rasagolla
srila pramanik
শ্রীলা প্রামাণিক

ওড়িশা নয়, এই বাংলার রানাঘাটে প্রথম তৈরি হয়েছিল রসগোল্লা। এই দাবি উঠেছিল আগেই। এ বার বাংলার রসগোল্লার জিআই প্রাপ্তিতে নিজেদেরই জয় দেখছে রানাঘাট। কারণ আর কিছুই নয় ওড়িশা দাবি তোলার সময় থেকেই রসগোল্লার আবিষ্কারের কৃতিত্ব নিয়ে দাবি জানিয়ে এসেছে পানতুয়ার শহরও।

যখন বাংলা ও ওড়িশার মধ্যে রসগোল্লার দাবি নিয়ে দড়ি টানাটানি শুরু হয় সেই সময় বছর দুয়েক আগে রানাঘাটের পুরপ্রধান এবং রানাঘাট উত্তর পশ্চিমের তৎকালীন বিধায়ক পার্থসারথি চট্টোপাধ্যায় রাজ্যের তৎকালীন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী রবিরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়ের হাতে এই সংক্রান্ত প্রামান্য নথিপত্র তুলে দিয়ে আসেন। সেই নথি অনুযায়ী দাবি করা হয় ১৮৪৬ থেকে ১৮৫৬ সালের মধ্যে রসগোল্লার আবিষ্কার হয় রানাঘাটের পালচৌধুরী জমিদারবাড়ির ময়রা ফুলিয়ার বাসিন্দা হারাধন মণ্ডলের হাতে।

কথিত আছে, রানাঘাটের পালচৌধুরী জমিদারবাড়ির মিষ্টি তৈরি করতেন ফুলিয়ার হারাধন মণ্ডল। সেই সময়ে পালচৌধুরী জমিদারবাড়িতে প্রায় নিয়মিত ভিয়েন বসত। সেখানে গিয়েই মিষ্টি তৈরি করতেন তিনি। এক দিন তিনি জমিদারবাড়িতে মিষ্টি তৈরির সময়ে তাঁর শিশুকন্যাকে (মতান্তরে পুত্র) সঙ্গে নিয়ে যান। যখন মিষ্টি তৈরি করছিলেন তখন তাঁর সেই শিশু কান্নাকাটি শুরু করে। তাকে ভোলাতে হাতের ছানার তাল গোল্লা পাকিয়ে রসে ফেলে দেন হারাধন। কিছু সময়ের মধ্যে সেটি একটি মিষ্টির আকার নেয়। তা হাতে খুশি হয় শিশুটিও। তার কান্না থামে।  এ বার এই মিষ্টি হারাধন দেখান জমিদারবাড়ির সদস্যদের। সেখানে জমিদার বংশের তৎকালীন পুরুষ শ্রীগোপাল পালচৌধুরী এর স্বাদ ও আকারে মুগ্ধ হন। তিনিই এর নাম রসগোল্লা রাখেন বলে কথিত। এ ভাবেই রসগোল্লার উৎপত্তি বলে কথিত।

textual proofইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ইন্দ্রনাথ গ্রন্থাবলী, ক্ষিতিমোহন ঠাকুরের লুচি তরকারী প্রবন্ধ, মোহিত রায় সম্পাদিত কুমুদনাথ মল্লিকের লেখা নদিয়া কাহিনী, প্রণব রায়ের লেখা বাংলার খাবার, তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা উনিশ শতকের রানাঘাট প্রভৃতি রচনা ও পুস্তকে বিভিন্ন সময়ে উঠে এসেছে নদিয়ার রানাঘাট থেকে রসগোল্লার উৎপত্তির কথা। এ ছাড়াও সর্বশিক্ষা অভিযানের তরফে প্রকাশিত নদিয়ার ইতিবৃত্ত, নানা এনসাইক্লোপিডিয়া ও উইকিপিডিয়া থেকে প্রাপ্ত তথ্যে তার স্পষ্ট উল্লেখ আছে বলেই দাবি করে মন্ত্রীর হাতে তথ্য তুলে দেওয়া হয়েছিল।

আরও পড়ুন: মিলল জিআই স্বীকৃতি, ওড়িশা নয়, রসগোল্লার জনক বাংলাই

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, “সেকালের খ্যাতনামা লেখক পঞ্চানন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, কৃত্তিবাসের জন্মস্থান ফুলিয়া গ্রামে রসগোল্লার জন্মভূমি। ঐ গ্রামের হারাধন ময়রা রানাঘাটের পালচৌধুরী মহাশয়দের মিষ্টি প্রস্তুত করিত। তাহার শিশু কন্যা কাঁদিতেছিল। তাহাকে সান্ত্বনার জন্য উনানের ওপর তৈয়ারি রসে ছেনা ফেলিয়া দেখিল উৎকৃষ্ট সামগ্রী তৈয়ার হইয়াছে। পালচৌধুরী জমিদারেরা উহার রসগোল্লা নামকরণ করেন। ”

উনিশ শতকের রানাঘাট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করে আসছেন এবং নানা বইও লিখেছেন রানাঘাটের বাসিন্দা ইতিহাসবিদ ড: তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “রানাঘাট নিয়ে গবেষণার সময়ে নানা তথ্য সংগ্রহ করেছিলাম। তার থেকে যতটা জানতে পারি রানাঘাটের জমিদারবাড়ির মিষ্টি প্রস্তুত কারক হারাধন মণ্ডল ১৮৫০ থেকে ১৮৬০ সালের মধ্যে এই রসগোল্লা তৈরি করেন প্রথমবারের জন্য। পরে অবশ্য হারাধন মণ্ডল কলকাতা চলে যান। রসগোল্লার সৃষ্টি এই রানাঘাটেই।” তাপসবাবু বলেন, “হারাধন মণ্ডলের তৈরি করা রসগোল্লার আকার অবশ্য এখনকার মতো এতটা নিখুঁত গোলাকার ছিল না। তা অনেকটাই এবড়োখেবড়ো ছিল। পরবর্তী কালে তাকে আজকের আকার দেন নবীন ময়রা।”

আরও পড়ুন: রসগোল্লার জন্মভূমি নিয়ে বাংলা, ওড়িশার লড়াই গড়াতে পারে আদালতে

রসগোল্লার ওপরে বাংলার দাবি জানানোর সময়ে রানাঘাটের পুরপ্রধান পার্থসারথি চট্টোপাধ্যায় যাবতীয় তথ্য তুলে দিয়ে এসেছেন মন্ত্রীর হাতে। আজ রসগোল্লার স্বীকৃতিতে পুরপ্রধানের সঙ্গে খুশি গোটা রানাঘাট। রানাঘাটের পুরপ্রধান পার্থসারথি চট্টোপাধ্যায় বলেন, “এই স্বীকৃতি গোটা রাজ্যের কাছে অত্যন্ত গর্বের। এক সময় আমি রাজ্যের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রীর হাতে আমাদের দাবির স্বপক্ষে যাবতীয় তথ্য তুলে দিয়ে এসেছিলাম। বহু লড়াইয়ের পর আজ সেই স্বীকৃতি মিলল। আমরা খুশি।”

বুধবার তাই বৃষ্টি ভিজেই উৎসবে মাতল রানাঘাট। রানাঘাট স্বাধীনতা দিবস উদযাপন কমিটির তরফে এ দিন রসগোল্লার জয়কে স্মরণীয় করে রাখতে স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে দোকানি, পথচলতি মানুষ, সকলকে রসগোল্লা খাইয়ে মিষ্টিমুখ করানো হল। উদ্যোক্তা এবং রানাঘাটের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার কোশলদেব বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “রসগোল্লার জন্ম যে এই রাজ্যের রানাঘাটে জমিদারবাড়ির ময়রার হাতে, সেই দাবি আমরা আগে থেকেই করে এসেছি। এই স্বীকৃতি রানাঘাটেরও জয়। এর সঙ্গে জুড়ে আছে রানাঘাটের নাম।”

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here