subasini mistry
payel samanta
পায়েল সামন্ত

পদ্মের সুবাস তাঁর রোজনামচা পালটে দিতে পারেনি। সেই নিয়ম করে সকালবেলা হাসপাতালে হাজির হওয়া কিংবা ব্যথাকাতর রোগীদের পাশে ঠায় বসে থাকা, কোনোটাই পালটে যায়নি। তিনি সুবাসিনী মিস্ত্রি। এই মুহূর্তে প্রত্যেক বাঙালিই তাঁর নাম ও কীর্তি জানেন। ভারত সরকারের সর্বোচ্চ সম্মান পদ্মশ্রীতে ভূষিত তিনি।

স্বামী সাধন মিস্ত্রির মৃত্যুর পর তাঁর জীবনের চলার পথ বন্ধুর থেকে বন্ধুরতম হয়েছে। কিন্তু স্বপ্ন দেখার বিরাম ছিল না। সে স্বপ্ন নিজের ভালো থাকা বা ব্যক্তিগত উন্নতির আকাঙ্ক্ষা নয়। বরং গরিব মানুষকে বিনা চিকিৎসায় মরতে দেওয়া যাবে না। হ্যাঁ, সে স্বপ্নেরই বাস্তব নাম ‘হিউম্যানিটি হাসপাতাল’। সুবাসিনী মিস্ত্রির মুখোমুখি হয়ে দেখা গেল, লড়াই জারি আছে এখনও।

স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে শুরু লড়াই। নিজের এবং সন্তানদের জীবনরক্ষার লড়াই। তার জন্য মাটি কেটে, ঠেলাগাড়ি করে সবজি বেচে, ভাগের জমি চাষ করে, অন্যের বাড়ি পরিচারকের কাজ করে তিনি অস্তিত্ব টিকিয়েছেন। সংসারে ব্যয়ভার টানতে না পেরে ছেলে আর মেয়েকে অনাথ আশ্রমেও দিয়েছিলেন। এখনও অনর্গল সে কথাগুলো বলে যান তিনি। বিভি্ন্ন সভা বা বক্তৃতা মঞ্চেও উঠে আসে অতীতের সেই লড়াইয়ের কথাগুলো। আর তার সঙ্গে থাকে নিজের হাসপাতালকে সাহায্য করার অকুন্ঠ আবেদন।

খবর অনলাইনকে তিনি দৃপ্ত কন্ঠে বললেন, “আমার কোনো গর্বও নেই, কোনো অহংকারও নেই। আঁচল পেতে ভিক্ষেও করেছি। কোলে এক বছরের সন্তান রেখে স্বামী মারা গেলে কী কষ্ট হয়, তা জানি। দিনের পর দিন ছেলেমেয়েদের খেতে বা পরতে দিতে পারিনি। চাঁদা তুলে মেজছেলেকে পড়ার বই কিনে দিতে হয়েছে।” এত সংগ্রামের মধ্যেও তা হলে এমন আকাশছোঁয়া স্বপ্ন দেখা কেন? সুবাসিনী শান্ত কন্ঠে বলেন, “আমার স্বামী পয়সার অভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা গিয়েছে। গরিব মানুষ যাতে আর বিনা চিকিৎসায় না মারা যায়, সে জন্যই এই হাসপাতাল তৈরির কথা ভেবেছিলাম।”

humanity hospitalএই বোধকে নমস্কার আর এই ভাবনাকে আজ স্যালুট সারা দেশের। কিন্তু ১৯৯৩ সালে হাসপাতাল তৈরির প্রথম উদ্যোগকে কতটা সমীহের চোখে দেখেছিল বাঙালি?  “এক গরিব বিধবা হাসপাতাল বানাচ্ছে, এটা যেমন অনেকে খারাপ চোখে দেখছিল, তেমনি সে দিন অনেকে সাহায্য করেছিলেন। লোকের কথায় অবশ্য কোনো কালে আমার কিছু এসে যায়নি।”

দক্ষিণ শহরতলির ঠাকুরপুকুর বাজার থেকে যে রাস্তা বাখরাহাটের দিকে গিয়েছে সেই রাস্তায় হাঁসপুকুরের কাছে গড়ে উঠেছে এই হাসপাতাল। সুবাসিনীর মুখ থেকেই শোনা গেল সেই হাসপাতাল তৈরির নেপথ্য কাহিনি। একটি জমিতে সবজি চাষ করতেন তিনি। মালিক সেই জমিটা বেচে দেবেন শুনে সুবাসিনী জমিটা কিনে নেন। এক লাখ টাকায় এক একর জমি। এই এক লাখ টাকার কিছুটা তাঁর তিল তিল করে জমানো নিজের টাকা আর কিছুটা ছেলে অজয়ের টিউশনি করে জমানো টাকা। আজকে সুবাসিনী অবশ্য রসিকতা করে বলেন, “সে সময় জমির দাম কম ছিল। তাই কিনতে পেরেছি। তখন যদি জানতাম জমির দাম এমন বাড়বে, তা হলে আরও জমি কিনে রাখতাম। তা হলে আজ আমি বেশ ধনী হয়ে যেতাম।” তবে সুবাসিনীর লক্ষ্য যে অন্য ছিল, সেটা প্রমাণ করে সেই ১৯৯৩ সালে তাঁর হাসপাতাল তৈরি। প্রচুর মানুষের সাহায্য তাঁকে এই সাফল্যের পথে এনেছে, সে কথাও বারবার বলেন তিনি।

“আজকের দিন হলে অবশ্য কেউ সাহায্য করত না। টালি, বাঁশ, মাটি দিয়ে কত মানুষ পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।” হ্যাঁ, সুবাসিনীর কণ্ঠের দৃঢ় কথাগুলো ইঙ্গিত দেয় অস্থায়ী ছাউনি রূপে হিউম্যানিটি হাসপাতালের সেই একচালাটির। অন্যের দান করা মাটি, টালি, বাঁশ দিয়ে তিল তিল করে তৈরি হচ্ছিল একটা চিকিৎসা সেবাকেন্দ্র। সুবাসিনী মিস্ত্রির চিকিৎসক পুত্র অজয় মিস্ত্রি আজকের হিউম্যানিটি হাসপাতালের প্রশাসনিক দায়িত্বে। মায়ের লড়াইয়ের সব চেয়ে বড় সৈনিক তিনিই। ডাক্তারির ছাত্র হয়ে হাসপাতাল ভবন তৈরির জন্য ঘরামি বা জোগাড়ের কাজও করেছেন সদর্পে। তিনি জানালেন, “তখন দরমার ঘরের ভেতরে স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিভাগ বসত। বারান্দায় চলত বাকি – চোখ, ত্বক, মেডিসিন সহ বাকি পাঁচটি বিভাগ। সব মিলিয়ে ছয়টি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল। তখন চিকিৎসকেরাও বিনা পারিশ্রমিকে চিকিৎসা করেছেন এখানে।”

operation theatre in humanity hospitalএখন সুবাসিনীর হাসপাতালে সব মিলিয়ে ১৮টি বিভাগ। হাসপাতাল এখন চেহারায় অনেক অভিজাত। হাসপাতালের টিকিটের দাম ২ টাকা থেকে ১০ টাকা, এখন ৫০ টাকা হয়েছে। আরও অনেক বেশি মানুষ এখানে পরিষেবা পান। তবে এখনও পথ চলার অনেক বাকি। কী বললেন সুবাসিনী? “আমার হাসপাতালে এখনও ঘণ্টায় ৪০০ টাকা দিয়ে আরএমও ডাক্তার রাখতে পারিনি। নিরাপত্তারক্ষী রাখতে পারিনি। তখন ডাক্তাররা বিনা পয়সায় চিকিৎসা করেছে। আজ আর সে সব হয় না।”

লড়াই জারি আছে এখনও। সে কথা উঠে এল ডাক্তার অজয় মিস্ত্রির কথাতেও – “হাসপাতাল ঠিক ভাবে চালানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য কোথায়। সরকারি বা বেসরকারি কোনো উদ্যোগও পাশে নেই। তবে রোগীরা আমাদের পাশে চিরকালই আছেন।” আছে লড়াকু সুবাসিনীর ঐকান্তিক চেষ্টা। প্রায় পঁচাত্তরে পৌঁছেও তিনি সদাসতর্ক, সদাজাগ্রত। বাজারের থলে হাতে রোগীদের পথ্য জোটাতে বেরিয়ে পড়েন রোজ সকালে। জীবনের সব চেয়ে বড়ো সম্মান পদ্মশ্রী হলেও বহু সম্মান তাঁর ঝুলিতে। তবে সুবাসিনীর এ ঝুলি ভিক্ষের নয়, স্বীকৃতির। তৃতীয় বিশ্বের গরিবগুর্বোদের সসম্মানে চিকিৎসা করার স্বীকৃতি। তাঁদের জন্যই এখনও বিভিন্ন পত্রপত্রিকা বা সভা সমিতিতে সুবাসিনী নিজের হাসপাতালকে সাহায্যের কথা বলেন, গরিব মানুষগুলোর জন্য তাঁর লড়াইয়ের কথা বলেন। বোঝা গেল, স্বামীর মৃত্যুর পর ২৩ বছর বয়স থেকে তাঁর যে লড়াই শুরু, তা জারি আছে এখনও।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন