karimul showing the board which declares the stock position of blood
বোর্ডে লেখা রয়েছে রক্ত মজুত, দেখাচ্ছেন করিমুল।

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি: মানুষের প্রাণ বাঁচানোটাই নিজের জীবনের লক্ষ্য করে তুলেছিলেন। কারও অসুস্থতার খবর পেলেই নিজের বাইক-অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ছুটে যান প্রত্যন্ত এলাকার আনাচে-কানাচে। সাধারণ মানুষের কাছে শুধু নয়, তাঁর লড়াই কুর্নিশ আদায় করে নিয়েছিল রাষ্ট্রেরও। পেয়েছেন ‘পদ্মশ্রী’ সন্মান। অথচ আজ সেই করিমুল হক জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে অপদস্থ। নিজের মেয়ের চিকিৎসা করাতে এসে হয়রানির শিকার ‘পদ্মশ্রী’ পিতা। অভিযোগ জলপাইগুড়ি জেলা হাসপাতালের ব্লাড ব্যাঙ্কের বিরুদ্ধে।

শনিবার সকালে তাঁর গর্ভবতী কন্যা সিমু বেগম পড়ে গিয়ে জখম হন। তাঁকে জলপাইগুড়ি জেলা হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থা ভর্তি করা হয়। তখনই তাঁকে এক বোতল রক্ত দেওয়া হয়। কিন্তু প্রচুর রক্তক্ষরণ হওয়ায় আরও রক্তের দরকার, জানিয়ে দেন চিকিৎসক।

করিমুল বিকেলে হাসপাতালের ব্লাড ব্যাঙ্কে যান রক্তের জন্য। কিন্তু ব্লাড ব্যাঙ্কের কর্মীরা তাঁকে জানিয়ে দেন ‘ও+’ গ্রুপের রক্ত নেই। যদিও ব্লাড ব্যাঙ্কের বোর্ডে লেখা রয়েছে তিন বোতল ‘ও+’ রক্ত মজুত। করিমুল সেই প্রশ্ন তুললে ব্লাড ব্যাঙ্কের দুই কর্মী তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন বলে তাঁর অভিযোগ। করিমুল জানিয়েছেন, তিনি নিজের পরিচয় দিলে তাঁর সমাজসেবার কাজকর্ম নিয়ে ব্যাঙ্গবিদ্রুপ করা হয়। ঘটনায় ব্যথিত এবং মর্মাহত করিমুল জানিয়েছেন, জেলা স্বাস্থ্য দফতরে ঘটনা নিয়ে অভিযোগ জানাবেন তিনি।

জলপাইগুড়ি জেলার মালবাজার মহকুমার যে সব প্রত্যন্ত এলাকায় স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রায় অমিল, সেখানে একমাত্র ভরসা ক্রান্তির বাসিন্দা, ছোটো একটি চা বাগানের কর্মী করিমুল। দিন হোক বা রাত, ডাক পেলে তিনি তাঁর বাইক-অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে কখনও জলপাইগুড়ি জেলা হাসপাতালে, কখনও বা উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজে পৌছে দেন রোগীকে, কোনো আর্থিক পারিশ্রমিক ছাড়াই। জেলা স্বাস্থ্য দফতর তাঁর কাজেকর্ম সম্পর্কে ভালোমতোই ওয়াকিবহাল। চিকিৎসকমহলে তাঁর নিবিড় যোগাযোগ। গত দশ বছর ধরে নিরলস সমাজসেবার পুরস্কার হিসেবে রাষ্ট্রপতির হাত থেকে ‘পদ্মশ্রী’ সন্মানে ভূষিত হয়েছেন গত মার্চ মাসে।

karimul dismayed
ক্ষুব্ধ করিমুল।

অথচ নিজের মেয়ের চিকিৎসা করাতে এসে যে ভাবে হয়রানির শিকার হলেন, তা মেনে নিতে পারছেন না অনেকেই। ঘটনা শুনে ক্ষুদ্ধ জলপাইগুড়ির যুব তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অজয় সাঁ জানিয়েছেন, করিমুল হকের মতো এক জন মানুষের সঙ্গে যদি এই ঘটনা ঘটে তা হলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কী আচরণ হয় তা বোঝাই যায়। তাঁর অভিযোগ, রাজ্য সরকার স্বাস্থ্যব্যবস্থায় উন্নতির চেষ্টা করলেও, কিছু স্বাস্থ্যকর্মীর আচরণের জন্য তা কালিমালিপ্ত হয়। ঘটনা শোনার পর অজয়বাবুই এক জন ‘ডোনার’কে পাঠিয়ে করিমুল হকের মেয়ের জন্য রক্তের ব্যবস্থা করেন।

তবে ঘটনায় নিজেদের দোষ অস্বীকার করে ব্লাড ব্যাঙ্কের এক কর্মী তন্দ্রা দত্ত জানিয়েছেন, কোনো ব্যাঙ্গবিদ্রুপ বা দুর্ব্যবহার করা হয়নি। তাঁর দাবি, সকালে ‘ও+’ রক্ত থাকলেও তা শেষ হয়ে যায়। বোর্ডে সেই ‘আপডেট’ দেওয়া হয়নি। যদিও সেই আপডেট দেওয়ার দায়িত্ব কার সেই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি ব্লাড ব্যাঙ্কের কর্মীরা।

ঘটনার কথা কানে গিয়েছে জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক জগন্নাথ সরকারের। তিনি জানিয়েছেন, খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর জলপাইগুড়ির তৃণমূল সাংসদ তথা হাসপাতালের রোগী কল্যাণ সমিতির চেয়ারম্যান বিজয় চন্দ্র বর্মণ জানিয়েছেন, এই ঘটনা ঘটে থাকলে তা খুবই দুঃখজনক। তিনি করিমুলের সঙ্গে এই নিয়ে কথা বলে ব্যবস্থা নেবেন বলে জানিয়েছেন।

ব্লাড ব্যাঙ্কের বোর্ডে স্পষ্ট ভাবে রক্ত মজুতের কথা লেখা থাকলেও রোগীর পরিবারকে তা দেওয়া হচ্ছে না, তা হলে সেই রক্তের ব্যাগ যাচ্ছে কোথায়, প্রশ্ন তুলেছেন করিমুল হক। এমনিতেই ব্লাড ব্যাঙ্কগুলিতে দালাল চক্রের অভিযোগ প্রায়ই ওঠে। করিমুলবাবুর দাবি, ঘটনার তদন্ত করুক স্বাস্থ্য দফতর।

গত কালই শিবির করে এই ব্লাড ব্যাঙ্কেই ১৬ ইউনিট রক্ত দিয়েছিলেন করিমুল হক। আরও দু’টি রক্তদান শিবিরের আয়োজন করার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। কিন্তু আজকের ঘটনার পর করিমুল হক নিজেই প্রশ্ন তুলেছেন, কেন করবেন এই কাজ, যার উপকার সাধারণ মানুষ পাবে কি না তা নিয়েই যখন প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here