল। পরে অভিযোগকারিণীর তরফে মামলাটি রানাঘাট মহকুমা আদালত থেকে অন্য আদালতে স্থানান্তরিত করার আবেদন জানানো হয়।

২০১৬ সালের ২৮ জানুয়ারি কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি শিবসাধন সাধু নিম্ন আদালতে মামলার যাবতীয় প্রক্রিয়ার ওপর স্থগিতাদেশ দেন। ২০১৬-এর ফেব্রুয়ারি মাসে রানাঘাট মহকুমা আদালতে এই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের কাজ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা স্থগিত হয়ে যায় সেই সময়। পরে এই মামলা কলকাতার নগর দায়রা আদালতে স্থানান্তরিত হয়। ২০১৬ সালের মে মাস থেকে কলকাতা নগর দায়রা আদালতে এই মামলা চলে।

কনভেন্ট কাণ্ড ঘিরে এক সময়ে তোলপাড় হয়েছে রাজ্য। মোমবাতি মিছিল থেকে শুরু করে রাস্তা, রেল অবরোধ করে বিক্ষোভে শামিল হয়েছে পড়ুয়া থেকে অভিভাবক, দোষীদের শাস্তির দাবিতে। তবে সেই সময়ে তাদের আন্দোলনের মধ্যে কোনো রাজনৈতিক দলের অনুপ্রবেশ ঘটতে দেননি বাসিন্দারা। ফিরিয়ে দিয়েছেন একের পর এক রাজনৈতিক নেতাদের। রাজনৈতিক দল ও নেতাদের বাইরে রেখেই অরাজনৈতিক ভাবে চলেছে তাদের আন্দোলন। রাজনীতিকে ‘না’ বলে দিয়ে আক্ষরিক অর্থেই সে দিন এক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিল ডনবস্কো পাড়া। এ বার দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাইছেন তারা।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here