grief stricken karimpur
srila pramanik
শ্রীলা প্রামাণিক

রাতে তো ও আমার সাথেই ঘুমোতো। ডাক্তার দেখাতে গিয়ে যে এ ভাবে আমার ঘর খালি করে দিয়ে চলে যাবে তা যদি জানতাম তা হলে ওদের যেতে দিতাম না। বাকরুদ্ধ হয়ে আসে সরস্বতী প্রামাণিকের গলা। সোমবারের অভিশপ্ত সকাল কেড়ে নিয়েছে নদিয়ার সুন্দলপুরের সরস্বতী প্রামাণিকের ছোটো বৌমা আর নয় বছরের নাতি দেবকে।

কিছু দিন আগে এক দুর্ঘটনায় জখম হয়েছিল দেব। তার পায়ে অস্ত্রোপচার করে প্লেট বসানো হয়। ফের অস্ত্রোপচার করে সেই প্লেট বের করার কথা ছিল। সুন্দলপুর প্রাথমিক স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র দেবকে নিয়ে সোমবার ভোরের আলো ফোটার আগেই মুর্শিদাবাদের হাসপাতালে রওনা দেন তার মা রুম্পা প্রামাণিক। সাথে ছিলেন স্বামী দিবস এবং ভাসুর দীনবন্ধু এবং এলাকার হাতুড়ে চিকিৎসক সঞ্জয় সরকার। সেটাই তাদের বাড়ি থেকে শেষ বারের মতো বেরিয়ে যাওয়া। সোমবারই ফেরে মা-ছেলের নিথর দেহ । জখম হয়ে মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দিবস এবং দীনবন্ধু।

সোমবার দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ছুটে গিয়েছিলেন এলাকার বাসিন্দারা। তখনও আশা ছিল যদি জীবন্ত উদ্ধার করা যায় তাদের। তা অবশ্য হয়নি। রাতে শনাক্ত হয় মা ও ছেলের দেহ। গভীর রাতে স্থানীয় শ্মশানে তাদের দেহ সৎকার হয়। নয় বছরের দেব এলাকার সকলের কাছেই ছিল প্রিয়। শ্মশানে ভেঙে পড়ে গোটা গ্রাম। বাড়িতে সরস্বতী দেবী খুঁজে বেড়াচ্ছেন ছোট্টো নাতিকে। তাঁর কাছে গল্প না শুনে ঘুম আসত না যার। দু চোখের পাতা এক করতে পারেননি গোটা রাত।

অবশ্য জেগে কাটিয়েছে গোটা করিমপুর। সুন্দলপুর, হোগলবেরিয়া, করিমপুর – সীমান্তের জনপদে রাত নেমেছে হাহাকার সঙ্গী করেই। দুর্ঘটনায় করিমপুর এলাকার ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। সোমবারের সেই অভিশপ্ত সকালে কার্যত আঁধার নেমেছিল সীমান্তের জনপদে। দিনভর আশঙ্কায় ডুবে থাকা করিমপুর ডুকরে উঠল রাত নামতেই। একের পর এক দেহ ফিরতে শুরু করল। পরিজনের কান্না ভারী করে তুলল বাতাস। মৃত্যুমিছিলে ডুবে ততক্ষণে কাঁদতেও ভুলেছে সীমান্ত।

দেবের পরিবারের সঙ্গেই গিয়েছিলেন স্থানীয় হাতুড়ে চিকিৎসক সঞ্জয় সরকার। কয়েক বছর আগে মুর্শিদাবাদের থেকে এই সুন্দলপুরে বাস শুরু করেন তিনি। বাড়িতে আছেন স্ত্রী, দু’ বছরের ছেলে রুদ্রনীল এবং ১০ বছরের মেয়ে তৃষা। আপদে বিপদে গ্রামের বাসিন্দাদের বড়ো ভরসা ছিলেন সঞ্জয় ডাক্তার। অন্যের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। এলাকার মানুষের কাছে যাঁর পরিচয় ডাক্তার। এ দিনের দুর্ঘটনা সুন্দলপুরের মানুষের থেকে কেড়ে নিয়েছে তাদের ডাক্তারকেও। তাঁর স্ত্রী অঞ্জনা বলেন, সকালেই দুর্ঘটনার খবর পাই। তার পরও আশা ছিল মানুষটা ফিরবে। কিন্তু এ ভাবে ফিরবে তা ভাবিনি। এখন বাচ্চাদু’টোকে নিয়ে কী করব?

একই বাসে বাড়ি থেকে কর্মস্থলে ফিরছিলেন পেশায় শিক্ষিকা করিমপুরের আনন্দপল্লীর বাসিন্দা বছর সাতাশের জয়শ্রী চক্রবর্তী। বছর আড়াই আগে চাকরি পান মুর্শিদাবাদের সুতির একটি স্কুলে। প্রতি শনিবার বাড়ি ফিরতেন। আবার সোমবার সকালের বাসে ফিরে যেতেন কর্মস্থলে। আড়াই বছর ধরে এই নিয়মের ব্যাতিক্রম হয়নি। সোমবার ভোরে সেই অভিশপ্ত বাসে কর্মস্থলে ফিরছিলেন তিনি। দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে তাঁরও। জয়শ্রীর বাবা বিকাশ চক্রবর্তী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মী। তিনি বলেন, “মেয়েটা শনিবার স্কুলের পর বাড়ি ফিরত। আবার সোমবার সকালে ফিরে যেত। কী ভাবে যে কি হয়ে গেল।”

দৌলতাবাদের দুর্ঘটনায় মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী করিমপুর ১ ব্লকের ১৪ জন এবং করিমপুর ২ ব্লকের ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। রাতভর স্বজনহারানো মানুষদের পাশে দাঁড়িয়ে সান্ত্বনা দিয়েছেন বিধায়ক মহুয়া মৈত্র। সোমবার গভীর রাত থেকেই করিমপুর শ্মশানে সৎকার হয়েছে একের পর এক দেহ। অক্লান্ত চিতার আগুনে দগ্ধ হয়েছে করিমপুর।

মৃত্যুমিছিল এটাই প্রথম নয়। এত মৃত্যু আগেও দেখেছে করিমপুর। এই মুর্শিদাবাদে বাস দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিল করিমপুরের ৬৪ জনের। ১৯৯৮ সালের ১৩ জানুয়ারি মুর্শিদাবাদে পিকনিকে গিয়ে পদ্মায় তলিয়ে যায় একঝাঁক পড়ুয়াভর্তি বাস। মৃত্যু হয় করিমপুরের ৬৪ জনের। জানুয়ারি মাস আজও আতঙ্কের স্মৃতি এখানে। ফের সেই জানুয়ারি, সেই মুর্শিদাবাদ, আবার এক বাস দুর্ঘটনায় ফের মৃত্যুমিছিল করিমপুরে। কুড়ি বছর আগে কলেজ পড়ুয়া একঝাঁক তরুণ-তরুণীকে হারানোর ব্যথা আজও সতেজ। দুই দশক পার করে এসে ১৫টি প্রাণের বলি। জানুয়ারি মানেই কি এখানে মৃত্যু মিছিল? দু:স্বপ্নের স্মৃতি ভুলে স্বাভাবিক জীবনের ছন্দে ফেরাই এখন চ্যালেঞ্জ সীমান্তের জনপদে।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন