mukti khatun

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি: এ বার বাংলার ‘রোল মডেল’ মুক্তা খাতুন। রাজ্যের এক প্রত্যন্ত এলাকার এই সাধারণ তরুণী আজ নিজগুণে অনন্য-সাধারণ। তার অদম্য লড়াইকে কুর্নিশ জানিয়ে ‘রোল মডেল’ সম্মান দিচ্ছে রাজ্য সরকার। আগামী ৩ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবসে মুক্তাকে কলকাতায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামে তার হাতে রোল মডেল স্বীকৃতিপত্র তুলে দেবে নারী, শিশু ও সমাজ কল্যাণ দফতর।

তার আগে প্রতিবন্ধকতাকে হারিয়ে মুক্তার ছুটে চলাকে আরও একটু সহজ করে দিতে এগিয়ে এল জলপাইগুড়ি জেলা প্রশাসনও। একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কের সহায়তায় শুক্রবার মুক্তার হাতে তুলে দেওয়া হল ব্যাটারিচালিত বিশেষ ভাবে তৈরি একটি স্কুটি। কলেজছাত্রী মুক্তা এ বার নিজেই ছুটতে পারবে লক্ষ্যের দিকে, কারো সাহায্য ছাড়াই।

কিন্তু মুক্তার এই ছুটে চলার শুরুটা কিন্তু একবারেই সহজ ছিল না। জলপাইগুড়ি জেলার ধূপগুড়ির একেবারে প্রত্যন্ত এলাকা পশ্চিম ডাউকিমারি। সেখানকার দরিদ্র কৃষক পরিবারের বড়ো মেয়ে মুক্তা। বাবা মকবুল হোসেন কৃষক। মা জামিলা খাতুন সাধারণ গৃহবধূ। রয়েছে আরও তিন বোন, এক ভাই। দিন আনি দিন খাই পরিবারে মুক্তার বেড়ে ওঠাই ছিল দুঃসাধ্য। শারীরিক ভাবে ৮০% প্রতিবন্ধী সে। উচ্চতা মেরেকেটে আড়াই ফুট। একা চলাচল করার ক্ষমতাটুকুও নেই তার। হাতটাও ভালো ভাবে নাড়তে পারে না। জড়তা রয়েছে কথায়। কিন্তু এ সব কিছুই দমিয়ে রাখতে পারেনি তাকে। পড়াশোনার ঝোঁক ছিল ছোটোবেলা থেকেই। তাই এক দিকে আর্থিক অনটন আর এক দিকে শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের মতো এগিয়ে গিয়েছে মুক্তা।

মেয়ের অদম্য জেদে দেখে সাহস জুগিয়েছেন মা-বাবাও। সাহায্য করেছে ভাইবোনেরা। হাঁটতে পারত না, তাই সাইকেলে করে স্কুলে পৌঁছে দিত বাবা বা বোনেরা। মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিকে ভালো ফল করে এখন সে ধূপগুড়ি গার্লস কলেজের ছাত্রী। এখনও বাবা বা বোন তাকে সাইকেলে করে কলেজে দিয়ে আসেন। সে সব জানতে পেরেই স্কুটি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয় জেলা প্রশাসনের তরফে। শুক্রবার তার হাতে স্কুটি তুলে দেন জলপাইগুড়ির অতিরিক্ত জেলা শাসক সুমেধা প্রধান। স্কুটির চাবি হাতে নিয়ে খুশি উপছে পড়ছিল মুক্তার। বোনের সাহায্য নিয়ে জেলাশাসকের দফতর চত্বরেই একপাক ঘুরে নেয় স্কুটি চালিয়ে। শুধু তার বোন জিসমি পারভিনের কপট আক্ষেপ, “এখন আর দিদিকে কলেজে দিয়ে আসতে হবে না, সে একলাই ছুটতে পারবে”।

আগামী ৩ ডিসেম্বর পুরস্কার নিতে যাওয়ার জন্য মুক্তাকে শুভ কামনা জানান সেখানে উপস্থিত সকলে।

এতক্ষণ সব ঘটনাই চুপচাপ দেখছিলেন সঙ্গে আসা মুক্তার মা-বাবা। তাঁরা হয়তো ভাবছিলেন মেয়ের অতীত-ভবিষ্যৎ। কারণ চোখের সামনে তখন বর্তমান, একলা উড়ান নিতে তৈরি তাদের মেয়ে, যে বাংলার ‘রোল মডেল’। আরও অসংখ্য বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ছেলেমেয়েদের দিশা তাঁদের মেয়ে, এটা ভেবেই আপ্লুত বাবা মকবুল হোসেন। তবে মা জামিলা খাতুন এত কিছু বুঝতে চান না। তাঁর মেয়েটি এই রকমই হাসিখুশি থাকুক ভালো থাকুক, শুধু সেটাই চান।

কিছু দিন আগে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাই মুক্তার হয়ে ‘রোল মডেল’ স্বীকৃতির জন্য আবেদন জানায়। তার কর্ণধার রবিউল ইসলাম জানান, মুক্তার এই সাফল্য আগামীতে তার মতো অনেককেই উৎসাহিত করবে এগিয়ে যেতে। ‘রোল মডেল’ স্বীকৃতির পাশাপাশি মুক্তা পাবে আর্থিক পুরস্কারও।

মুক্তাও কিন্তু জানে সে আরও দশ জনের সাহস। আগামীতে তাই আরও লড়াইয়ের জন্য সে প্রস্তুত, মুক্তোর মতো হাসি ঝরিয়ে প্রত্যয়ী গলায় জানিয়েছে মুক্তা। তার স্বপ্ন আরও পড়াশোনা করে একটা সরকারি চাকরি। যাতে সংসারের দারিদ্র ঘোচাতে পারে আর তার মতো অন্যদের পাশে দাঁড়াতে পারে। সেই আত্মবিশ্বাস নিয়েই আজ বাড়ি ফিরল মুক্তা।

তৈরি হতে হবে যে।শুধু রাজ্যের নয়, জীবনের লড়াইয়ে দেশের ‘রোল মডেল’ হতে হবে তাকে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here