state bank of india
nilanjan dutta
নীলাঞ্জন দত্ত

ধরুন, আমি কোনো অপরাধ করলাম। ধরাও পড়লাম। কিন্তু চট করে জামিন পেয়ে গেলাম। আর জামিনের টাকাটা দিয়ে দিল সরকার।

বলবেন, তা আবার হয় নাকি? কিন্তু আমরা চোখের সামনে তো তা-ই হতে দেখলাম। আর দেখেও কিছু বললাম না।

২৪ অক্টোবর কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষণা করল, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলোকে ২,১১,০০০ কোটি টাকা দেওয়া হবে তাদের পুঁজির ঝুলি বাড়ানোর জন্য। এর বেশির ভাগটা দেওয়া হবে ব্যাঙ্কগুলোর শেয়ার সরকার থেকে কিনে নিয়ে। শুনেই ব্যবসায়ীদের গায়ে পুলক লাগল, শেয়ার বাজারের থার্মোমিটার ‘সেনসেক্স’ হু হু করে চড়তে শুরু করল। তার পর থেকে টিভি আর খবরের কাগজে লাগাতার চর্চা চলেছে, এতে দেশের অর্থনীতি কতখানি চাঙ্গা হয়ে উঠবে তা-ই নিয়ে।

কিন্তু আমরা মুখ্যু মানুষ প্রশ্ন করতেই পারি, ব্যাঙ্কের কাছেই তো বিস্তর টাকা থাকে, তাদের আবার টাকা দেওয়া কেন? ব্যাঙ্কের ভাঁড়ারে টাকা কি কম পড়িয়াছিল? তা-ই যদি হয়, তবে আর একটা প্রশ্ন – কী ভাবে কম পড়িল?

আমতা আমতা করে জবাব আসছে – আসলে, ব্যাঙ্কগুলোর হাতে টাকা ছিল বটে, কিন্তু তার অনেকটাই ‘নন-পারফর্মিং অ্যাসেট’ বা নিষ্কর্মা সম্পদ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই জিনিসটা কী? ব্যাঙ্কে আমরা যে টাকা রাখি, তার ওপর ব্যাঙ্ক আমাদের সুদ দেয়। কী ভাবে দেয়? তারা আমাদের টাকাগুলো বাজারে খাটায়। মানে, লোককে ধার দেয়। কিছু লোক ধার নেয় গাড়ি, বাড়ি, ইত্যাদি কেনার জন্য, এমনকি পড়াশোনা করার জন্যও। আরও কিছু লোক ধার নিয়ে ব্যবসা করে। কিন্তু ব্যক্তিগত প্রয়োজনে বা ছোটোখাটো ব্যবসার জন্য যে ধার নেওয়া হয়, তার সবটাকে একসঙ্গে ধরলেও পরিমাণটা খুব বেশি হবে না। এর থেকে অনেক বেশি নেয় বড়ো বড়ো শিল্পপতিরা। তার অঙ্কটা যে কত বেশি, তা আমাদের ধারণাতেও আসবে না। এখন এই রকম ঢাউস ঢাউস ধার যদি শোধ না দেওয়া হয়, তা হলে বেচারা ব্যাঙ্ক সত্যিই খুব বেকায়দায় পড়ে। আমাদের মতো লোকের কাছ থেকে না হয় গলায় গামছা দিয়ে টাকা আদায় করা যায়, কিন্তু অত বড়ো বড়ো কোম্পানির কাছ থেকে তো যায় না। তাদের মালিকদের ওপর মহলে কত যোগাযোগ, ভোটের আগে কত টাকাই না তারা পার্টিগুলোকে ‘চাঁদা’ দেয়! তাদের দেওয়া ধার ফেরত পাওয়ার আশা যখন দূরাশা হয়ে যায়, তখনই তা ‘নন-পারফর্মিং অ্যাসেটে’ পরিণত হয়।

আপনি ব্যাঙ্কে টাকা জমা রেখেছিলেন। ব্যাঙ্ক আপনার টাকার ওপর সুদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেই টাকা কোম্পানিদের ধার দিয়েছিল। বড়ো বড়ো কোম্পানিরা তা শোধ দিল না। ব্যাঙ্ককে বাঁচাতে সরকার তাদের টাকা দেবে বলে ঘোষণা করল। সরকারের টাকা মানে কী? আপনাদের ট্যাক্সের টাকা। ব্যাঙ্ক আবার সেই টাকা ‘ধার’ দেবে ব্যবসায়ীদের। যাদের তা শোধ না দিলে কোনো শাস্তি হবে না। লাগে জামিন, দেবে সরকার। আপনাদেরই কাছ থেকে নিয়ে।

জুন মাসে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছিলেন, এই সব বেয়াড়া কোম্পানিকে সবক শেখাতে দরকার হলে তাদের দেউলিয়া ঘোষণা করে টাকা আদায় করা হবে। তা, এই রকম কত কথাই তো বলা হয়ে থাকে। আসলে কি আর তা করা যায়? এ দিকে ‘নিষ্কর্মা সম্পদ’ বাড়তে বাড়তে ইদানীং পাহাড়প্রমাণ হয়ে উঠেছিল। এমনই, যে ব্যাঙ্কের প্রকৃত পুঁজির ভিতটাই ক্ষয়ে যেতে শুরু করেছিল। কিন্তু এ রকম হলে তারা আবার শিল্পপতিদের ধার দেবে কেমন করে, আর শিল্পপতিরাই বা নতুন নতুন বিনিয়োগ করে দেশকে ‘উন্নয়নের’ পথে এগিয়ে নিয়ে যাবেন কী করে? তাই তাদের সরকার থেকে পুঁজির জোগান দেওয়ার দরকার হল।

আরও পড়ুন: সাধারণের টিউবওয়েল বন্ধ, কিন্তু মাটি থেকে জল তুলে ব্যবসা করতে বাধা নেই ব্যবসায়ীদের

অর্থনীতিবিদরা এর একটা গালভরা নাম দিয়েছেন, ‘রিক্যাপিটালাইজেশন’ বা পুঁজিপূরণ। কিন্তু আরও একটা সহজ নাম আছে। তা হল, ‘বেলআউট’ বা জামিনদারি। এই নামটা বেশি চালু হয়েছে ২০০৮ সালে আমেরিকার অর্থনৈতিক মন্দার সময় থেকে। মন্দাটা এসেছিল মূলত ‘সাবপ্রাইম মর্টগেজ’ থেকে। ব্যাঙ্কগুলো তাদের টাকা খাটানোর আতিশয্যে যারা ঋণ পাওয়ার যোগ্য নয় তাদেরও প্রচুর ঋণ দিয়ে বসেছিল। এ বার সে টাকা যখন আর ফেরত আসে না, তখন তারা ফেল পড়ার জোগাড়। বাঁচাল কে? সরকার। কী ভাবে বাঁচাল? ‘ট্রাবলড অ্যাসেট রিলিফ প্রোগ্রাম’ (টিএআরপি) নামে একটা পরিকল্পনা হল। তার মাধ্যমে প্রথমে ৭০,০০০ কোটি ডলার ব্যাঙ্কগুলোর ত্রাণে ঢালা হবে বলে ঠিক হল। পরে অবশ্য প্রেসিডেন্ট ওবামা চেয়েছিলেন যে ব্যাঙ্কের ভবিষ্যৎ ব্যবসার ওপর ট্যাক্স বসিয়ে এই টাকার অন্তত খানিকটা তুলে নেওয়া হবে। কিন্তু তিনি সংসদে সে প্রস্তাব পাস করাতে পারেননি। তার বদলে বেলআউটের টাকার পরিমাণটা কমিয়ে ৪৭,০০০ কোটি ডলার করে দেওয়া হয়।

ভারত সরকার এ বারের পরিকল্পনাটা ঘোষণা করার পরেই মার্কিন দেশের আর্থিক ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি মর্গ্যান স্ট্যানলি এক কথায় তাকে ‘ইন্ডিয়ান টিএআরপি’ বলে দিয়েছে। তার মানে, এটা আর কিছু নয়, সেই ‘বেলআউট’। মর্গ্যান স্ট্যানলি অবশ্য তাকে স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু ভেবে দেখুন, ব্যাপারটা কী দাঁড়াল।

আপনি ব্যাঙ্কে টাকা জমা রেখেছিলেন। ব্যাঙ্ক আপনার টাকার ওপর সুদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেই টাকা কোম্পানিদের ধার দিয়েছিল। বড়ো বড়ো কোম্পানিরা তা শোধ দিল না। ব্যাঙ্ককে বাঁচাতে সরকার তাদের টাকা দেবে বলে ঘোষণা করল। সরকারের টাকা মানে কী? আপনাদের ট্যাক্সের টাকা। ব্যাঙ্ক আবার সেই টাকা ‘ধার’ দেবে ব্যবসায়ীদের। যাদের তা শোধ না দিলে কোনো শাস্তি হবে না। লাগে জামিন, দেবে সরকার। আপনাদেরই কাছ থেকে নিয়ে।

আরও পড়ুন: রোহিঙ্গা: ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’-এর বার্তা ভুলে নতুন ‘ভারতীয়ত্ব’ নির্মাণের চেষ্টা কেন্দ্রের

এক বছর আগে, আপনাদের টাকাগুলো অনেক দিন ব্যাঙ্কে আটকে রাখা হয়েছিল। তার পর বেশ কিছু দিন ধরে একটু একটু করে টিপে টিপে ছাড়া হয়েছিল। আপনারা ব্যাঙ্ক আর এটিএমের সামনে হত্যে দিয়ে পড়েছিলেন। অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, একশোটিরও বেশি জীবন শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু উপায় কী? আপনাদের হাতে যে ক’টা ৫০০ আর ১,০০০ টাকার নোট ছিল, সেগুলো তো তখন ছেঁড়া কাগজ হয়ে গেছে।

আপনারা শুনেছিলেন, এটুকু কষ্ট সহ্য করলে আখেরে দেশের ভালো হবে। কালো টাকা আর থাকবে না, জাল টাকা আর তৈরি হবে না, আরও কত কী। এ বারেও শুনুন, কত লক্ষ কোটি টাকা আপনাদের হাত থেকে ব্যাঙ্কের হাত ঘুরে পুঁজিমালিকদের হাতে গেলে দেশের কতটা ‘উন্নয়ন’ হবে। আপনারা না হয় সুদ আরেকটু কমই পেলেন, ট্যাক্স আরেকটু বেশিই দিলেন।

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here